সবুজ অরণ্যঘেরা পাহাড়ের সারি, মেঘের ভেলা আর সবুজের বিস্তীর্ণ চাদর। ভোরের আলো ফুটতেই পাহাড়ের ঢালে জমে থাকা মেঘ ধীরে ধীরে সরে যায়। দূরের পাহাড়ের গায়ে সূর্যের আলো পড়লে বদলে যায় পুরো দৃশ্যপট। প্রকৃতির এমন মায়াবী রূপ দেখতে বান্দরবানের লামা উপজেলার মিরিঞ্জা পাহাড়ে ছুটে আসছেন পর্যটকেরা।
গত কয়েক বছরে মিরিঞ্জাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বেশ কিছু রিসোর্ট ও পর্যটনকেন্দ্র। বিশেষ করে সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত, মেঘ-পাহাড়ের দৃশ্য ও নিরিবিলি পরিবেশ পর্যটকদের আকর্ষণ করছে। পর্যটনকেন্দ্রিক এই কর্মকাণ্ডে স্থানীয় পরিবহন, খাবারের দোকান, কৃষিপণ্য, হস্তশিল্প ও ক্ষুদ্র ব্যবসাতেও তৈরি হয়েছে নতুন সম্ভাবনা। কিন্তু সম্ভাবনাময় এই পর্যটনকেন্দ্রে যাওয়ার সড়কই এখন বড় বাধা।
গাড়িচালক মো. আব্দুল মালেক বলেন, মিরিঞ্জা যাওয়ার বিভিন্ন অংশের সড়ক দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের অভাবে বেহাল অবস্থায় পড়ে আছে। কোথাও খানাখন্দ, কোথাও ভাঙাচোরা রাস্তা, বর্ষায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়ে। এতে পর্যটকদের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদেরও দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
ঢাকা থেকে ভ্রমণে আসা পর্যটক মো. করিম ও মো. ছাবের বলেন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দিক থেকে লামা উপজেলার মিরিঞ্জা অত্যন্ত আকর্ষণীয় হলেও যাতায়াতব্যবস্থা আরও উন্নত করা প্রয়োজন। সড়কের মান ভালো না হলে পরিবার নিয়ে দূর-দূরান্ত থেকে আসা অনেক পর্যটকই আগ্রহ হারাতে পারেন।
তারা আরও বলেন, শুধু সড়ক নয়, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা, নির্দেশনামূলক সাইনবোর্ড, জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা ও পর্যটন পুলিশের উপস্থিতি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন পর্যটকেরা।
মিরিঞ্জা ভ্যালি রিসোর্টের ম্যানেজার মো. রাহাতুল আলম ও রয়েল হিল রিসোর্ট অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার মো. ফরিদ উদ্দিন বলেন, মিরিঞ্জায় পর্যটকের সংখ্যা বাড়লে শুধু রিসোর্ট ব্যবসাই নয়, আশপাশের গ্রামের মানুষের আয়ও বাড়বে। পাহাড়ি এলাকার উৎপাদিত ফলমূল, সবজি, জুমের পণ্য ও হস্তশিল্প পর্যটকদের কাছে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে। তবে এর জন্য প্রয়োজন পরিকল্পিত পর্যটন ব্যবস্থাপনা।
এখানে যদি পর্যটকদের নিরাপত্তা ও স্থানীয় রিসোর্ট ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তার স্বার্থে খাগড়াছড়ির সাজেক বা বান্দরবানের নীলাচলের মতো ট্যুরিস্ট পুলিশ বা পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়, তাহলে ব্যাপক ট্যুরিস্ট ও পর্যটকদের আগমন ঘটবে বলে জানান তারা।
লামা রিসোর্ট ও কটেজ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ সাদেকুল মাওয়া (ইরাক) বলেন, আমাদের লামা উপজেলার মিরিঞ্জার পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে দেখা যায় চারপাশের বিস্তীর্ণ সবুজ পাহাড় আর মেঘের খেলা। প্রকৃতির এই সৌন্দর্যই হতে পারে লামার অন্যতম বড় পর্যটনসম্পদ।
তিনি বলেন, আমাদের পক্ষ থেকে সড়ক যোগাযোগের উন্নয়ন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রত্যেক রিসোর্ট মালিক ও ব্যবসায়ীকে বলা হয়েছে, সব রিসোর্টে যেন নিরাপত্তার জন্য সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়। যারা কটেজ, রিসোর্ট বা জুমঘরে রাত্রিযাপন করেন, তাদের রেজিস্টার সংরক্ষণ করার বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
মিরিঞ্জার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রেখে সড়ক যোগাযোগ উন্নত করা ও পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে এ অঞ্চলের পর্যটনশিল্প আরও এগিয়ে যাবে বলে জানান তিনি।
লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মঈন উদ্দিন বলেন, মিরিঞ্জায় পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ট্যুরিস্ট পুলিশ ক্যাম্প স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য জমি নির্ধারণ করা হয়েছে এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
পাশাপাশি মিরিঞ্জার সড়ক যোগাযোগ উন্নয়নের জন্য জেলা পরিষদ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সড়ক উন্নয়নের কাজ শুরু করা হবে। পর্যটকদের নিরাপত্তা, যাতায়াতব্যবস্থার উন্নয়ন ও প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে মিরিঞ্জার পর্যটন সম্ভাবনা আরও বিকশিত হবে বলে জানান তিনি।
কেকে/এমএস