এএফসি এশিয়ান কাপ বাছাই পর্বের ম্যাচ খেলতে ভারতে রয়েছে বাংলাদেশ দল। আজ সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় শিলংয়ে ভারতের বিপক্ষে মাঠে নামবে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। এ দুই দলে ম্যাচ মানেই বাড়তি উত্তেজনা। মাঠ ও মাঠের বাইরে কেউ কাউকে চুল পরিমাণ ছাড়তে দিতে চায় না। তাই দর্শকদের আগ্রহের কেন্দ্রে থাকে এ ম্যাচ। এবারে মাঠে নামার আগে আলোচনায় রয়েছে দুটি নাম হামজা চৌধুরী ও সুনীল ছেত্রী।
ভারত ম্যাচ দিয়ে লাল-সবুজের জার্সিতে অভিষেক হতে যাচ্ছে হামজা চৌধুরীর। তাই জয় দিয়ে নিজেদের অভিষেকটা রাঙাতে মরিয়া হয়ে আছেন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের এ ফুটবলার। এ ম্যাচে আট নম্বর জার্সি পরে মাঠে নামবে হামজা। তরুণ এ ফুটবলার দলে যোগ দেওয়ার পর থেকে বেশ আত্মবিশ্বাসী দেখা গেছে জামাল-তপুদের।
সবশেষ প্রকাশিত র্যাঙ্কিং অনুসারে, ভারতের অবস্থান ১২৬ নম্বরে। তাদের চেয়ে ৫৯ ধাপ পেছনে থাকা বাংলাদেশ রয়েছে ১৮৫তম স্থানে। অর্থাৎ কাগজে-কলমে শক্তির বিবেচনায় ভারত এগিয়ে। তবে হামজার অন্তর্ভুক্তি দুই দলের সামর্থ্য ও দক্ষতার পার্থক্য নিয়ে নতুন করে ভাবাচ্ছে ভারতকে। তাই বাংলাদেশ ম্যাচের আগে অবসর ভেঙে মাঠে ফিরেছেন ভারতের সেরা খেলোয়াড় সুনীল ছেত্রী। বাংলাদেশকে হারিয়ে নিজের প্রত্যাবর্তন রাঙাতে চান তিনি। মালদ্বীপের বিপক্ষে গোল করে তিনি নিজের প্রস্তুতিটাও ভালোই সেরেছেন। এখনো দেখার বিষয় বাংলাদেশের বিপক্ষে কেমন পারফরম্যান্স করেন ছেত্রী।
নিজের দলে হামজা চৌধুরীর যোগ দেওয়া, ভারত দলে তারকা ফরোয়ার্ড সুনিল ছেত্রীর ফেরাÑ এই দুই কারণে ম্যাচটি আরো রোমাঞ্চকর হতে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে বাংলাদেশ কোচের। দক্ষিণ এশিয়ার দলগুলোর মধ্যে ‘শক্তিশালী’ তকমাটা কেবল যায় ভারতের সঙ্গেই। এ ভাবনায় এবার ছেদ টেনে দিলেন হাভিয়ের কাবরেরা! সংবাদ সম্মেলনে দৃঢ় কণ্ঠে বাংলাদেশ কোচও বলে দিলেন, “আমরা মানসিকভাবেও ভীষণ শক্তিশালী অনুভব করছি।”
দলীয়ভাবেও একই অনুভূতি কাবরেরার। জামাল ভূইয়া, কাজী তারিক রায়হানরা আগে থেকেই ছিলেন, ইংলিশ ফুটবলে খেলার অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ হামজা চৌধুরী যোগ হয়েছেন। মিতুল মারমা, শেখ মোরসালিনদের মতো স্থানীয়রা নিজেদের মানের উন্নতি ঘটিয়েছে। সব মিলিয়ে কাবরেরার মনে হচ্ছে, অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে আরো শক্তিশালী হয়ে, আরো প্রস্তুত হয়ে শিলংয়ে এসেছে তার দল।
সংবাদ সম্মেলনে প্রত্যয়ী এক কোচ হিসেবে গণমাধ্যমের সামনে এলেন কাবরেরা। আত্মবিশ্বাসী উচ্চারণে বলতে থাকলেন ভারত ম্যাচ নিয়ে লক্ষ্য। ‘আবারও বলছি, আমি আসলেই অনুভব করছি, আমরা প্রস্তুত। নিশ্চিতভাবে ভারতের সিনিয়র দলের বিপক্ষে আমার কোচ হিসেবে খেলার প্রথম অভিজ্ঞতা হবে। আমরা জানি, ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের পরিসংখ্যান ভালো নয়। ২০০৩ সালের পর বাংলাদেশ তাদেরকে হারাতে পারেনি। কিন্তু আবারও বলছি, আমরা খুবই আত্মবিশ্বাসী এবং অতীতের চেয়ে এবার বেশি শক্তিশালী। তা কেবল পারফরম্যান্সের দিক থেকে নয়, মানসিকভাবেও। আমরা মানসিকভাবেও ভীষণ শক্তিশালী অনুভব করছি।’
ঢাকা ও সৌদি আরবে প্রস্তুতি নেওয়ার পর শিলংয়ে এসে প্রস্তুতির ভেন্যু ও সময় নিয়ে নানা বিরূপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে বাংলাদেশকে। গত বৃহস্পতিবার শিলং পৌঁছানোর পর থেকেই নানা বিপত্তিতে পড়ে হামজা চৌধুরীরা। শিলংয়ে এসে পদে পদে ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে বাংলাদেশ দলের ফুটবলারদের। হোটেল, মাঠ, অনুশীলন সুবিধা কোনো কিছুই ঠিক নেই। সব জায়গাতেই স্বাগতিকদের পক্ষ থেকে অসহযোগিতা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে অনুশীলন মাঠ নিয়ে অসন্তোষ দেখা গেছে বাংলাদেশ দলের কোচ হ্যাভিয়ের কাবরেরার মধ্যে। জয়ের জন্য তার দরকার একটি ভালো মাঠে নিবিড় অনুশীলন। সেই কাক্সিক্ষত মাঠটিই পাচ্ছেন না বাংলাদেশ কোচ। তিনি চেয়েছিলেন ফুটবলারদের নিয়ে ম্যাচ ভেন্যু জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামে অনুশীলন করতে। কিন্তু সেখানে অনুশীলনের অনুমতি মেলেনি।
বাংলাদেশ দলকে অনুশীলনে পাঠানো হয় শহরের নর্থ ইস্টার্ন হিলস বিশ্ববিদ্যালয় মাঠ। মাঠটি কিছুটা উঁচুনিচু, এবড়ো-খেবড়ো। এমন মাঠে অনুশীলন করতে হয়েছে বলে বেজায় নাখোশ কোচ কাবরেরা। গত শনিবার অবশ্য নেহরু স্টেডিয়ামেই অনুশীলন করেছে বাংলাদেশ দল। যদিও সেটা মূল স্টেডিয়ামে নয়, গ্রাউন্ড-টু টার্ফ মাঠে। বাংলাদেশ দল যখন বাইরে অনুশীলন করছিল, ভারতীয়রা তখন অনুশীলন করল ম্যাচের মূল ভেন্যুতেই। যদিও স্বাগতিক হিসেবে এ সুবিধা তারা পেতেই পারে। কিন্তু প্রতিপক্ষের জন্য ভালো অনুশীলন মাঠের ব্যবস্থা করাটা নিয়ম। সেটাই তারা মানল না। এ নিয়ে দারুণ ক্ষুব্ধ বাংলাদেশ দলের ম্যানেজার আমের খানসহ দেশের ফুটবল অনুরাগীরা।
তবে এগুলো নিয়ে এখন আর ভাবতে চাইছেন না কাবরেরা। তার পুরো মনোযোগ ম্যাচ ঘিরে। “এসব বিষয় নিয়ে অনেক শোরগোল হয়েছে। সম্ভবত বিষয়গুলো আরো ভালো হতে পারত, কিন্তু আমাদের কাছে বিষয়টা অতীত। আমরা ওগুলো নিয়ে কোনো অজুহাত দাঁড় করাতে চাই না। শেষ পর্যন্ত আমরা মূল মাঠে অনুশীলনের সুযোগ পাচ্ছি। এ সুযোগের সর্বোচ্চটা নেওয়ার চেষ্টা করব আমরা। যাই হোক, আমরা প্রস্তুত। আমরা সেরা ফ্যাসিলিটিজ নিয়ে অনুশীলন করতে পারিনি, কিন্তু সেরা প্রস্তুতিই নিয়েছি। তো ওই বিষয়গুলো আমাদের ভাবনায় এখন আর নেই।”
ভারত-বাংলাদেশ ম্যাচের ভেতরে অন্য এক লড়াই চলবে হামজা চৌধুরী ও সুনিল ছেত্রীর। দুজন দুই দলের সবচেয়ে বড় তারকা। এ নিয়ে রোমাঞ্চিত কাবরেরা।
অধিনায়ক জামাল ভূইয়া যেন কণ্ঠ মিলিয়েছেন কোচ কাবরেরার সঙ্গে। দুই বছর আগে বেঙ্গালুরুতে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ খেলে যাওয়া দল অনেক বদলেছে, আরো শক্তিশালী, আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ অধিনায়ক। সংবাদ সম্মেলনে জামাল ভূইয়া সবসময়ই আত্মবিশ্বাসী। ভারত ম্যাচ সামনে রেখে এবার যেন আরো বেশি আত্মবিশ্বাস ঝরল তার কণ্ঠে। দল নিয়ে, ভারত ম্যাচের লক্ষ্য জানাতে গিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বাংলাদেশ অধিনায়ক বললেন, ভারতের সঙ্গে নিজেদের ‘বড় পার্থক্য’ দেখেন না তিনি।
প্রতিপক্ষ দলের সাংবাদিকদের চোখে চোখ রেখে এমন করে জামাল কথা বলেছিলেন ২০১৯ সালেও। সেবার বিশ্বকাপ বাছাইয়ের ম্যাচ খেলতে কলকাতায় গিয়েছিল দল। জামাল বলেছিলেন, তিনি ভারতীয়দের হৃদয় ভাঙতে চান। সল্টলেকের সেই ম্যাচ ১-১ ড্র করে কথা রেখেছিলেন জামাল। এবার সংবাদ সম্মেলনে অবশ্য তীর্যক প্রশ্নের মুখোমুখি হলেন না তিনি, তবে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর অধিনায়ক দিলেন আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে।
এশিয়ান কাপের বাছাইয়ের তৃতীয় রাউন্ডের ম্যাচে মঙ্গলবার বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ কেবল ভারত নয়। স্থানীয় দর্শকরাও। গ্যালারিতে সরব উপস্থিতি থাকবে তাদের। তবে, এসব নিয়ে কোনো চাপ অনুভব করছেন না জামাল। ‘ভারতে ফের আসতে পেরে ভালো লাগছে এবং এখানে আমার ভালো স্মৃতি আছে। অবশ্যই এই রুমের মধ্যে যারা আছেন, তাদের মতো আমিও আগামীকালের ম্যাচ নিয়ে রোমাঞ্চিত। আসলে, ভারতের প্রতিপক্ষ হয়ে এখানে এলে ম্যাচের আগে, পরে সবসময়ই আপনি মানুষের উন্মাদনা অনুভব করবেন। তবে যখন খেলতে মাঠে নেমে পড়বেন, তখন মনোযোগ ম্যাচেই দেবেন। দর্শক কি বলছে, সেদিকে আপনার মনোযোগ থাকবে না। আপনি নিজের মধ্যে, নিজের ভাবনাতে থাকবেন।’
এশিয়ান কাপ বাছাইয়ের তৃতীয় রাউন্ডে ‘সি’ গ্রুপে রয়েছে বাংলাদেশ ও ভারত। গ্রুপের বাকি দুটি দল হংকং ও সিঙ্গাপুর। পয়েন্ট তালিকার শীর্ষ দল পাবে ২০২৭ সালে সৌদি আরবে অনুষ্ঠেয় এশিয়ান কাপে খেলার টিকিট।
কেকে/এএস