কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের কাছে ঝিলংজা ইউনিয়নের চান্দেরপাড়ায় নির্মিত হয়েছে ঝিনুক আকৃতির দৃষ্টিনন্দন ছয়তলা আইকনিক রেলস্টেশন। ২৯ একর জায়গার ওপর গড়ে তোলা ১ লাখ ৮৭ হাজার বর্গফুটের এই রেলস্টেশন ইতোমধ্যে উদ্বোধন করা হয়েছে। সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে দোহাজারী-কক্সবাজার ১০১ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় কক্সবাজার আইকনিক স্টেশন ভবন নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ২১৫ কোটি টাকা।
নতুন এই রেলস্টেশনে তারকা মানের হোটেল, শপিংমল, রেস্তোরাঁ, শিশুযত্ন কেন্দ্র, লাগেজ রাখার লকারসহ অত্যাধুনিক বিভিন্ন সুবিধা থাকার কথা। দৈনিক ৪৬ হাজার যাত্রীর ধারণক্ষমতার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এই স্টেশনে ডাকঘর, কনভেনশন সেন্টার, তথ্যকেন্দ্র, এটিএম বুথ ও প্রার্থনার স্থানও থাকার কথা রয়েছে।
তবে উদ্বোধনের প্রায় তিন বছর হতে চললেও এখনো এসব আধুনিক যাত্রীসেবা চালু হয়নি। বর্তমানে শুধু যাত্রীদের ওঠানামা ও ট্রেন পরিচালনার কার্যক্রম চলছে। স্টেশন ভবনে যে সুযোগ-সুবিধার কথা বলা হয়েছিল, সেগুলোর অধিকাংশই এখনো চালু না হওয়ায় হতাশ যাত্রীরা।
দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ উদ্বোধন হয় ২০২৩ সালের ১১ নভেম্বর। উদ্বোধনের পর ১ ডিসেম্বর প্রথম ট্রেন চলাচল শুরু হয় পর্যটন নগরী কক্সবাজারে। এর এক মাস পর ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে চালু হয় পর্যটক এক্সপ্রেস। কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল শুরুর প্রায় তিন বছর হলেও দেশের একমাত্র আইকনিক রেলস্টেশনটির পূর্ণাঙ্গ অপারেশনাল কার্যক্রম এখনো শুরু করতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা।
রেলস্টেশনের পাশ দিয়ে ট্রেনে ওঠানামার ব্যবস্থা করা হলেও স্টেশন ভবনের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন যাত্রীরা।
গত আগস্টে রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ বলেছিলেন, ওই মাসেই ঢাকা-কক্সবাজার রুটে আরও এক জোড়া নতুন আন্তনগর ট্রেন চালু করা হবে। একই সঙ্গে দেশের অন্যতম আধুনিক কক্সবাজার আইকনিক রেলস্টেশনকে পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর লক্ষ্যে এর পরিচালনার দায়িত্ব একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে দেওয়ার কথাও জানিয়েছিলেন তিনি।
ঢাকা থেকে ট্রেনে কক্সবাজারে আসা ফায়সাল বলেন, ‘ট্রেনের জার্নি অসাধারণ। কিন্তু কক্সবাজার স্টেশনে নেমে একটু হতাশ হয়েছি। স্টেশনটি চালু হওয়ার প্রায় তিন বছর হলেও এখানে যেসব সুবিধা থাকার কথা, তার অনেক কিছুই এখনো চালু হয়নি। আশা করছি, প্রশাসন বিষয়টি নজরে রাখবে। কারণ এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন এলাকা।’
আধুনিক ও দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যে নির্মিত এশিয়ার অন্যতম এই রেলস্টেশন ঘিরে রেলযাত্রীদের অনেক প্রত্যাশা রয়েছে। পুরোপুরি চালু হলে স্টেশন ভবনে যাত্রীদের জন্য বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার কথা। বিশেষ করে থাকা-খাওয়ার জন্য তারকা মানের হোটেল, রেস্তোরাঁ, শপিংমল, কমিউনিটি সেন্টার, মালামাল রাখার লকার, শিশুযত্ন কেন্দ্র, মসজিদসহ অত্যাধুনিক বিভিন্ন সুবিধা থাকার কথা রয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, কেউ চাইলে রাতের ট্রেনে কক্সবাজার এসে সকালে স্টেশনে মালামাল রেখে দিনভর সমুদ্রসৈকতসহ বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র ঘুরে রাতে আবার ট্রেনে ফিরে যেতে পারবেন। কিন্তু ট্রেন চলাচল শুরুর প্রায় তিন বছর পরও স্টেশন ভবনটি সীমিত পরিসরে চালু থাকায় পূর্ণাঙ্গ সেবা পাচ্ছেন না যাত্রীরা। এতে পর্যটন নগরী কক্সবাজারে আসা ট্রেনযাত্রীরা স্টেশনের কাঙ্ক্ষিত সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
স্টেশন ভবনে আন্তর্জাতিক মানের সেবা নিশ্চিত করতে হোটেল, শপিংমল ও কমিউনিটি সেন্টার বেসরকারিভাবে টেন্ডারের মাধ্যমে পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল রেলওয়ে।
জানা গেছে, আইকনিক স্টেশনের নিচতলা ও দ্বিতীয় তলায় রেলওয়ের অপারেশনাল কার্যক্রম চলবে। তৃতীয় তলায় শপিংমল, চতুর্থ তলায় তারকা মানের হোটেল এবং পঞ্চম তলায় কমিউনিটি সেন্টার পরিচালনার জন্য বেসরকারি খাতে লিজ দেওয়ার চিন্তাভাবনা চলছে। হোটেল, শপিংমল ও কমিউনিটি সেন্টারে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, তারকা মানের হোটেল, শপিংমল ও কমিউনিটি সেন্টার পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল রেলওয়ের নেই। এ কারণে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে এসব স্থাপনা বেসরকারি খাতে লিজ দেওয়ার বিষয়ে ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে চিন্তাভাবনা চলছে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আ. মান্নান বলেন, ‘গত মাসে প্রতিমন্ত্রী মহোদয় এসে সবকিছু দেখে গেছেন। যেহেতু এটি রেল কর্তৃপক্ষের অধীনে, তারা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বলে আশা করছি। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা থাকবে।’
কক্সবাজার আইকনিক রেলওয়ে স্টেশনের দায়িত্বে থাকা স্টেশন মাস্টার জয়নাল আবেদিন বলেন, ‘এই স্টেশনে যেসব সুবিধা রয়েছে, সেগুলো টেন্ডারের মাধ্যমে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়া হবে। টেন্ডারের কাজ শেষ হলেই রেলস্টেশন ভবনটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পাবে। তবে বর্তমানে যাত্রীদের সুবিধার জন্য আমরা দ্বিতীয় তলা ব্যবহার করছি, যাতে যাত্রীদের কোনো ধরনের সমস্যায় পড়তে না হয়। আধুনিক সুবিধাগুলো শিগগিরই চালু হবে বলে আশা করছি।’
কেকে/ এমএস