গাজীপুরের কাপাসিয়ায় শুভেচ্ছা মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডের প্রায় তিন কোটি টাকা নিয়ে সভাপতি আবুল হাসেম উধাও হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে জমা টাকা ফেরত পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন সমিতির শত শত সদস্য। বিষয়টি নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে গাজীপুর জেলা সমবায় অফিস।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বিকেলে গাজীপুর জেলা সমবায় কর্মকর্তা আরিফা সুলতানা শিপা খোলা কাগজকে বলেন, গতকাল ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
তদন্ত কমিটির সদস্যরা হলেন জেলা সমবায় অফিসের উপসহকারী নিবন্ধক মনিরা আখতার, পরিদর্শক মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম ও সহকারী পরিদর্শক রায়হান উদ্দিন।
সমবায় অফিস সূত্রে জানা যায়, ২০১০ সালে ১০৯৮ নম্বর নিবন্ধনের মাধ্যমে সমিতিটির কার্যক্রম শুরু হয়। পরে কাপাসিয়ার দুর্গাপুর ইউনিয়নসহ আশপাশের সাতটি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার মানুষকে এর সদস্য করা হয়।
গত ১৭ সেপ্টেম্বর সমিতির কার্যালয়ে তালা দিয়ে সভাপতি আবুল হাসেম চলে যাওয়ার পর থেকে অফিসটি বন্ধ রয়েছে বলে অভিযোগ সদস্যদের। সমিতির সদস্যদের দাবি, গত বছর সদস্য সংখ্যা ছিল ৪৯৬ জন। বর্তমানে তা প্রায় এক হাজারে পৌঁছেছে। ১৫ শতাংশ মুনাফার আশ্বাসে অনেকে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে সমিতিতে জমা রেখেছেন। তাদের দাবি, সমিতিতে বর্তমানে প্রায় ১০ কোটি টাকার মূলধন রয়েছে।
তবে সমবায় কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য ও আগের হিসাবের সঙ্গে সদস্যদের দাবির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা মাহফুজুল আমিন জানান, গ্রাহকদের তথ্য অনুযায়ী সভাপতি প্রায় তিন কোটি টাকা নিয়ে চলে গেছেন। তার মোবাইল ফোনও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।
তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত দুই সদস্য থানায় ও গাজীপুর আদালতে মামলা করেছেন। বিষয়টি নিয়ে সমবায় অফিসও তদন্ত করছে।
গত সোমবার কাপাসিয়ার রাওনাট বাজারে সমিতির কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, তিনতলা ভবনটির নিচের দোকানপাট এবং ওপরের তলায় থাকা সমিতির অফিস তালাবদ্ধ।
রাওনাট বাজার সমিতির সভাপতি সফিকুল আলম বলেন, আবুল হাসেম চলে যাওয়ার পর সদস্যরা জমা টাকা ফেরত পেতে প্রতিদিন সমিতির কার্যালয়ের সামনে অপেক্ষা করছেন। অনেকে তাদের সঞ্চয়ের টাকা হারানোর আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।
সমিতির সদস্য বরুন গ্রামের সালমা বেগম ও সুবর্ণা আক্তার জানান, তারা দুজন মিলে সমিতিতে ১ লাখ ৮ হাজার টাকা জমা রেখেছেন। একই অভিযোগ চাপাত মাঝিবাড়ি গ্রামের নিখিল দাসের। তার দাবি, সমিতিতে তার ২ লাখ ১০ হাজার টাকা জমা ছিল। ফুলবাড়িয়া গ্রামের এক সদস্য জানান, তার ৬ লাখ টাকা সমিতিতে জমা রয়েছে।
এদিকে, সমিতির কার্যক্রম ও তদারকি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কয়েকজন সদস্য। তাদের অভিযোগ, জেলা সমবায় অফিসের অধীন সমিতিগুলো নিয়মিত পরিদর্শন ও নির্বাচন করার কথা থাকলেও তা যথাযথভাবে হচ্ছে না। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে তদন্তের ফলাফল জানা প্রয়োজন।
জেলা সমবায় কর্মকর্তা আরিফা সুলতানা শিপা বলেন, সমিতিটি সম্পর্কে তার কাছে কোনো লিখিত অভিযোগ আসেনি। তিনি বলেন, “আমাদের অফিসে এ বিষয়ে কোনো কার্যকর জরিপ নেই। রেজিস্ট্রেশন দেওয়ার পর সমিতির কার্যক্রম পরিচালনার নিয়ম রয়েছে।”
সমিতির কার্যালয় বন্ধ থাকা এবং সদস্যদের টাকা ফেরত না পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি তার কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আসেনি। তবে অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, কোনো একজন সদস্য চলে গেলেই সমিতির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা নয়। সমিতি পরিচালনার জন্য একটি ব্যবস্থাপনা কমিটি থাকে। কার্যালয় তালাবদ্ধ থাকলে ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যরা নিয়ম অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেন।
সমিতির সভাপতি আবুল হাসেম কাপাসিয়া থানার দড়িমেরুন গ্রামের মৃত আব্দুল হাইয়ের ছেলে। তার বক্তব্য নেওয়ার জন্য যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে সমিতির প্রকৃত সদস্য সংখ্যা, মূলধন, আর্থিক লেনদেন এবং সভাপতির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য উঠে আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
কেকে/সাশ