চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের আওতাধীন হারবাং বনবিটে সংরক্ষিত বনভূমি দখল করে একের পর এক ছনখোলা গড়ে ওঠার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, বনভূমি দখলের আগে কেটে ফেলা হচ্ছে বনজ ও ফলজসহ বিভিন্ন প্রজাতির ছোট-বড় গাছ। পরে পরিষ্কার করা জায়গায় তৈরি করা হচ্ছে ছনখোলা। এতে একদিকে বন উজাড় হচ্ছে, অন্যদিকে ধীরে ধীরে দখলে চলে যাচ্ছে সংরক্ষিত বনভূমি।
বন বিভাগের তথ্যমতে, হারবাং অভয়ারণ্য এলাকায় সংরক্ষিত ও রক্ষিত বনের পরিমাণ ২ হাজার ৬২১ দশমিক ৯৫ একর। এর মধ্যে সরকারি হিসাবে জবরদখলের পরিমাণ ২৫১ দশমিক ১১ একর।
তবে স্থানীয়দের দাবি, বাস্তবে দখলের পরিমাণ ৫০০ একরের বেশি। সরেজমিনে অন্তত ১৫টি এলাকায় প্রায় ১০০ একর বনভূমিতে ছনখোলা গড়ে ওঠার চিত্র দেখা গেছে। হারবাং অভয়ারণ্য বনবিটের মগঘোনা, চিতার বিল, বনাঘোনা ও পশ্চিম ভিলেজার পাড়ার দক্ষিণে ছড়িয়ে রয়েছে এ সব ছনখোলা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, হারবাং স্টেশনের জোবাইর মাঝি নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে কোনো কোনো দখলদারের কাছ থেকে প্রতি একর বছরে ৫-১০ হাজার টাকা ‘গোপন খাজনা’ নিয়ে দখলদারদের বনভূমি ধ্বংসে সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে।
গয়ালমারার পশ্চিমে মগপাড়া বিল ও চিতার বিল এলাকায় প্রায় ৩০ একর বনভূমিতে গাছ কাটার পর ছনখোলা তৈরির চিহ্ন দেখা গেছে। স্থানীয়দের দাবি, উত্তর হারবাং মধ্য বৃন্দাবনখীল এলাকার মৃত নূর আহমদের ছেলে মাহমুদুল হকের দখলে রয়েছে এ সব বনভূমি। বনাঘোনা এলাকাতেও বড় একটি অংশ দখলে রেখে ছনখোলা তৈরির অভিযোগ রয়েছে উত্তর হারবাং করমমুহুরী পাড়ার মৃত শহর আলীর ছেলে আবদুল আজিজ ও একই এলাকার ফাতেমা বেগমের বিরুদ্ধে।
এ ছাড়া গয়ালমারা এলাকার মোহাম্মদ আলী, মো. গফুর, উত্তর হারবাং ভিলেজার পাড়ার হাকিম আলী ও মো. শফি এবং ভান্ডারীর ডেপার আব্দুস শুক্কুরসহ আরও কয়েকজনের দখলে প্রায় ৫০ একর বনভূমি রয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
স্থানীয়রা জানান, ছনখোলা তৈরির আগে ছোট-বড় গাছ কেটে জায়গা পরিষ্কার করা হয়। এতে সেগুন, গর্জনসহ পুরোনো গাছ কমার পাশাপাশি বন্যপ্রাণীর খাদ্য ও আশ্রয়স্থলও নষ্ট হচ্ছে। বন বিভাগের পুরোনো ব্যবস্থাপনা প্রতিবেদনেও চুনতি এলাকায় বড় গাছের অবক্ষয় ও অবৈধভাবে গাছ কাটার বিষয়টি উঠে এসেছে।
চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য এশিয় হাতির গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল ও চলাচলের করিডোর হিসেবে পরিচিত। বনভূমি দখল, খণ্ডিত হওয়া ও বন অবক্ষয় হাতির আবাসস্থলের জন্য হুমকি তৈরি করছে বলে বন ব্যবস্থাপনা নথিতে উল্লেখ রয়েছে। বনভূমি কমে যাওয়ায় হাতিসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণী লোকালয়ে চলে আসার ঝুঁকিও বাড়ছে বলে স্থানীয়দের আশঙ্কা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কোনো কোনো এলাকায় ছন কাটার পর আগুনও দেওয়া হয়। এতে বনজ উদ্ভিদ ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অভয়ারণ্য এলাকায় বনভূমি দখল ও গাছ কাটার পাশাপাশি রেললাইন থাকায় হাতি ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে বলে স্থানীয়রা জানান।
স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, হারবাং অভয়ারণ্য বনবিট কর্মকর্তা কবির হোসেন যোগদানের পর থেকে এ বিটে বনভূমি দখল, গাছ কাটা ও পাহাড় কাটার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। বনভূমি রক্ষায় নজরদারি ও কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় দখলদাররা আরও উৎসাহিত হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের। বন বিভাগের নথিতে জবরদখলের তথ্য থাকার পরও এসব দখল দীর্ঘদিন ধরে কীভাবে টিকে আছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে চিহ্নিত দখলদার মাহমুদুল হক জানান, তার বাবা বন বিভাগের বনপ্রহরী হিসেবে কর্মরত থাকায় হারবাং অভয়ারণ্য বনবিটের কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার পরিচয় ও সখ্যতা গড়ে ওঠে। সেই সুবাদে তিনি কিছু জায়গা দখলে নিয়ে পরিচর্যা করে সেখানে ছনখোলা তৈরি করেছেন। তবে দখলকৃত সব ছনখোলা তার নয় দাবি করে তিনি বলেন, অন্য ব্যক্তিরাও তার নাম ব্যবহার করে এ সব জায়গা দখল ও বিক্রি করছেন।
হারবাং অভয়ারণ্য বনবিট কর্মকর্তা কবির হোসেনের কাছে এ সব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি প্রথমে বিষয়টি অস্বীকার করার চেষ্টা করেন। পরে তিনি বলেন, ‘বনায়নের প্রয়োজন হলে দখলকৃত জায়গাগুলো উদ্ধার করে সেখানে বনায়ন করা হবে।’
চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য রেঞ্জ কর্মকর্তা আনিসুজ্জামান শেখের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ চট্টগ্রামের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবু নাছের মো. ইয়াছিন নেওয়াজ বলেন, ‘বনভূমি দখল করে ছনখোলা করার ব্যাপারে খবর পাওয়ার পরপরই তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
কেকে/এআই