ব্রহ্মপুত্রের বুক চিরে পাশাপাশি ছুটছিল একের পর এক নৌকা। মাঝিদের ছন্দময় বৈঠার আঘাতে মুহূর্তেই বাড়ছিল নৌকার গতি। কখনো একটি নৌকা এগিয়ে যাচ্ছে, আবার পরক্ষণেই আরেকটি নৌকা পাল্লা দিয়ে সামনে চলে আসছে। নদীর দুই পাড় থেকে ভেসে আসছিল করতালি, হর্ষধ্বনি আর উচ্ছ্বাসের শব্দ। কেউ মুঠোফোনে ধারণ করছিলেন নৌকার দৌড়, কেউ আবার পছন্দের নৌকাকে উৎসাহ দিতে দিচ্ছিলেন নানা স্লোগান ও চিৎকার।
বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলেও কমেনি দর্শনার্থীদের উচ্ছ্বাস। নৌকার ছুটে চলা, বৈঠার ছন্দ আর মানুষের আনন্দ-উল্লাসে কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ার ব্রহ্মপুত্রের দুই পাড় পরিণত হয় মিলনমেলা ও উৎসবের প্রাঙ্গণে।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) বিকালে পাকুন্দিয়া উপজেলার দক্ষিণ চরটেকী মিনি কক্সবাজার এলাকার ব্রহ্মপুত্র নদে অনুষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ ঘিরে এমনই উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। দক্ষিণ চরটেকী গ্রামবাসীর উদ্যোগে আয়োজিত এ নৌকাবাইচ দেখতে নদীর দুই পাড়ে জড়ো হন হাজারো নারী-পুরুষ, শিশু, তরুণ-তরুণী ও বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষ।
দীর্ঘদিন পর এলাকায় নৌকাবাইচের আয়োজন হওয়ায় শুধু স্থানীয় বাসিন্দারাই নন, আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও মানুষ ছুটে আসেন। অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে প্রতিযোগিতা উপভোগ করেন। কেউ এসেছেন আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে, আবার কেউ শুধু নৌকাবাইচ দেখতেই দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে এসেছেন।
নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই দক্ষিণ চরটেকী মিনি কক্সবাজার এলাকায় মানুষের আনাগোনা শুরু হয়। বিকেল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নদীর দুই পাড়ে বাড়তে থাকে মানুষের ভিড়। শিশুদের উচ্ছ্বাস, তরুণদের আনন্দ আর বয়োজ্যেষ্ঠদের পুরোনো দিনের স্মৃতিচারণে পুরো এলাকায় তৈরি হয় ভিন্নরকম আবহ।
আয়োজকরা জানান, এবারের প্রতিযোগিতায় ছোট-বড় মিলিয়ে মোট আটটি নৌকা অংশ নেয়। নির্ধারিত পথ পাড়ি দিতে গিয়ে প্রতিটি নৌকার মাঝিদের মধ্যে চলে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা। বৈঠার ছন্দে ছন্দে নৌকাগুলো যখন নদীর বুক দিয়ে ছুটে চলে, তখন দর্শকদের করতালি ও হর্ষধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে নদীর দুই পাড়।
তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ প্রতিযোগিতা শেষে প্রথম স্থান অর্জন করে কটিয়াদী উপজেলার করগাঁও এলাকার দুলাল চেয়ারম্যানের নৌকা। দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে একই এলাকার হাবিবুর রহমান জালাল মিয়ার নৌকা। তৃতীয় হয় পাকুন্দিয়া উপজেলার বাহাদিয়া এলাকার ইসমাইলের নৌকা।
প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জনকারী দলকে পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হয় একটি মোটরসাইকেল। দ্বিতীয় স্থান অর্জনকারী দল পায় একটি রেফ্রিজারেটর এবং তৃতীয় স্থান অর্জনকারী দলকে দেওয়া হয় একটি এলইডি টেলিভিশন। এ ছাড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া অন্য নৌকার দলগুলোকেও সান্ত্বনা পুরস্কার দেওয়া হয়।
নৌকাবাইচের আয়োজনকে ঘিরে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে প্রতিযোগিতা উপভোগ করেন কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মো. জালাল উদ্দিন। এর আগে নৌকাবাইচের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন পাকুন্দিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রূপম দাস।
উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ভিপি মো. কামাল উদ্দিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পাকুন্দিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম আরিফুর রহমান, উপজেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক তৌফিকুল ইসলাম, যুগ্ম আহ্বায়ক আতিকুর রহমান মাসুদ এবং পৌর বিএনপির সভাপতি এসএএম মিনহাজ উদ্দিন।
স্থানীয়রা বলেন, একসময় কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন নদ-নদী ও জলাশয়ে বর্ষা মৌসুমে নিয়মিত নৌকাবাইচের আয়োজন করা হতো। নৌকাবাইচ ছিল গ্রামীণ মানুষের বিনোদনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। সময়ের সঙ্গে নদ-নদীতে নৌযান চলাচলের পরিবর্তন, জলাশয় সংকোচনসহ নানা কারণে এ ধরনের আয়োজন কমে এসেছে। ফলে নৌকাবাইচের মতো লোকজ ঐতিহ্যকে ঘিরে কোনো আয়োজন হলে সেখানে মানুষের আগ্রহও দেখা যায় ব্যাপকভাবে।
নৌকাবাইচ দেখতে মঙ্গলবাড়িয়া এলাকা থেকে আসেন নওশাদ আলম বাপ্পী। তিনি বলেন, ‘এখানে আমার ফুফুর বাড়ি। আমি এখানেই বড় হয়েছি। ছোটবেলায় নৌকাবাইচ দেখেছি। এবার সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে আবারও দেখতে এসেছি। নৌকাবাইচ দেখে খুব ভালো লাগছে। পরিবার নিয়ে এমন আয়োজন উপভোগ করার সুযোগ পাওয়া আনন্দের।’
গফরগাঁও উপজেলার দত্তের বাজার এলাকা থেকে নৌকাবাইচ দেখতে আসা সবেদ আলী বলেন, ‘এখানে নৌকাবাইচ দেখতে এসেছি। নদীর দুই পাড়ে অনেক মানুষের ভিড় হয়েছে। অনেক দিন পর এমন আয়োজন দেখতে পেরে খুবই আনন্দ লাগছে। নৌকার প্রতিযোগিতা ও মানুষের উচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে চমৎকার পরিবেশ তৈরি হয়েছে।’
বাহাদিয়া এলাকার বয়োজ্যেষ্ঠ নিজাম উদ্দিন বলেন, ‘একসময় আমাদের এলাকায় প্রচুর নৌকাবাইচ হতো। বর্ষাকাল এলেই বিভিন্ন নদী ও খালে নৌকাবাইচের আয়োজন করা হতো। এখন আগের মতো আর দেখা যায় না। লোকমুখে শুনে এখানে নৌকাবাইচ হচ্ছে, তাই দেখতে চলে এসেছি। পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ে গেল।’
আয়োজক কমিটির পক্ষে কুতুব উদ্দিন কিরণ বলেন, ‘নৌকাবাইচ গ্রামবাংলার একটি ঐতিহ্যবাহী আয়োজন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ঐতিহ্য অনেকটাই হারিয়ে যেতে বসেছে। আমাদের মূল উদ্দেশ্য হলো গ্রামের মানুষকে বিনোদনের সুযোগ করে দেওয়া এবং নতুন প্রজন্মের সঙ্গে এই ঐতিহ্যের পরিচয় করিয়ে দেওয়া। নৌকাবাইচ দেখতে হাজারো মানুষ নদীর দুই পাড়ে এসেছেন। মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে আমরা আনন্দিত। ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে এ আয়োজন করার ইচ্ছা রয়েছে।’
কেকে/ এমএস