ঈদুল ফিতরের ছুটিতে সারা দেশে বেড়েছে সড়ক দুর্ঘটনা। এর বেশির ভাগই ঘটছে মোটরসাইকেলে। আর এসব দুর্ঘটনায় আহতদের বড় একটি অংশ ছুটে আসছেন রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতাল হিসেবে পরিচিত জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (নিটোর)। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ সময়ে হাসপাতালে আসাদের মধ্যে বেশির ভাগই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার। তাদের অনেকেরই হাত-পা কেটে ফেলতে হয়েছে।
পঙ্গু রোগীদের জন্য দেশের একমাত্র বিশেষায়িত হাসপাতালটির পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ডা. মো. আবুল কেনান বলেন, এবারের ঈদেও সড়ক দুর্ঘটনায় রোগীর পরিমাণ বেশি। বিভিন্ন উপজেলা কিংবা জেলা শহর থেকে তারা আসছেন। তাদের বেশির ভাগই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার রোগী। কারো হাত ভেঙেছে, কারো পা ভেঙেছে। আবার কোনো কোনো রোগীর অবস্থা গুরুতর।
জানতে চাইলে ডা. আবুল কেনান বলেন, দুর্ঘটনা এড়াতে সচেতনতার বিকল্প নেই। অধিকাংশই এখন বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালান। আর মোটরসাইকেল চালকদের অনেকে নিজেদের সুরক্ষা এবং স্বাভাবিক গাড়ি চালান না। যার ফলে দুর্ঘটনা ঘটছে।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, ঈদকেন্দ্রিক সড়ক দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হয়ে ঈদের দিন গত সোমবার নিটোর হাসপাতালে ভর্তি হন ২৪১ জন। পরদিন মঙ্গলবার (১ এপ্রিল) ইনডোরে সেবা নিয়েছেন ৭৫৮ জন আর ইমার্জেন্সি রোগী এসেছেন ৩৩১ জন। পরের দুই দিন বুধ ও বৃহস্পতিবারও রোগীর অতিরিক্ত চাপ লক্ষ্য করা গেছে বিশেষায়িত হাসপাতালটিতে। আহত রোগীদের মধ্যে বেশি রয়েছেন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার রোগী, এরপর প্রাইভেটকার, ট্রাক-বাস দুর্ঘটনার রোগী।
ফাঁকা ঢাকাতেও বেপরোয়া বাইক : সড়ক ভর্তি ঠাসা গাড়ি কিংবা হেল্পারদের হাঁক-ডাক, কোনোটিই নেই আজকের ঢাকার পথে। পরিবার-স্বজনদের সঙ্গে ঈদ উপভোগ করতে ঢাকা ছেড়েছেন লাখ লাখ মানুষ। সেইসঙ্গে ছুটিতে পরিবহন সংশ্লিষ্টরাও। ফলে ঈদের আগের দিন থেকে ঢাকার সড়কগুলো ফাঁকা। যদিও কিছু গণপরিবহন সড়কে যাত্রী পরিবহণ করছে, কিন্তু বেশিরভাগ মানুষই যাতায়াত করছেন রিকশায়। আবার কেউ কেউ স্বল্প দূরত্বে হেঁটে যাচ্ছেন। কিন্তু এদের জন্য ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে মোটরসাইকেল। ফাঁকা সড়কে তীব্র গতিতে ছুটছে বাইকাররা।
মিরপুরের বাসিন্দা মিনহাজ রহমান বলেন, ফাঁকা রাস্তায় বাইকাররা মোটরসাইকেলের গতি বাড়িয়ে দেয়। সামনে মানুষ, নাকি পশু- সেদিকে খেয়াল থাকে না।’
রিকশা চালকরাও বললেন, ফাঁকা সড়কে বেপরোয়াভাবে বাইক চালানো হয়। এদিকে সড়কে গাড়ির চাপ নেই। কিন্তু যে কয়েকটি কোম্পানি বাস চালু রেখেছে তারাও চলছে ঠেলাঠেলি করে। এক বাস আরেক বাসকে ওভারটেক করার যে চিরাচরিত রেষারেষি তা ছুটির দিনেও অব্যাহত। ঈদের দিন থেকে গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত ঢাকার বিভিন্ন সড়ক ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
সকালে ঈদের নামাজ শেষ করে খেয়ে দেয়ে পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের নিয়ে বেড়াতে বেরিয়ে পড়েন অনেকেই। মিরপুর পল্লবী, ১১ নম্বর, ১০ নম্বর, ১ ও ২ নম্বর এলাকায় দেখা গেছে, কেউ বাসে, কেউ রিকশায়, কেউ হেঁটেই বিভিন্ন গন্তব্যে যাচ্ছেন। আবার কেউ যাচ্ছেন মোটরসাইকেল যোগে। এর মধ্যে পাঠাও চালকের সংখ্যা কম হলেও বেশিরভাগ দেখা গেছে নিজস্ব মোটরসাইকেল নিয়ে বেরিয়েছেন। আর ফাঁকা রাস্তায় গাড়ি চালাচ্ছেন সর্বোচ্চ গতিতে।
পরিস্থান পরিবহনের চালক মসিউর রহমান এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘একে তো যাত্রী কম, তার ওপরে স্টপেজে থামালে চিৎকার শুরু করে।’ এদিকে যাত্রীরা বলছেন, ভাড়া বেশি নিচ্ছে, সেইসঙ্গে সময় নিচ্ছে বেশি। জানা গেছে, ঈদ উপলক্ষে যাত্রীপ্রতি সাধারণ ভাড়ার সঙ্গে ১০ টাকা করে বেশি নিচ্ছে বাসগুল।
ঢাকার রাস্তায় অধিকাংশ সময় ধীরগতিতে গাড়ি চলাচল করে। ফলে মোটরসাইকেল চালকরাও ধীরে চলতে বাধ্য হন। তবে ঈদে ফাঁকা রাস্তায় বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালাতে দেখা গেছে। মোটরসাইকেলের বেপরোয়া চালকদের অধিকাংশই বয়সে কিশোর-তরুণ-যুবক। এক মোটরসাইকেলে তিনজন করে এবং হেলমেট ছাড়াই দেখা যাচ্ছে চালকদের। পথচারীরা বেপরোয়া গতির মোটরসাইকেল চালানোয় অনেকটা আতঙ্কগ্রস্ত। রাস্তা পারাপারসহ চলাচলে তাদের এখন বেশি ভয় মোটরসাইকেল নিয়ে।
পরিবারটির আর কেউ বেঁচে রইল না : চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত তাসনিয়া ইসলাম প্রেমা (১৮) মারা গেছেন। গতকাল শুক্রবার দুপুর ১২টার দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাসনিয়া মারা যান। এ নিয়ে এ সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়াল ১১। এর আগে এ দুর্ঘটনায় তাসনিয়ার বাবা-মা ও দুই বোন মারা যান। তাসনিয়ার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে পরিবারটির কেউ বেঁচে রইল না।
একই দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত শিশু আরাধ্য বিশ্বাসকে (৮) উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে গতকাল ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
চমেক হাসপাতাল থেকে গতকাল দুপুর সোয়া ১২টার দিকে অ্যাম্বুলেন্সে করে আরাধ্যকে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন স্বজনেরা। আরাধ্য চমেক হাসপাতালের শিশু আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিল।
এখন চমেক হাসপাতালের অর্থোপেডিক বিভাগে চিকিৎসাধীন আছেন এ দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত দুর্জয় কুমার মণ্ডল (১৮)। তিনি শিশু আরাধ্যের স্বজন।
গত বুধবার সকালে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি জাঙ্গালিয়া এলাকায় বাস-মাইক্রোবাসের সংঘর্ষ হয়। এ দুর্ঘটনায় সেদিনই ১০ জন নিহত হন। তারা হলেন- তাসনিয়ার বাবা ঢাকার মিরপুর এলাকার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম (৪৮), মা লুৎফুন নাহার (৩৭), দুই বোন আনিশা আক্তার (১৪), লিয়ানা (৮) ও স্বজন তানিফা ইয়াসমিন (১৬)। এছাড়া নিহত হন আরাধ্যর বাবা দিলীপ বিশ্বাস ও মা সাধনা মণ্ডল। নিহত অপর তিনজন হলেন ইউছুফ আলী (৫৭), আশীষ মণ্ডল (৫০) ও মোক্তার আহমেদ (৫২)। ইউছুফ গাড়িচালক ছিলেন বলে জানা গেছে।
দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন তিনজন। তাদের মধ্যে গতকাল তাসনিয়ার মৃত্যু হলো। আহত অপর দুজনের মধ্যে দুর্জয় চমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আর আরাধ্যকে চমেক হাসপাতাল থেকে গতকাল ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়।
চমেকের আইসিইউ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক মো. হারুনুর রশিদ বলেন, ‘আজ (গতকাল) দুপুর ১২টায় তাসনিয়াকে মৃত ঘোষণা করা হয়। শুরু থেকেই তার অবস্থা ছিল সংকটাপন্ন। সময়ের সঙ্গে অবস্থার অবনতি হয়।’
চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. তাসলিম উদ্দীন বলেন, আহত আরাধ্যকে আজ (গতকাল) ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়েছে। সেখানে তাকে আরো উন্নত চিকিৎসা দেওয়া হবে। আর দুর্জয় এখানে চিকিৎসাধীন।
স্বজনেরা জানান, ঈদের ছুটিতে রফিকুল-লুৎফুন দম্পতি তাদের তিন সন্তান, আত্মীয় ও রফিকুলের সহকর্মী ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার দিলীপ বিশ্বাসের পরিবারের সদস্যরা পর্যটন শহর কক্সবাজারে বেড়াতে যাচ্ছিলেন। যাওয়ার পথে গত বুধবার তাদের বহনকারী মাইক্রোবাসের সঙ্গে বাসের সংঘর্ষ হয়।
কেকে/এআর