বন রক্ষা করতে গেলেই বনকর্মীদের ওপর হামলা হচ্ছে- এমন ঘটনা যেন এখন নিত্যদিনের খবর হয়ে উঠেছে। এমনই ঘটনা ঘটেছে চট্রগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগের চুনতি রেঞ্জে।
শুক্রবার (২৮ মার্চ) রাতে বনায়ন রক্ষা করতে গেলে বনখেকোরা অতর্কিত হামলা করে রেঞ্জ কর্মকর্তার হাত ভেঙ্গে দেয় ও আরও ৬ জন বনকর্মীকে পিটিয়ে আহত করে বলে জানা যায়।
এদিকে তামাক চুল্লি ও ইটভাটায় পোড়ানোর জন্য কাটা হচ্ছে সামাজিক বনায়নের গাছ। গাছ বড় না হওয়ার আগেই বন খেকোরা টাকার লোভে সামাজিক বনায়নের গাছ তামাক মৌসুমে তামাক চুল্লিতে ও ইটভাটায় বিক্রি করছে বলে খবর রয়েছে। এই সামজিক বনায়ন রক্ষায় বনখেকো ও বনকর্মীদের মাঝে যেন ইঁদুর বিড়াল খেলা চলছে। কোনভাবেই রক্ষা করতে পারছে না সামাজিক বনায়নের গাছ।
একদিকে অদক্ষ বনকর্মী অন্যদিকে জনবল সংকট সব দিক বিবেচনা করলে বনবিভাগের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে বনখেকোরা নিয়মিত সামাজিক বনায়নের গাছসহ বন ধ্বংস করছে বলে জানান সমাজের সচেতন নাগরিকরা।
চুনতি রেঞ্জে বনখেকোরা সামাজিক বনায়নের গাছ কাটছে এমন খবব পেয়ে রেঞ্জের কর্মকর্তা কর্মচারি বনখেকোদের গাছ কাটা বন্ধ করতে গেলে বনকর্মীদের ওপর হামলা করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
শুক্রবার (২৮ মার্চ) রাত ৯দিকে চট্রগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগের চুনতি রেঞ্জের হারবাং বিটের আজিজ নগর ইউনিয়নের হিমছড়ি মুসলিমপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। হামলায় রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. আবীর হাসানসহ ৬ জন বনকর্মী আহত হয় বলে জানা গেছে। তারা এখন চট্রগ্রাম মেডিকেলসহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধিন আছে বলে জানান।
বনবিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২১-২২ সনের সুফল বাগান থেকে জ্বালানি কাঠ কেটে জীপগাড়ি দিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় হিমছড়ি নামক এলাকায় গাড়ি আটক করলে বেশ কিছু সন্ত্রাসী দেশী অস্ত্র নিয়ে হামলা চালিয়ে স্টাফদের জখম করে গাড়ি ছিনিয়ে নিয়ে যায়। এতে মারাত্মক আহত হয়েছেন। স্থানীয় কিছু বনখেকো সামাজিক বনায়নের গাছ কেটে গাড়ি ভর্তি করে রাখলে ঠিক সেই মুহুর্তে বনকর্র্মীরা পৌছালে গাড়িসহ গাছ জব্দ করে। পরে বনখেকোরা গাড়ি ও গাছ রক্ষা করতে বনকর্মীদের ওপর হামলা চালায়।
এসময় রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. আবীর হাসান, হারবাং বিট কর্মকর্তা একেএম আবু সায়ীদ, ফরেস্ট গার্ড মুহসিন হাওলাদার, সাঘটিয়া বিট কর্মকর্তা মুহসিন আলী ইমরান, ফলেস্ট গার্ড সালাহ উদ্দিন, বাগানমালি মো. জিকু, ধীরেন ত্রিপুরা আহত হন । আক্রমনের পরে পরে স্থানীয় সাধারণ মানুষ তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়।
চুনতি রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. আবীর হাসান জানান, শুক্রবার রাতে খবর আসে সামাজিক বনায়নের গাছ কাটা হচ্ছে হিমছড়ি নামক এলাকায়। খবর পেয়ে সেখানে গেলে বনায়নের গাছ কাটা হচ্ছে এমন আলামত দেখতে পাই এবং কিছু গাছ পাশেই একটি গাড়িতে উঠানো ছিল। গাড়ির ড্রাইভার পালিয়ে গেলে আমাদের নিজস্ব ড্রাইভার দিয়ে গাছসহকারে গাড়ি আনতে গেলে মুসলিমপাড়া নামক স্থানে আমাদের অতর্কিত হামলা করে বনখেকোরা। এসময় আমিসহ ৬-৭ জন বনকর্মী আহত হই। আহতরা চট্রগ্রাম মেডিকেল কলেজসহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে। কয়েকজনের অবস্থা বেশ গুরুতর। তাদের হাত ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে বলে ধারনা করা হচ্ছে। যারা হামলা করেছে তাদের সনাক্তর কাজ চলছে। তাদের বিরোদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এ বিষয় নিয়ে চট্রগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুনের মোবাইলে বেশ কয়েকবার ফোন করা হলেও ফোনে সংযোগ পাওয়া যায়নি।
সামাজিক বনায়নের গাছ রক্ষা করতে হবে জানিয়ে সম্প্রতি পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, প্রয়োজন ছাড়া এসব গাছ কাটা যাবে না। আকাশমণি ও ইউকেলিপটাস নয়, দেশীয় গাছ লাগাতে হবে।
তিনি বলেন, সামাজিক বনায়নের সুবিধাভোগীরা গাছ বিক্রির লভ্যাংশের পরিবর্তে জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড থেকে সমপরিমাণ অর্থ পাবেন। গত মাসের রবিবার (৯ ফ্রেরুয়ারি) রংপুর সার্কিট হাউজে বন অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
পরিবেশ উপদেষ্টা বলেন, পরিবেশ রক্ষায় সরকারি সংস্থাগুলোর কার্যকর সমন্বয় জরুরি। বন ধ্বংস, দূষণ ও পানি সংকট মোকাবিলায় এককভাবে কাজ না করলে হবে না। খরা, বন্যা ও নদীভাঙন মোকাবিলায় জলাধার সংরক্ষণ, বন পুনর্স্থাপন ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নিতে হবে।
কেকে/এজে