পৌনে ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে শুরু হওয়া সড়ক সংস্কার প্রকল্পের নির্ধারিত সময় শেষ হলেও কাজ হয়েছে মাত্র ২০ শতাংশ। দীর্ঘদিন ধরে কাজ বন্ধ থাকায় মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের রাধানগর-মোহাজেরাবাদ সড়কজুড়ে তৈরি হয়েছে বড় বড় খানাখন্দ। কাদা-পানিতে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দা, পর্যটক ও কৃষিপণ্য পরিবহনকারীরা। কাজ ফেলে রাখার অভিযোগে ইতোমধ্যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে শোকজ করেছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)।
চুক্তির তোয়াক্কা না করে কাজ ফেলে সটকে পড়ার দায়ে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কড়া কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিস দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। বেঁধে দেওয়া ৩ কার্যদিবসের মধ্যে সন্তোষজনক জবাব ও দ্রুত কাজ শেষের লিখিত রোডম্যাপ জমা না দিলে ব্যাংকে জমা থাকা লাখ লাখ টাকার জামানত এক নিমিষে বাজেয়াপ্ত, চুক্তি বাতিল এবং প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স চিরতরে কালো তালিকাভুক্ত (ব্ল্যাকলিস্ট) করার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
মৌলভীবাজার এলজিইডি নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গ্রাম সড়ক পুনর্বাসন প্রকল্পের আওতায় শ্রীমঙ্গলের প্রায় ৬ কিলোমিটার সড়ক নতুন রূপে সাজানোর চুক্তি পায় বরিশালের মেসার্স কোহিনুর এন্টারপ্রাইজ। যার প্রোপ্রাইটর: মেহেদী হাসান চৌধুরী। চুক্তি অনুযায়ী, গত ১৫ এপ্রিল কাজ শুরু করে চলতি বছরের ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে পুরো কাজ বুঝিয়ে দেওয়ার কথা ছিল।
অথচ বাস্তবে কাজের চিত্র পুরো উল্টো। গত ১২ সেপ্টেম্বর শ্রীমঙ্গল এলজিইডির উপসহকারী প্রকৌশলী সঞ্জয় কুমার পণ্ডিত সরেজমিনে পরিদর্শনে গিয়ে আঁতকে ওঠেন। পুরো প্রকল্প এলাকা অরক্ষিত ও পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। কাজের সাইটে কোনো শ্রমিক তো দূরের কথা, ঠিকাদারের একজন প্রতিনিধিকেও খুঁজে পাওয়া যায়নি।
অহেতুক টানা ২৮ দিনের বেশি কাজ বন্ধ রাখাকে চুক্তির মারাত্মক অপরাধ হিসেবে গণ্য করেছে প্রশাসন। ২৪ সেপ্টেম্বর শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রকৌশলী মো. আবদুর রাকিব স্বাক্ষরিত শোকজ চিঠিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে—চিঠি পাওয়ার ৩ দিনের মধ্যে গুণগত মান বজায় রেখে কাজ সম্পন্ন করার লিখিত ওয়ার্ক প্ল্যান (Work Plan) জমা দিতে হবে। অন্যথায় ব্যাংকে রক্ষিত ২৯ লাখ ২৭ হাজার টাকার জামানত বাজেয়াপ্ত করে ঠিকাদারকে আজীবনের জন্য ব্ল্যাকলিস্ট করা হবে।
স্থানীয়রা জানান, পাঁচ তারকা রিসোর্ট ‘গ্র্যান্ড সুলতান’-এর কোল ঘেঁষে যাওয়া এই সড়কটি পুরো মৌলভীবাজারের পর্যটন ও কৃষি অর্থনীতির মূল ধমনী। প্রতিদিন হাজার হাজার দেশি-বিদেশি পর্যটকের যানবাহন এই পথেই যাতায়াত করে।
সরেজমিনে প্রকল্প এলাকা ঘুরে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সড়কটি ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়ায় মুমূর্ষু রোগী কিংবা অন্তঃসত্ত্বা নারীদের হাসপাতালে নেওয়া এখন জীবন-মরণের ঝুঁকি। সময়মতো চা-পাতা কারখানায় পৌঁছাতে না পেরে কোটি টাকার লোকসানে বাগান মালিকরা। রাধানগরের আনারস ও লেবু চাষিরা পরিবহন খরচ দ্বিগুণ গুনে দিশেহারা।
ঠিকাদারের এমন দায়িত্বহীনতায় ক্ষোভের আগুন জ্বলছে স্থানীয়দের মধ্যে। স্থানীয় বাসিন্দা আবুল হাশেম, সালাহ উদ্দিন আইয়ুবী, শামসুদ্দিন এবং জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, অবিলম্বে সড়ক সংস্কারের দাবিতে তারা আন্দোলনে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, অন্যথায় অবরোধ কর্মসূচির কঠোর আল্টিমেটাম দিয়েছেন এলাকাবাসী।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স কোহিনুর এন্টারপ্রাইজের প্রোপ্রাইটর মেহেদী হাসান চৌধুরীর মুঠোফোনে কল করা হলে তার ভাই পরিচয় দিয়ে এক ব্যক্তি বলেন, কাজটি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ‘জয় আহমেদ’ নামে এক ব্যক্তিকে সাব-কন্ট্রাক্টে দেওয়া হয়েছে। বিস্তারিত জেনে জানাবেন বলে সংযোগ কেটে দেওয়ার পর থেকে তাঁদের ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রকৌশলী মো. আবদুর রাকিব বলেন, আমরা কাজের মাত্র ২০% অগ্রগতি পেয়েছি। কাজ ফেলে রাখার দায়ে ঠিকাদারকে শোকজ করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গ্রহণযোগ্য পরিকল্পনা না দিলে জামানত বাজেয়াপ্ত ও ব্ল্যাকলিস্টের চূড়ান্ত সুপারিশ পাঠানো হবে।
মৌলভীবাজার এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ ফারুক আহমদ দৈনিক খোলা কাগজে বলেন, “ঠিকাদারের এমন গাফিলতি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। শোকজের উত্তর সন্তোষজনক না হলে চুক্তি বাতিল করে দ্রুত নতুন দরপত্রের মাধ্যমে নতুন ঠিকাদার নিয়োগ করব।”
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিয়াউর রহমান বলেন, “জনভোগান্তি নিয়ে কোনো অজুহাত চলবে না। এলজিইডির সঙ্গে কথা হয়েছে; দ্রুততম সময়ে বিকল্প উপায়ে অবশিষ্ট কাজ সম্পন্ন করতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া সাময়িক চলাচলের জন্য রাস্তা মেরামত করা হচ্ছে।”
কেকে/সাশ