শরতের নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, কাশফুলের দোলা আর দূর থেকে ভেসে আসা ঢাকের বাদ্যি—বাঙালির কাছে দুর্গাপূজা শুধু ধর্মীয় আচার নয়; এটি যেন ঘরে ফেরার এক চিরন্তন আবেগ। দেবীর আগমনকে ঘিরে আনন্দ, উৎসব আর মিলনের আবহ ছড়িয়ে পড়ে শহর থেকে গ্রাম, বনেদি বাড়ি থেকে সর্বজনীন মণ্ডপে।
কিন্তু এই উৎসবের শিকড় কোথায়? কেন শরৎকালের দুর্গাপূজাকে বলা হয় ‘অকালবোধন’? রামচন্দ্রই বা কীভাবে দেবীর আরাধনা করেছিলেন? আর বনেদি পরিবারের অন্দরমহল পেরিয়ে কীভাবে দুর্গাপূজা হয়ে উঠল সর্বজনীন উৎসব?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে মিশে যায় পুরাণ, ইতিহাস, লোকবিশ্বাস ও বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতির দীর্ঘ পথচলা।
পুরাণে দেবীর আবির্ভাব
দেবী মহাত্ম্যসহ শাক্ত পুরাণধারায় দুর্গা মহিষাসুরমর্দিনী—দেবতাদের সম্মিলিত শক্তির প্রকাশ। মহিষাসুরের অত্যাচার থেকে দেবতাদের রক্ষা করতে দেবীর আবির্ভাব এবং তাঁর হাতে অসুরবধই দুর্গার আরাধনার অন্যতম প্রধান পৌরাণিক ভিত্তি।
তবে আজকের বাঙালি দুর্গাপূজার রীতিকে কোনো একটি প্রাচীন গ্রন্থের সরাসরি ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পুরাণ, স্মৃতিশাস্ত্র, আঞ্চলিক কাব্য, ধর্মীয় আচার ও লোকসংস্কৃতির নানা উপাদান মিশে বর্তমান রীতির বিকাশ ঘটেছে।
রামের অকালবোধন—পুরাণ ও কৃত্তিবাসের কাহিনি
শরৎকালে দুর্গার আরাধনাকে বলা হয় ‘অকালবোধন’। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়ার আগে রামচন্দ্র দেবীর আশীর্বাদ লাভের জন্য শরৎকালে তাঁর বোধন ও পূজা করেন।
বাংলায় কৃত্তিবাসী রামায়ণের মাধ্যমে এই কাহিনি বিশেষ জনপ্রিয়তা পায়। সেখানে রাম ১০৮টি নীলপদ্ম দিয়ে দেবীর আরাধনা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু একটি পদ্ম কম পড়ে গেলে ‘পদ্মলোচন’ রাম নিজের একটি চোখ উৎসর্গ করতে উদ্যত হন। তাঁর ভক্তিতে সন্তুষ্ট হয়ে দেবী তাঁকে আশীর্বাদ করেন—এমনই বর্ণনা রয়েছে কৃত্তিবাসী রামায়ণে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দিক রয়েছে। বাল্মীকি রামায়ণে রামের দুর্গাপূজার এই কাহিনি নেই। পরবর্তী পুরাণধারা ও বাংলা রামায়ণ-পরম্পরায় এই কাহিনি বিকশিত ও জনপ্রিয় হয়েছে।
বনেদি বাড়ি থেকে বারোয়ারি, তারপর সর্বজনীন
বাংলায় দুর্গাপূজার ইতিহাস নিয়ে নানা মত রয়েছে। জমিদার ও রাজপরিবারের পৃষ্ঠপোষকতায় ষোড়শ ও সপ্তদশ শতক থেকেই বড় আকারের পূজার ঐতিহ্য গড়ে ওঠে।
কলকাতার বারিশায় সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের দুর্গাপূজা ১৬১০ সাল থেকে হয়ে আসছে বলে ঐতিহ্যগতভাবে উল্লেখ করা হয়। পরে ধীরে ধীরে বনেদি পরিবারের গণ্ডি পেরিয়ে দুর্গাপূজা সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের উৎসবে রূপ নিতে শুরু করে।
হুগলির গুপ্তিপাড়ায় ১৭৯০ সালের দিকে ১২ জনের উদ্যোগে চাঁদা তুলে যে পূজার আয়োজন হয়েছিল, সেটিকে বারোয়ারি পূজার গুরুত্বপূর্ণ পূর্বসূরি হিসেবে ধরা হয়।
এরপর বিশ শতকের শুরুতে কলকাতায় সংগঠিত জনসাধারণের পূজার পরিসর আরও বিস্তৃত হয়। ১৯১০ সালে বাগবাজার-বউবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় জনসম্পৃক্ত পূজার উদ্যোগ দেখা যায়। ১৯২৬ সালের সিমলা ব্যায়াম সমিতির পূজাও জাতীয়তাবাদী জনপরিসরের সঙ্গে দুর্গাপূজার সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করে।
দেবীর পাশে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ কেন?
বাঙালি দুর্গাপ্রতিমার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো দেবীর দুই পাশে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশের অবস্থান। লোকপ্রচলিত ব্যাখ্যায় তাঁরা দেবীর সন্তান।
লক্ষ্মী ঐশ্বর্য ও সমৃদ্ধির, সরস্বতী বিদ্যা ও জ্ঞানের, কার্তিক বীরত্ব ও সামরিক শক্তির এবং গণেশ সিদ্ধি, বুদ্ধি ও শুভারম্ভের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।
তাঁদের বাহনের মধ্যেও রয়েছে প্রতীকী তাৎপর্য। লক্ষ্মীর বাহন পেঁচা, সরস্বতীর রাজহাঁস, কার্তিকের ময়ূর এবং গণেশের ইঁদুর। ফলে প্রতিমার প্রতিটি উপাদানই যেন আলাদা একটি প্রতীকী ভাষা বহন করে।
গণেশের পাশে ‘কলা বউ’ আসলে কে?
লালপাড় সাদা শাড়িতে ঘোমটা দেওয়া কলাগাছকে অনেকেই ‘কলা বউ’ নামে চেনেন এবং গণেশের স্ত্রী বলে মনে করেন। কিন্তু শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যায় এটি নবপত্রিকা—নয়টি উদ্ভিদের সমষ্টি, যার প্রধান উপাদান কলাগাছ।
কলা, কচু, হলুদ, জয়ন্তী, বেল, ডালিম, অশোক, মানকচু প্রভৃতি উদ্ভিদকে দেবীর বিভিন্ন শক্তির প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। সপ্তমীর সকালে নবপত্রিকার স্নান ও প্রতিষ্ঠা দুর্গাপূজার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আচার।
বেলতলায় বোধন কেন?
ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মাধ্যমে দেবীকে আনুষ্ঠানিকভাবে জাগ্রত ও আহ্বান করা হয়। বহু প্রথায় বেলগাছের নিচে অথবা বেলশাখাকে কেন্দ্র করে এই বোধন সম্পন্ন হয়।
বেল শিব ও শক্তি-উপাসনার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই বাংলার পূজাচারে বেলতলা দেবীর আবাহনের পবিত্র স্থান হিসেবে বিশেষ মর্যাদা পেয়েছে। বোধনের পর দেবীকে মণ্ডপে প্রতিষ্ঠা করা হয়।
ষষ্ঠী থেকে দশমী—পাঁচ দিনের আচার
ষষ্ঠীতে বোধন ও অধিবাস, সপ্তমীতে নবপত্রিকা স্নান ও প্রতিষ্ঠা, অষ্টমীতে মহাপূজা ও সন্ধিপূজা, নবমীতে মহানবমীর আরাধনা এবং দশমীতে বিসর্জনের মধ্য দিয়ে মূল উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়।
পুরোহিতেরা নির্দিষ্ট বিধি অনুযায়ী মন্ত্রোচ্চারণ, সংকল্প, ঘটস্থাপন, প্রাণপ্রতিষ্ঠা, পুষ্পাঞ্জলি, হোম ও আরতির মাধ্যমে পূজা সম্পন্ন করেন।
সন্ধিপূজার সময়টিও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। অষ্টমীর শেষ ২৪ মিনিট এবং নবমীর প্রথম ২৪ মিনিট—মোট ৪৮ মিনিটকে সন্ধিক্ষণ হিসেবে ধরা হয়। প্রচলিত রীতিতে এ সময় ১০৮টি পদ্ম ও ১০৮টি প্রদীপ নিবেদনের প্রথা রয়েছে।
রামের ১০৮ পদ্মের কাহিনির সঙ্গে এই সংখ্যার পৌরাণিক ব্যাখ্যা যুক্ত হলেও ১০৮ সংখ্যাটির ধর্মীয় গুরুত্ব আরও বিস্তৃত।
পূজার উপকরণে এত বৈচিত্র্য কেন?
অঞ্চল ও পরিবারভেদে দুর্গাপূজার উপকরণে কিছুটা পার্থক্য থাকলেও সাধারণত ঘট, নারকেল, আম্রপল্লব, বেলপাতা, দূর্বা, আতপচাল, ফুল, ধূপ, প্রদীপ, ফল, মিষ্টান্ন, বস্ত্র, সিঁদুর, হলুদ, কুমকুম, পান-সুপারি, বিভিন্ন শস্য ও নৈবেদ্য ব্যবহার করা হয়।
নারকেলসহ ঘট মঙ্গল, পূর্ণতা ও জীবনীশক্তির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। এসব উপকরণ শুধু পূজার আনুষ্ঠানিক অংশ নয়; এর অনেকগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃষিজীবন, প্রকৃতি ও বাংলার লোকসংস্কৃতির দীর্ঘ সম্পর্ক।
‘বেশ্যাদ্বারমৃত্তিকা’র তাৎপর্য কী?
দুর্গাপূজার কিছু বিশেষ পদ্ধতিতে ‘বেশ্যাদ্বারমৃত্তিকা’ নামে পরিচিত উপাদানের ব্যবহার দেখা যায়। এটি পতিতালয়ের দ্বারের মাটি।
প্রচলিত লোকবিশ্বাসে, সমাজ যাকে ‘অপবিত্র’ বলে দূরে সরিয়ে রাখে, সেই স্থান ও মানুষের অস্তিত্বও দেবীর পূজার পরিসরে প্রতীকীভাবে স্বীকৃতি পায়। এর মধ্য দিয়ে সমাজের প্রান্তিক নারীদের অস্তিত্ব ও মর্যাদার একটি প্রতীকী স্বীকৃতি খুঁজে নেওয়া হয়।
তবে এটি প্রতিটি দুর্গাপূজায় বাধ্যতামূলক উপাদান নয়। অঞ্চল, পরিবার ও পূজার পদ্ধতি অনুযায়ী এ বিষয়ে ভিন্নতা রয়েছে।
প্রতিমা বিসর্জনে শেষ হয় না উৎসব
দশমীর বিসর্জনে মৃন্ময়ী প্রতিমা ফিরে যায় জলে। শেষ হয় কয়েক দিনের আনুষ্ঠানিকতা। কিন্তু রয়ে যায় বোধনের মন্ত্র, ঢাকের শব্দ, সিঁদুরের রং আর অশুভের বিরুদ্ধে শুভশক্তির জয়ের বিশ্বাস।
এই কারণেই দুর্গাপূজা কেবল দেবীর আরাধনা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাস, পুরাণ, লোকবিশ্বাস, কৃষিজীবন, শিল্প, সমাজ ও বাঙালির সমষ্টিগত স্মৃতি। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বদলাতে বদলাতে এই উৎসব আজ বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনের এক অনিবার্য অংশ হয়ে উঠেছে।
কেকে/সাশ