রাজধানীর ভবন নির্মাণে রাজউকের অনুমোদিত নকশা ও নির্মাণবিধি মানা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তবে নিয়মটি মানা হয় না বললেই চলে। অনুমোদনের বাইরে তলা বাড়ানো হচ্ছে, ভবনের আয়তন ও ব্যবহার পাল্টে ফেলা হচ্ছে, কোথাও আবার অনুমোদন ছাড়াই স্থাপনা উঠছে। রাজউক নোটিস দেয়, জরিমানা করে, উচ্ছেদ অভিযান চালায়। কিন্তু এসবের ফল প্রায় কোথাও টেকে না। এ থেকে প্রশ্ন ওঠে, রাজউক কি আইন কার্যকর করছে, নাকি কেবল আইন প্রয়োগের আনুষ্ঠানিকতা সারছে। খোলা কাগজের প্রতিবেদন অনুযায়ি উত্তরার ১৭ নম্বর সেক্টরের ঘটনা এর স্পষ্ট উদাহরণ।
গত ১৭ আগস্ট সেখানে সরকারি জায়গা দখল করে গড়া ৭৩টি অবৈধ দোকান ও স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। কল্যাণ সমিতির ব্যানারে নির্মিত আরও প্রায় ২২টি স্থাপনাও সরানো হয়। কিন্তু এক সপ্তাহ পেরোনোর আগেই সেই জায়গায় বাঁশ ও টিন দিয়ে নতুন কাঠামো তৈরি শুরু হয়েছে। অর্থাৎ ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে আবার গড়ার কাজ চলছে। উচ্ছেদ অভিযান যদি দখলদারদের ফিরে আসা ঠেকাতে না পারে, তাহলে সেটি জনসম্পদ উদ্ধার নয়, একটি আনুষ্ঠানিক প্রদর্শনী হয়ে দাঁড়ায়।
সমস্যা শুধু অবৈধ দোকান বা অস্থায়ী কাঠামোর নয়। রাজউকের নিজের তথ্যেই ঢাকায় নকশা লঙ্ঘন করে নির্মিত ভবনের সংখ্যা ৩ হাজার ৩৮২। এত সংখ্যক ভবন কোনো একদিনে গড়ে ওঠেনি। প্রতিটি ভবনের নির্মাণ মাসের পর মাস চলেছে, আর সেই সময়ের মধ্যে রাজউকের ইমারত পরিদর্শকেরা নিশ্চয়ই সেসব এলাকায় গিয়েছেন। অভিযোগ আছে, অবৈধ নির্মাণের শুরুতেই ব্যবস্থা না নিয়ে দায়সারা নোটিস দিয়ে দায় শেষ করা হয়।
আরও গুরুতর অভিযোগ, মোটা অঙ্কের লেনদেনের মাধ্যমে কিছু কর্মকর্তা এসব অনিয়ম আড়াল করছেন। উত্তরার এক ভবনমালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে খোলা কাগজকে বলেছেন, তাকে কোনো নোটিসই দেওয়া হয়নি; বিষয়টি ইমারত পরিদর্শকের মাধ্যমে ‘ম্যানেজ’ করা হয়েছে। একজন ভবনমালিকের এই বক্তব্য যাচাই-বাছাই না করে চূড়ান্ত সত্য বলে ধরে নেওয়া যায় না। তবে এমন অভিযোগ উঠলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত রাজউকেরই দায়িত্ব। এখন পর্যন্ত সেই তদন্তের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যায়নি।
রাজউকের কর্মকর্তারা জনবলের সংকটের কথা বলেন। সংকট যে আছে, তা অস্বীকার করা যাবে না। একজন পরিদর্শকের পক্ষে বিপুলসংখ্যক ভবনের নিয়মিত তদারকি সত্যিই কঠিন। কিন্তু সীমিত জনবল কোনো জবাবদিহির বিকল্প হতে পারে না। জনবলের অভাব নির্মাণ শুরুর পর তদারকিতে বাধা হতে পারে। কিন্তু অনুমোদনহীন নির্মাণকাজ শুরুর সময়েই ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে সেটি কোনো অজুহাত নয়। আবার ভবনমালিকদের ‘সচেতন করা’ এবং ‘মোটিভেশনাল পরিকল্পনা’ নিয়ে রাজউকের সদস্য যে কথা বলেছেন, তাতে একটি সত্য আছে : শুধু শাস্তি দিয়ে সবকিছু ঠিক করা যায় না। কিন্তু যেখানে আইন ভাঙলে কার্যকর শাস্তি নেই, সেখানে সচেতনতার আহ্বান কতটা ফল দেবে?
এই ব্যর্থতার মূল্য কেবল আইনের শাসনের ক্ষতিতে সীমাবদ্ধ নয়; তার প্রভাব পড়ে নগরের পরিবেশ ও প্রতিবেশের ওপর। অনুমোদিত সীমার বাইরে তলা বাড়ালে জনসংখ্যার চাপ বাড়ে, যানবাহন ও পানি-বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যায়। এ অবস্থায় আমরা মনে করি, রাজউকের নিম্নলিখিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি :
ভাঙা স্থাপনা যাতে আবার গড়ে না ওঠে, সে জন্য উচ্ছেদের পর সেই জায়গায় নিয়মিত নজরদারি ও প্রয়োজনে স্থায়ী বেষ্টনী বা সাইনবোর্ড দিতে হবে। পুনর্দখলকারীদের বিরুদ্ধে আলাদা আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। নির্মাণ শুরুর প্রথম পর্যায়েই অনিয়ম শনাক্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণের একটি প্রক্রিয়া চালু করতে হবে। নকশা লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ইমারত পরিদর্শকের দায় নির্ধারণ করতে হবে।
ঘুষ ও যোগসাজশের অভিযোগ স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদন্তের আওতায় আনতে হবে। প্রমাণিত হলে দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক বিভাগীয় ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নিতে হবে। ৩ হাজার ৩৮২টি অবৈধ ভবনের তালিকা, ব্যবস্থার অগ্রগতি এবং কার্যক্রমের ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। এতে জবাবদিহি বাড়বে।
জনবলের সংকট কাটাতে প্রযুক্তির ব্যবহার, যেমন স্যাটেলাইট চিত্র, ড্রোন ও অনলাইন অভিযোগ ব্যবস্থা, বাড়াতে হবে। প্রয়োজনে পরিদর্শক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে। নকশা লঙ্ঘনকারী ভবনের ক্ষেত্রে পরিবেশগত প্রভাব, অর্থাৎ খোলা জায়গা, নিষ্কাশন ও সবুজ এলাকার ক্ষতি, বিবেচনায় নিয়ে শাস্তি ও প্রতিকার নির্ধারণ করতে হবে।
রাজউকের দায়িত্ব রাজধানীকে বাসযোগ্য রাখা। এই দায়িত্ব নোটিস দেওয়া কিংবা কয়েক দিনের উচ্ছেদ অভিযানে পালিত হয় না। যতক্ষণ ভাঙার পর আবার গড়া থামানো না যাচ্ছে, যতক্ষণ অনিয়মের সহযোগী কর্মকর্তারা জবাবদিহির বাইরে থাকছেন, ততক্ষণ রাজউকের অভিযান কেবল লোকদেখানোই থেকে যাবে।
কেকে/এআই