ঠিকাদার আসাদ উল্লাহর অনিয়ম নিয়ে দৈনিক খোলা কাগজে বেশ কয়েকটি নিউজ প্রকাশিত হয়। তার অনিয়ম দিন দিন বাড়তে তাকায় প্রশাসনের নজরে আসলে দুদকের আবেদনের প্রেক্ষিতে তার বিরোদ্ধ মামরা দায়ের হয়, যা দুর্নীতি দমন কমিশনকে তদন্ত করার জন্য বলেন আদালত।
মামলার প্রধান আসামী মহেশখালী পৌরসভার সাবেক মেয়র মকছুদ মিয়ার বিরুদ্ধে এর আগেও দুর্নীতির নানা অভিযোগে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। তার মধ্যে, ২০২৫ সালের এপ্রিলে দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মামলার প্রধান আসামী মকছুদ মিয়া ও তার স্ত্রীর বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলেন ঢাকা মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত। সে সময় তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ লোপাটের অনুসন্ধান চলমান থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছিল দুদক।
মহেশখালী পৌরসভার ২২ কোটি ৮১ লক্ষ ৫৬ হাজার ১৯২ টাকার ২১টি উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ এনে একই পৌরসভার সাবেক মেয়র ও আওয়ামীলীগ নেতা মকছুদ মিয়াসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে একটি দুর্নীতির মামলা দায়ের করা হয়েছে।
গত সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) সাবেক মেয়র সরওয়ার আজম বাদী হয়ে কক্সবাজারের সিনিয়র স্পেশাল জজ মোহাম্মদ আবদুর রহিমের আদালতে মামলাটি দায়ের করেন। বিচারক মামলাটি আমলে নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের কক্সবাজারস্থ সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালককে তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের জেলা নাজির বেদারুল আলম এ তথ্য জানিয়েছেন। বাদীর দায়ের করা নালিশী দরখাস্তে বলা হয়েছে, মহেশখালী পৌর এলাকায় উন্নয়নের জন্য ২০১৯ সালের ১৭ জুলাই থেকে ২০২৪ সালের ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে ২১টি প্রকল্পে মোট ২২ কোটি ৮১ লক্ষ ৫৬ হাজার ১৯২ টাকার টেন্ডার আহ্বান করে ২টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়।
কার্যাদেশ প্রাপ্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ২টি হলো মোহাম্মদ আসাদ উল্লাহর মালিকানাধীন মেসার্স আসাদ এন্টারপ্রাইজ ও হাবিবুল ইসলামের মালিকানাধীন হাবিব এন্টারপ্রাইজ। এ ২টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মামলার অন্যান্য আসামিরা যোগসাজশ করে ভুয়া, মিথ্যা পরিমাপ বহি বানিয়ে, ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে, পরিমাপ অতিরঞ্জিত করে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে সরকারি বিল উত্তোলন করে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করেছেন বলে নালিশী দরখাস্তে অভিযোগ আনা হয়। এ ছাড়া প্রকল্পের কাজে অনিয়ম ও ক্ষমতার চরম অপব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়েছে।
বাদীর নিয়োজিত আইনজীবী অ্যাডভোকেট সাজ্জাদুল করিম জানান, বাদী সরওয়ার আজম এ সব উন্নয়ন কাজে দুর্নীতির অভিযোগ এনে দুর্নীতি দমন কমিশনের সদর দপ্তরে আগেই অবহিত করেছেন। পরে গত ২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি দমন আইনের ৫(১)(প)/(ফ), ৫(২) ধারায় মামলাটি দায়ের করা হয়। যার ফৌজদারী দরখাস্ত নম্বর: ০৮/২০২৬ ইংরেজি।
কক্সবাজারের সিনিয়র স্পেশাল জজ মোহাম্মদ আবদুর রহিম মামলাটি আমলে নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের কক্সবাজারস্থ সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালককে তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেন।
মামলায় অভিযুক্ত আসামিরা হলেন, মহেশখালী পৌরসভার সাবেক মেয়র মকছুদ মিয়া, সাবেক পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা নুর মোহাম্মদ, হিসাবরক্ষক মুহাম্মদ এরফান উল্লাহ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স আসাদ এন্টারপ্রাইজের সত্বাধিকারী মোহাম্মদ আসাদ উল্লাহ ও হাবিব এন্টারপ্রাইজের মালিক হাবিবুল ইসলাম। মামলায় ৬ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে।
কক্সবাজার ও বান্দরবান সীমান্তবর্তী গর্জনিয়া-নাইক্ষ্যংছড়ি সড়কসহ উখিয়া, ঈদগাঁও এবং মহেশখালীর বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ মাঝপথে বন্ধ করে দিয়েছেন ঠিকাদার আসাদ। কোটি কোটি টাকার এ সব সরকারি প্রকল্প দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় এলাকার সড়কগুলো এখন যাতায়াতের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ফলে চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন স্থানীয় হাজার হাজার সাধারণ মানুষ।
স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগী জনগণের অভিযোগ, গর্জনিয়া থেকে নাইক্ষ্যংছড়ি সংযোগ সড়কের সংস্কার ও উন্নয়ন কাজ বিশাল বাজেট বরাদ্দ নিয়ে শুরু হলেও মাঝপথে এসে হুট করেই তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। বর্তমানে সড়কের বিভিন্ন অংশে মাটি ও
খোয়া উপড়ে ফেলে রাখায় সামান্য বৃষ্টিতেই তা কাদা-পানিতে একাকার হয়ে যাচ্ছে। এ রুটে চলাচলকারী যাত্রী ও চালকদের প্রতিনিয়ত চরম ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে।
শুধু গর্জনিয়া-নাইক্ষ্যংছড়ি সড়কই নয়, ঠিকাদার আসাদের একই ধরণের খামখেয়ালিপনার চিত্র দেখা গেছে উখিয়া, ঈদগাঁও এবং মহেশখালীর একাধিক বড় প্রকল্পে। এ সব এলাকার গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাঘাট ও অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য সরকার কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দিলেও, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি ও উদাসীনতায় কাজগুলো থমকে আছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রাস্তাগুলোর কাজ যখন শুরু হয়েছিল, আমরা ভেবেছিলাম আমাদের দীর্ঘদিনের যাতায়াত সমস্যার সমাধান হবে। কিন্তু ঠিকাদার কাজ বন্ধ করে চলে যাওয়ার পর রাস্তাগুলোর অবস্থা আগের চেয়েও খারাপ হয়ে গেছে। এখন অসুস্থ রোগী বা গর্ভবতী মায়েদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া এক প্রকার অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোটি টাকার প্রকল্প এভাবে ফেলে রেখে সাধারণ মানুষকে কষ্ট দেওয়ার কোনো মানে হয় না।
ব্যবসায়ী ও চাকরিজীবীরা জানান, সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় তাদের দৈনন্দিন কাজ এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় ধরনের লোকসান গুনতে হচ্ছে। বিশেষ করে কৃষিপণ্য যথাসময়ে বাজারে পৌঁছাতে না পারায় প্রান্তিক চাষিরা চরম অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে স্থানীয় সচেতন মহল অবিলম্বে ঠিকাদার আসাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে, জনস্বার্থে কোটি টাকার এ প্রকল্পগুলোর কাজ অন্য কোনো যোগ্য ঠিকাদারের মাধ্যমে দ্রুত শেষ করে জনগণের ভোগান্তি দূর করার জোর দাবি তুলেছেন তারা।
প্রসঙ্গত, মামলার প্রধান আসামী মহেশখালী পৌরসভার সাবেক মেয়র মকছুদ মিয়ার বিরুদ্ধে এর আগেও দুর্নীতির নানা অভিযোগে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। তার মধ্যে, ২০২৫ সালের এপ্রিলে দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মামলার প্রধান আসামি মকছুদ মিয়া ও তার স্ত্রীর বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলেন ঢাকা মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত। সে সময় তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ লোপাটের অনুসন্ধান চলমান থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছিল দুদক।
কেকে/এআই