সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে দুবাইয়ে গ্রেপ্তার করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত পুলিশ। ইন্টারপোলের সহযোগিতায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এরপর থেকেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে— কীভাবে দেশে ফেরানো হবে সাবেক এ পুলিশ কর্মকর্তাকে।
মূলত জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার কয়েক মাস আগে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির নানা অভিযোগ ওঠে। সেগুলো নিয়ে তদন্তে নামে দুর্নীতি দমন কমিশন বা দুদক। সাবেক এই আইজিপির বিরুদ্ধে যখন দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, তখনই তিনি দেশ ছেড়েছিলেন। এরপর তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়।
রোববার (১৩ জুন) সাবেক আইজিপি মি. আহমেদের আটকের বিষয়টি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিশ্চিত করার পর দুদকের পক্ষ থেকে একটি সংবাদ সম্মেলন করা হয়। সেখানে দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম জানান, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে দুদকের দায়ের করা ছয়টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলায় চার্জশিট দেওয়া হয়েছে এবং অপর একটি মামলার বিচার চলছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় ২০২৫ সালে বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তারে ইন্টারপোলে রেড নোটিশ জারির আবেদন পাঠানো হয়।
বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর তাকে কবে ফেরানো হবে কিংবা ঠিক কি প্রক্রিয়ায় ফেরানো হবে— জবাবে দুদক কর্মকর্তা আকতারুল ইসলাম বলেছেন, ‘‘তাকে গ্রেপ্তারে দুদক ইন্টারপোলের সহযোগিতা নেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে, একই প্রক্রিয়ায় দেশে আনার পর পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া ও বিচার কাজ শেষ করা হবে।’’
দুদক জানিয়েছে, সাবেক আইজিপি সরকারি কর্মকর্তা থাকা অবস্থায় বিভিন্ন সময়ে সরকারি পাসপোর্ট ব্যবহার না করে জালিয়াতি করে সাধারণ ব্যক্তি হিসেবে পাসপোর্ট গ্রহণ করেছেন। এই মর্মে অভিযোগ ছিল এবং একাধিক পাসপোর্ট তিনি গ্রহণ করেছিলেন।
দুদক কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম জানান, জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পত্তি অর্জনের যে পাঁচটি মামলা হয়েছিল সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সেখানে তার তার জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদের পরিমাণ ছিল ৭৬ কোটি টাকারও ওপরে। এসব মামলায় বেনজীর আহমেদকে হাজির করতে আমরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইন্টারপোলে আবেদন করেছিলাম। পরে দুদকের আবেদনের প্রেক্ষিতে রেড নোটিশ জারি করতে ইন্টারপোলের কাছে আবেদন করে বাংলাদেশ পুলিশের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো বা এনসিবি।
তাকে দেশে ফিরিয়ে কি দুদকের কাছেও হস্তান্তর করা হবে কি না— এমন প্রশ্নে এখনই কোন মন্তব্য করেনি দুদক। তবে কীভাবে সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে, তার একটি প্রক্রিয়াগত ব্যাখ্যা জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেছেন, গত ১২ জুন বাংলাদেশ পুলিশ দুবাই থেকে মেইল পেয়ে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হয়। এনসিবি আবুধাবি জানিয়েছে যে, ইউএইএ ফেডারেল ল নাম্বার ৩৯ (২০০৬) অনুযায়ী গ্রেপ্তারের তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক এক্সট্রাডিশন রিকোয়েস্ট (প্রত্যর্পণের আবেদন) প্রেরণ করতে হবে।
বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি দণ্ডবিধির ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮ সহ অন্যান্য ধারা এবং বাংলাদেশ পাসপোর্ট অর্ডার ১৯৭৩-এর ১১ ধারায় মামলা বিচারাধীন রয়েছে বলেও সংবাদ সম্মেলনে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘‘বর্তমানে এনসিবি ঢাকা রেড নোটিশ প্রকাশ, আন্তর্জাতিক সমন্বয় এবং গ্রেপ্তার পরবর্তী ফলোআপ কার্যক্রম সম্পন্ন করছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় মামলা, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও তদন্ত সংক্রান্ত দলিলাদি প্রস্তুত করেছে।’’
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রত্যর্পণ প্রস্তাব অনুমোদন করে অতি দ্রুত কূটনৈতিক চ্যানেলে এনসিবি আবুধাবির কাছে পাঠানো হবে এবং তাকে দ্রুততম সময়ে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে বলেও সংসদে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
বেনজীর আহমেদ ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আইজিপি ছিলেন। এর আগে তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার ও র্যাবের মহাপরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে র্যাবের সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। ওই সময় র্যাবের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের পাশাপাশি এই বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তারাও নিষেধাজ্ঞার আওতায় ছিলেন। যার মধ্যে বেনজীর আহমেদের নামও ছিল। যুক্তরাষ্ট্র যখন নিষেধাজ্ঞা দেয়, তখন আইজিপির দায়িত্বে ছিলেন বেনজীর আহমেদ।
কেকে/এলএ