শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬,
১৭ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম: ● বাংলাদেশকে ৯ গোল দিয়ে আসিয়ান কাপের ফাইনালে ইন্দোনেশিয়া      ● স্বৈরাচার-গুপ্ত দল আবার এক হয়েছে : প্রধানমন্ত্রী      ● যাত্রা শুরু করল বিশেষায়িত ‘সাইবার পুলিশ ইউনিট’      ● ডেঙ্গুতে আরও চারজনের মৃত্যু, হাসপাতালে নতুন ভর্তি ১৯৭৮      ● হামে আরও দুই শিশুর মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ১২১৪      ● সংরক্ষিত আসন-২৩ শূন্য ঘোষণা      ● অরাজকতা সৃষ্টির পাঁয়তারায় কিছু দল : প্রধানমন্ত্রী      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
ভেরিফিকেশনের নামে তামাশা আর কত
মো. শাহিন আলম
প্রকাশ: শুক্রবার, ২ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৪১ এএম
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

সম্প্রতি ৪৯তম বিসিএসের গেজেট বেরিয়েছে। সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) নিয়োগের জন্য সুপারিশ করেছিল ৬৬৮ জনকে, গেজেটে জায়গা পেয়েছেন ৬১১ জন। বাকি ৫৭ জনের নাম নেই, আর কেন নেই, প্রজ্ঞাপনে তার কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়নি। গেজেট প্রকাশের রাতে যারা তালিকায় নিজের নাম খুঁজে পাননি, তারা আজও জানেন না, ঠিক কোন অপরাধে তাদের বাদ দেওয়া হলো।

একজন প্রার্থীকে প্রিলি, রিটেন ও ভাইভা পেরিয়ে সুপারিশপ্রাপ্ত হতে হয়। তারপর ভেরিফিকেশন, সবশেষে গেজেট। লক্ষ্য করার বিষয় হলো, এই ধাপগুলোর একেবারে শেষ প্রান্তে এসেই মেধাবীদের স্বপ্ন থমকে যাচ্ছে, আর রাষ্ট্র কারণটুকু জানানোরও প্রয়োজন মনে করছে না।

এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনাও নয়। তথ্যমতে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ৪৪তম বিসিএসের গেজেটে বাদ পড়েছিলেন ১৮৬ জন প্রার্থী। ৪৮তম বিশেষ বিসিএসে (স্বাস্থ্য) সুপারিশ পেয়েও গেজেটে ঠাঁই হয়নি ২১ জন চিকিৎসকের, যাদের ১৫ জনই সিলেটের এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী। একটি কলেজের এতজন একসঙ্গে সন্দেহভাজন হয়ে গেলেন কীভাবে, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো কেউ দেয়নি। তবে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা এসেছে প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষক নিয়োগে। ফেব্রুয়ারিতে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত ১৪ হাজার ৩৮৪ জনের মধ্যে পুলিশ ভেরিফিকেশন ও গোয়েন্দা প্রতিবেদনের পর বাদ পড়েছেন দুই হাজারের বেশি প্রার্থী।

ভেরিফিকেশন ব্যবস্থাটা আসলে কেমন, সেটা বুঝতে প্রাথমিকের এই ঘটনাই বোধহয় সবচেয়ে কাজের। গত রোববার বাদ পড়া প্রার্থীরা নিয়োগপত্রের দাবিতে শাহবাগে আন্দোলনে নামেন। তীব্র সমালোচনার মুখে সেদিন থেকেই তাদের অনেককে নিয়োগপত্র দেওয়া শুরু হয়েছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ১ অক্টোবর পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে নিয়োগপত্র দেওয়া হবে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী জাহিদ হাসান বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন। পুলিশ ও এনএসআইয়ের ভেরিফিকেশনে বাদ পড়ার পর গত সোমবার তার নাম নতুন তালিকায় উঠেছে।

এখানে সম্ভাবনা দুটি, আর দুটিই উদ্বেগের। প্রথম প্রতিবেদন সঠিক হলে চাপ আসামাত্র তা বদলে গেল কেন? আর ভুল হলে সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে একজন মানুষের জীবন এলোমেলো করে দেওয়ার দায় কার? আন্দোলন না হলে এই সংশোধন আদৌ হতো কি না, সে প্রশ্নও থেকে যায়। আর যারা শাহবাগে আসতে পারেননি, কিংবা যাদের পেছনে আন্দোলনের জোর নেই, তাদের কী হবে?

এইসব পরিসংখ্যানের আড়ালে মানুষগুলোর গল্প আরও নির্মম। ৪৪তম বিসিএসে পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম হয়েছিলেন শামীম শাহরিয়ার। তার বাবা হাতেম আলী রাজশাহীর পুঠিয়ার সাধারণ কৃষক, রাজনীতির ধারে-কাছেও কখনো যাননি। তিনি জানতে চেয়েছেন, ছেলের প্রতি এই অবিচার কেন। ফরিদপুরের নগরকান্দার জেলে নারায়ণ মল্লিকের ছেলে উজ্জ্বল চিকিৎসক হয়েছেন, সুপারিশও পেয়েছেন। বাবার প্রশ্ন, একজন জেলে দেশের কী ক্ষতি করেছেন যে মেধায় টিকেও তার ছেলে চাকরি পাবে না? এ প্রশ্নের জবাব রাষ্ট্রেরই দেওয়া উচিত।

আছেন ডা. সিরাজাম মুনিরাও। রাজনীতির ছায়া এড়াতে ছাত্রজীবনে তিনি কোনো সভা-সেমিনারেও যাননি, অথচ গেজেট থেকে তিনিও বাদ পড়েছেন। রাজনীতি করলে বিপদ, না করলেও বিপদ। তাহলে মাপকাঠিটা আসলে কী?

ভেরিফিকেশনের প্রয়োজন আমি অস্বীকার করছি না। রাষ্ট্রের কাজে যিনি যুক্ত হবেন, তাঁর পরিচয়, নাগরিকত্ব, ঠিকানা ও অপরাধের রেকর্ড যাচাই হতেই পারে। ফরমে প্রার্থী ও তাঁর বাবার পুরো নাম, ঠিকানা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আগের চাকরি, সরকারি চাকরিতে থাকা নিকটাত্মীয়, কোনো মামলায় সাজা বা নৈতিক স্খলনের রেকর্ড এবং আগে বরখাস্ত হয়েছেন কি না—এসব তথ্য চাওয়া হয়। এর বেশিরভাগই যৌক্তিক।

এটাও মানতে হবে, নিষিদ্ধ বা সহিংস কোনো সংগঠনের সঙ্গে প্রার্থীর নিজের সম্পৃক্ততা থাকলে রাষ্ট্রের তা যাচাই করার অধিকার আছে, আর সরকারের পক্ষ থেকে নিরাপত্তার এই যুক্তিই সামনে আনা হয়। কিন্তু সেই যুক্তি প্রার্থীর নিজের আচরণ পর্যন্তই খাটে। সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন প্রার্থীর নিজের কোনো অপরাধ না থাকলেও বাবা, চাচা বা পরিবারের রাজনৈতিক পরিচয় তাঁর বিরুদ্ধে প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায়।

সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৪৯তম বিসিএসের এক প্রার্থীর বাবা সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলা জামায়াতের আমির। ভেরিফিকেশনের সময় প্রার্থীকে সরাসরি জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, পরিবারের কেউ রাজনীতিতে যুক্ত কি না। তিনি সততার সঙ্গে সত্যটাই বলেছিলেন, আর প্রায় ১০ মাস অপেক্ষার পর গেজেটে তাঁর নাম আসেনি। এখানে কারও রাজনৈতিক মতের সমর্থন বা বিরোধিতার প্রশ্ন নেই। প্রশ্ন হলো—ছেলের নিজের বিরুদ্ধে একটি মামলা না থাকলেও বাবার রাজনীতির দায় তাঁকে বইতে হবে কেন?

সংবিধানের ২৯ অনুচ্ছেদে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদলাভের ক্ষেত্রে সব নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতার কথা বলা আছে। একই অনুচ্ছেদে ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ ও জন্মস্থানের কারণে বৈষম্যের বিরুদ্ধেও সুরক্ষা রয়েছে। অনুচ্ছেদটির পাঠে রাজনৈতিক মতের স্পষ্ট উল্লেখ নেই, এটা স্বীকার করতেই হবে। তবে ২৭ অনুচ্ছেদ বলছে, সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় পাওয়ার অধিকারী। দুটি অনুচ্ছেদ একসঙ্গে পড়লে সুযোগের সমতা বলতে যা বোঝায়, তা বাবার রাজনৈতিক অবস্থান দিয়ে নির্ধারিত হতে পারে না।

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মানজুর-আল-মতিনের বক্তব্য সহজ ও যুক্তিসংগত। তাঁর মতে, প্রার্থীর নিজের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট ফৌজদারি অপরাধের প্রমাণ না থাকলে শুধু রাজনৈতিক বা পারিবারিক পরিচয়ের কারণে নিয়োগ আটকে দেওয়া মৌলিক অধিকারের স্পষ্ট লঙ্ঘন। ফৌজদারি আইনের গোড়ার কথাই হলো, দায় ব্যক্তির, বংশের নয়।

এই ব্যবস্থার উৎস কোথায়, সেটাও একটু ভেবে দেখা দরকার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান মনে করিয়ে দিয়েছেন, ব্রিটিশ আমলে পুলিশ ভেরিফিকেশন চালু হয়েছিল তাঁদের চিহ্নিত করতে, যারা ব্রিটিশ রাজকে মেনে নেয়নি, যাতে তারা সরকারি চাকরিতে ঢুকতে না পারে। অর্থাৎ এটি মূলত ভিন্নমত শনাক্ত করার একটি ঔপনিবেশিক হাতিয়ার। স্বাধীন দেশে এসেও সরকারের পর সরকারের হাতে এটি নিয়োগবাণিজ্য ও দলীয় ছাঁকনির কাজ করেছে। আওয়ামী লীগের আমলেও বিরোধী রাজনীতির পরিবারের সন্তানদের ভেরিফিকেশনে আটকে দেওয়ার অভিযোগ বহুবার উঠেছে। আজ ক্ষমতার হাতবদল হয়েছে, কিন্তু ছাঁকনিটা একই আছে। বদলেছে শুধু কারা সেই ছাঁকনির ফাঁক দিয়ে বাদ পড়ছেন।

সরকারি চাকরি এখন সত্যিই সোনার হরিণ। ৪৯তম বিসিএস (বিশেষ)-এ ৬৮৩টি পদের বিপরীতে আবেদন করেছিলেন তিন লাখ বারো হাজারের বেশি প্রার্থী, অর্থাৎ মোটামুটি সাড়ে ১০ জনে একজন। প্রিলি, লিখিত ও ভাইভা পেরিয়ে সুপারিশ পাওয়া মানে বছরের পর বছর রাত জাগার ফল। তারপর ভেরিফিকেশনের নামে মাসের পর মাস অপেক্ষা, আর শেষে অনুল্লিখিত কারণে বাদ। চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা আছে, তাই একবার গেজেট হাতছাড়া হলে অনেকের জন্য সেই সুযোগ আর কখনোই ফেরে না। কেউ কেউ সুপারিশ পাওয়ার পর আগের চাকরি ছেড়ে গ্রামে ফিরে এসেছিলেন। এই মানসিক আঘাতের ক্ষতি পুরোপুরি পূরণ করা যায় না। একজন তরুণ বা তরুণীকে সন্দেহভাজন বানিয়ে ছেড়ে দেওয়া মানে কেবল একটি চাকরি কেড়ে নেওয়া নয়, তার সামাজিক মর্যাদাও ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া। যেসব অভিভাবক কৃষিজমি বিক্রি করে সন্তানকে পড়িয়েছেন, তাঁদের কাছে এ আঘাত আরও গভীর।

এভাবে রাষ্ট্রের ক্ষতিও তো কম হচ্ছে না। অধ্যাপক মজিবুর রহমান বলেছেন, এভাবে দুই হাজার প্রাথমিক সহকারী শিক্ষককে বাদ দিলে মেধাবীরা আর শিক্ষকতায় আসতে চাইবেন না। কথাটা ঠিক। সরকারি চাকরির পরীক্ষার্থীদের কাছে বার্তা পৌঁছে গেছে যে মেধাই যথেষ্ট নয়, আরও কিছু লাগে, আর সেই ‘আরও কিছু’র সংজ্ঞা কেউ জানে না। এর ফল দুই রকম হওয়ার আশঙ্কা অমূলক নয়। একদল মেধাবী বিদেশমুখী হবে, আরেকদল পরীক্ষার আগেই নিজের পরিবারের রাজনৈতিক হিসাব কষতে বসবে।

অথচ এর সমাধান কঠিন নয়, দরকার কেবল ইচ্ছাশক্তি। প্রথমত, ভেরিফিকেশনের পরিধি প্রার্থীর নিজের পরিচয়, নাগরিকত্ব এবং নিজের নামে থাকা ফৌজদারি রেকর্ডে সীমিত করতে হবে। পরিবারের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন ফরম থেকে তুলে দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, যাকে বাদ দেওয়া হবে, তাকে লিখিতভাবে কারণ জানাতে হবে এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে। সমকালের একটি মতামত লেখাতেও এই দাবিই উঠেছে: বাদ পড়া প্রত্যেক প্রার্থীকে লিখিতভাবে কারণ জানানো এবং যুক্তিসংগত প্রশ্ন থাকলে স্বাধীনভাবে পুনঃযাচাই করা।

তৃতীয়ত, ভেরিফিকেশনের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিতে হবে এবং মাসের পর মাস ঝুলিয়ে রাখার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। চতুর্থত, মনগড়া বা প্রতিহিংসামূলক প্রতিবেদন দিলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ের এক-দুজনের মন্তব্যে একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হলে সেটি প্রশাসন থাকে না, হয়ে দাঁড়ায় ব্যক্তিগত দলাদলির সুযোগ।

আর সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে আর কত অপেক্ষা করতে হবে, সে উত্তরও সরকারের কাছ থেকে প্রত্যাশিত। বহু সরকারই ক্ষমতায় আসার সময় মেধার জয়গান গেয়েছে, আবার ক্ষমতায় থেকে সেই মেধাবীদেরই পথ আটকেছে। এই সরকার সেই পরিচিত পথে হাঁটবে, নাকি ব্যতিক্রম হবে, তার প্রথম পরীক্ষা হবে খুব সহজ। পরবর্তী বিসিএস বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আগেই ভেরিফিকেশন ফরম থেকে পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রশ্নটি তুলে দেওয়া হোক। একই সঙ্গে বাদ পড়া ৫৭ জন প্রার্থী, প্রাথমিকের দুই হাজার সহকারী শিক্ষক এবং ৪৪ ও ৪৮তম বিসিএসের বঞ্চিতদের বিষয়টি এখনই নতুন করে বিবেচনা করা হোক। মেধাবী তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এই তামাশা এবার থামুক।

লেখক : প্রাক্তন শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close