জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে চারগুণ দ্রুত হারে গলছে উত্তর মেরুর বরফ। উত্তর মেরুর বরফ গলে যাওয়া বৈশ্বিক জলবায়ুর জন্য বড় বিপর্যয় হলেও বিশ্ব পরাশক্তিগুলোর জন্য এটি একটি নতুন ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্র তৈরি করছে। এর ফলে এই অঞ্চলের দুর্ভেদ্য প্রাকৃতিক সুরক্ষা প্রাচীর ভেঙে পড়ছে এবং উন্মুক্ত হচ্ছে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদ ও নতুন সংক্ষিপ্ত বাণিজ্যপথ। এই সম্পদ ও রুটের নিয়ন্ত্রণ নিতেই শুরু হয়েছে পরাশক্তিগুলোর এক অলিখিত ঠান্ডা লড়াই।
প্রথাগতভাবে এশিয়া থেকে ইউরোপে পণ্য পরিবহনের জন্য সুয়েজ খাল কিংবা পানামা খাল ব্যবহার করা হয়। কিন্তু উত্তর মেরুর বরফ গলে যাওয়ায় দুটি প্রধান রুট উন্মুক্ত হয়েছে। রাশিয়ার উপকূল ঘেঁষে তৈরি হয়েছে নর্দান সি রুট, যা এশিয়া থেকে ইউরোপের দূরত্ব সুয়েজ খালের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে। এর ফলে জ্বালানি ও সময়—দুটিই সাশ্রয় হচ্ছে। গবেষকদের মতে, ২০৩০ সাল নাগাদ বরফের পরিমাণ হ্রাস পেয়ে বারো মাসব্যাপী ব্যবহারযোগ্য পথ উন্মোচিত হবে।
এ ছাড়া কানাডার দ্বীপপুঞ্জের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা নর্থ-ওয়েস্ট প্যাসেজ রুটটি উত্তর আমেরিকার সঙ্গে এশিয়ার দূরত্ব অনেকটা কমিয়ে এনেছে।
ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভের তথ্যমতে, উত্তর মেরুর বরফের নিচে লুকিয়ে আছে পৃথিবীর অনাবিষ্কৃত খনিজ সম্পদের এক বিশাল ভাণ্ডার। এই মূল্যবান সম্পদ ও অঞ্চলগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিতেই প্রধান দেশগুলোর মধ্যে চলছে তীব্র প্রতিযোগিতা।
উত্তর মেরুর মালিকানা বা সীমানা নির্ধারণের জন্য কোনো একক আন্তর্জাতিক চুক্তি নেই। ফলে এই অঞ্চলের ওপর নিজেদের অধিকার দাবি করছে বিভিন্ন দেশ। এই লড়াইয়ে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে রাশিয়া। তারা আর্কটিক অঞ্চলে বিশাল সাবমেরিন বহর, আইসব্রেকার এবং সামরিক ঘাঁটি পুনরুজ্জীবিত করেছে।
রাশিয়ার এই আধিপত্য রুখতে নতুন কৌশল নিচ্ছে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো। জলবায়ু পরিবর্তন বা নৌপরিবহনের নতুন পথ আবিষ্কার নয়, বরং আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়ার কর্মতৎপরতাই মূলত বিশ্বের অন্যান্য শক্তিধর রাষ্ট্রকে এই অঞ্চলের প্রতি আগ্রহী করে তুলছে।
রাশিয়া ও ন্যাটোর সম্মিলিত সামরিক শক্তির তুলনা করতে গেলে দেখা যায়, সংখ্যা ও প্রযুক্তির দিক থেকে ৩২টি দেশের সামরিক জোট ন্যাটো রাশিয়ার চেয়ে অনেক এগিয়ে রয়েছে। তবে একক দেশ হিসেবে রাশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র ও বিশাল স্থলবাহিনী দেশটিকে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক শক্তিতে পরিণত করেছে।
এই সীমান্তে কোনো সীমানা না থাকলেও চীন নিজেকে একটি ‘আর্কটিকের নিকটবর্তী দেশ’ হিসেবে দাবি করে এবং রাশিয়ার সঙ্গে মিলে পোলার সিল্ক রোড তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে। আর্কটিকের তেল-গ্যাস ও অবকাঠামো প্রকল্পে চীন বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে। এর বিনিময়ে তারা উত্তর মেরুর বাণিজ্যিক রুটে রাশিয়ার আইসব্রেকার সহায়তায় নিজেদের পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলের সুবিধা নিচ্ছে।
এ ছাড়া বিজ্ঞানের আড়ালে উত্তর মেরুতে একের পর এক গবেষণা স্টেশন স্থাপন করে চীন মূলত এই অঞ্চলের খনিজ সম্পদের ম্যাপিং এবং নিজস্ব ভূরাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করছে।
জাতিসংঘের সমুদ্র আইন অনুযায়ী, কোনো দেশ তাদের উপকূল থেকে একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল দাবি করতে পারে। তবে উত্তর মেরুর মূল কেন্দ্রটি কোনো দেশের সীমানায় পড়ে না। বেশ কয়েক দশক ধরে এই অঞ্চলকে কেন্দ্র করে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমঝোতার সম্পর্ক বজায় ছিল। কিন্তু বর্তমানে সেই নীতিতে পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে। ভবিষ্যতে এই পরিবর্তন কী রূপ ধারণ করবে, তা আন্দাজ করা দুষ্কর।
বাণিজ্যিক এই উত্তেজনা পরিবেশকে চরম বিপদের মুখে ফেলছে। এই লড়াই যেমন অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে, তেমনি পরিবেশগত বড় বিপর্যয় ডেকে আনছে। মেরু অঞ্চলের বরফ গলে যাওয়ার ফলে বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বৈশ্বিক জলবায়ুর ভারসাম্য মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।
অতিরিক্ত জাহাজ চলাচল এবং তেল-গ্যাস উত্তোলনের ফলে যদি কোনো বড় বিপর্যয় ঘটে, তবে আর্কটিকের ভঙ্গুর বাস্তুতন্ত্র চিরতরে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে, যা সমগ্র পৃথিবীর ওপর ভয়াবহ ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলবে।
এই লড়াইয়ের অংশ হিসেবে আর্কটিক অঞ্চলে নতুন নতুন খনি খনন, তেল-গ্যাস উত্তোলন এবং শত শত বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজ চলাচল শুরু হওয়ায় কার্বন নিঃসরণ এবং কৃষ্ণ কার্বন বা কালির আস্তরণ বাড়ছে। এই কালি যখন বরফের ওপর পড়ে, তখন বরফ আরও দ্রুত তাপ শোষণ করে এবং গলনের গতি আরও বাড়িয়ে দেয়।
বিজ্ঞানীদের মতে, উত্তর মেরু বা আর্কটিক অঞ্চল হলো পৃথিবীর এক ধরনের শীতলীকরণ ব্যবস্থা। কিন্তু অন্ধকার সমুদ্রপৃষ্ঠ উন্মুক্ত হয়ে পড়ছে। এই অন্ধকার পানি সূর্যের তাপ বেশি শোষণ করে। যার ফলস্বরূপ পুরো পৃথিবীর তাপমাত্রা হু হু করে বাড়ছে।
অতিরিক্ত উষ্ণতার কারণে বায়ুমণ্ডলের উচ্চ স্তরের বায়ুপ্রবাহ বা জেট স্ট্রিম দুর্বল ও আঁকাবাঁকা হয়ে পড়ছে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার আচরণ চরম আকার ধারণ করছে। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় নজিরবিহীন তীব্র তাপদাহ বা তীব্র শীত এবং এশিয়ায় অস্বাভাবিক খরা বা অতিবৃষ্টির মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘন ঘন ঘটছে।
উত্তর মেরুর সামুদ্রিক বরফ ছাড়াও গ্রিনল্যান্ডের হিমবাহগুলো রেকর্ড গতিতে গলছে। এই গলে যাওয়া পানি সরাসরি মহাসাগরে মিশে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। এর ফলে বাংলাদেশ, মালদ্বীপ ও নেদারল্যান্ডসের মতো উপকূলীয় ও নিচু দেশগুলো চরম বন্যা এবং স্থায়ীভাবে তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
এই অলিখিত লড়াইয়ের ফলে সমগ্র পৃথিবী একটি ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কেন্দ্রে এসে দাঁড়িয়েছে। তবে এই লড়াইয়ের সমাপ্তি কোথায়, তা এখনো অনিশ্চিত। এই প্রেক্ষাপটে পরাশক্তিগুলোর নিজেদের মধ্যে সমঝোতা বর্তমান বিশ্বে চলমান উত্তেজনামূলক সব হুমকি থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করতে পারে।
লেখক : ইডেন মহিলা কলেজ
কেকে/এমএস