গ্রামবাংলার বাড়ির আঙিনা, বেড়া কিংবা বাগানের এক কোণে লতিয়ে ওঠে গাঢ় নীল ফুল। দূর থেকে দেখলেই চোখে পড়ে এর আকর্ষণীয় রং। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিভিন্ন ধর্মীয় আচার ও পূজায় পরিচিত এই ফুলের নাম নীল অপরাজিতা, অনেক এলাকায় যাকে নীলকণ্ঠ নামেও ডাকা হয়।
ফরিদপুরসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বাড়ির আঙিনায় সৌন্দর্যবর্ধক ও পূজার ফুল হিসেবে দেখা যায় নীল অপরাজিতার লতা। শারদীয় দুর্গাপূজার মহানবমীর পূজায় নীল অপরাজিতা ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নীল অপরাজিতার বৈজ্ঞানিক নাম ক্লিটোরিয়া টার্নেটিয়া। এটি ফ্যাব্যাসি বা শিমজাতীয় পরিবারের একটি বহুবর্ষজীবী লতানো উদ্ভিদ। ইংরেজিতে ফুলটি বাটারফ্লাই পি নামে পরিচিত। সাধারণত গাঢ় নীল রঙের ফুল দেখা গেলেও সাদা ও বেগুনি রঙের ফুলও রয়েছে। ফুল এককভাবে কিংবা জোড়ায় ফুটতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে দ্বৈত পাপড়ির বিরল ফুলও দেখা যায়।
ফুলটির নিচের দিক ও ভেতরের অংশ সাধারণত সাদা হতে পারে, কখনো সেখানে হলুদ আভাও দেখা যায়। রঙের বৈচিত্র্য ও লতানো গড়নের কারণে বাড়ির আঙিনা কিংবা বাগানের সৌন্দর্য বাড়াতেও এই উদ্ভিদের কদর রয়েছে।
কোন মাটিতে ভালো জন্মে?
নীল অপরাজিতা বেশ অভিযোজনক্ষম উদ্ভিদ। বেলে, দোআঁশ থেকে ভারী এঁটেল—বিভিন্ন ধরনের মাটিতেই এটি বেড়ে উঠতে পারে। তবে উর্বর, ঝুরঝুরে ও পানি নিষ্কাশনের সুবিধাযুক্ত মাটিতে গাছ ভালো বাড়ে। পর্যাপ্ত রোদও প্রয়োজন। অতিরিক্ত পানি জমে থাকা বা জলাবদ্ধতা এড়িয়ে চলা ভালো।
বাড়ির আঙিনার মাটিতে যেমন এই লতা লাগানো যায়, তেমনি টবেও চাষ করা সম্ভব। বেড়ে ওঠার জন্য খুঁটি, বেড়া কিংবা মাচার মতো অবলম্বন পেলে সহজেই ওপরে উঠে যায় লতাটি।
বীজ থেকে ফুল, কত দিনে?
অনুকূল পরিবেশে বীজ থেকে নীল অপরাজিতার চারা বের হতে খুব বেশি সময় লাগে না। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদ্ভিদসম্পদ বিষয়ক তথ্যভান্ডার PROSEA-এর তথ্য অনুযায়ী, সাধারণত বীজের অঙ্কুরোদ্গম ৩ থেকে ৬ দিনের মধ্যে দেখা দিতে পারে। উষ্ণ ও আর্দ্র পরিবেশে প্রাথমিক বৃদ্ধি দ্রুত হয়।
জাত ও পরিবেশভেদে বীজ বপনের প্রায় ৭ থেকে ১১ সপ্তাহের মধ্যে ফুল আসতে পারে। ফলে বাড়ির আঙিনায় সামান্য যত্নেই অল্প সময়ের মধ্যে নীল ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করা সম্ভব।
কতটা লম্বা হয়?
নীল অপরাজিতা মূলত লতানো উদ্ভিদ। জাত, মাটি, পানি, আলো ও পরিচর্যার ওপর এর দৈর্ঘ্য নির্ভর করে। উদ্ভিদবৈজ্ঞানিক তথ্য অনুযায়ী এর কাণ্ড প্রায় ০.৪ থেকে ৩ মিটার পর্যন্ত হতে পারে। অর্থাৎ প্রায় ১.৩ থেকে ১০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে লতাটি। উপযুক্ত অবলম্বন পেলে এটি আরও বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
কখন ফোটে নীলকণ্ঠ?
উষ্ণ ও উপযুক্ত পরিবেশে নীল অপরাজিতা প্রায় সারা বছরই ফুল দিতে পারে। বিশেষ করে উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়ায় এর ফুল দীর্ঘ সময় ধরে দেখা যায়। তবে বাংলাদেশে ঋতু ও তাপমাত্রার পরিবর্তনের কারণে ফুলের পরিমাণে কমবেশি হতে পারে।
মজার বিষয় হলো, একটি ফুল দীর্ঘদিন গাছে থাকে না। গবেষণায় দেখা গেছে, ফুলের পূর্ণ প্রস্ফুটিত বা *anthesis* পর্যায় প্রায় একদিন স্থায়ী হতে পারে। ফলে সকালে ফুটে ওঠা ফুলটি অল্প সময়ের মধ্যেই ঝরে যেতে পারে। তবে গাছে নতুন নতুন কুঁড়ি আসতে থাকায় ফুলের সৌন্দর্য অব্যাহত থাকে।
নীলকণ্ঠের আদি নিবাস কোথায়?
নীল অপরাজিতার আদি নিবাস নিয়ে উদ্ভিদবিজ্ঞানে কিছুটা জটিলতা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অঞ্চলে চাষাবাদ ও বিস্তারের কারণে এর প্রকৃত প্রাকৃতিক উৎস নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা কঠিন।
কিউ রয়্যাল বোটানিক গার্ডেনের বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, *Clitoria ternatea*-এর আদি বিস্তৃতি আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল, কেপ ভার্দে ও আরব উপদ্বীপসহ বিস্তৃত। বর্তমানে এশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন উষ্ণ অঞ্চলে এটি চাষ ও প্রাকৃতিকভাবে বিস্তৃত। তবে ফুলটির বৈজ্ঞানিক নামের ‘ternatea’ অংশটি ইন্দোনেশিয়ার মালুকু দ্বীপপুঞ্জের টারনেটে দ্বীপের নাম থেকে এসেছে। এ কারণে পুরোনো ও জনপ্রিয় কিছু লেখায় মালাক্কা বা টারনেটি অঞ্চলকে ফুলটির উৎস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আধুনিক গবেষণায় অবশ্য এর প্রকৃত উৎস নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তার কথা বলা হয়েছে।
ভক্তদের কাছে নীল অপরাজিতা
ফরিদপুরের একটি বাড়িতে পূজার প্রস্তুতির প্রসঙ্গে ভক্ত অপূর্ব সাহা বলেন, ‘নীল অপরাজিতা আমাদের কাছে শুধু একটি সুন্দর ফুল নয়। পূজার সময় নিজের বাড়ির গাছ থেকে ফুল তুলে দেবীর চরণে দিতে পারলে আলাদা একটা আনন্দ অনুভব হয়। তাই বাড়ির আঙিনায় এই লতাটি যত্ন করে রাখি।’
আরেক ভক্ত সবিতা রানী দাস বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই বাড়িতে নীল অপরাজিতা দেখে আসছি। দুর্গাপূজার সময় এই নীল ফুলের কথা বিশেষভাবে মনে পড়ে। ফুলটি দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনি আমাদের ধর্মীয় আচারেও এর একটি পরিচিত স্থান রয়েছে।’
পুরোহিত শ্রী কাজল চক্রবর্ত্তী বলেন, ‘নীল অপরাজিতা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে পরিচিত একটি পূজার ফুল। বিশেষ করে দুর্গাপূজার মহানবমীর আচার-অনুষ্ঠানে নীল অপরাজিতা ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। তবে পূজায় কোন ফুল, কতটি এবং কোন আচার অনুসারে ব্যবহার করা হবে—তা অঞ্চল, পারিবারিক রীতি ও পূজাপদ্ধতির ওপর নির্ভর করতে পারে।’
বাড়ির আঙিনায় নীলের মায়া
ফরিদপুরের গ্রামবাংলার বাড়ির বেড়া, উঠান কিংবা বাগানের এক কোণে সহজেই বেড়ে উঠতে পারে নীল অপরাজিতা। সামান্য যত্নে সবুজ পাতায় ভরে যায় লতাটি। আর সেই সবুজের ফাঁকে ফুটে ওঠে গাঢ় নীল ফুল।
ধর্মীয় ব্যবহার, লোকজ সংস্কৃতি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য—তিনের সমন্বয়ে নীলকণ্ঠ বা নীল অপরাজিতা আজও বাংলাদেশের অনেক সনাতন পরিবারের আঙিনায় পরিচিত একটি ফুল। ছোট্ট এই নীল ফুলটি যেন পূজার উপকরণের পাশাপাশি গ্রামবাংলার বাড়ির উঠানে ধরে রেখেছে প্রকৃতির এক অনন্য সৌন্দর্য।
কেকে/সাশ