বান্দরবানের লামা ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী একটি চক্র ড্রেজার ও সেলো মেশিন বসিয়ে দিন-রাত ছড়ার তলদেশ থেকে বালু উত্তোলন করছে। এতে কৃষিজমি, নদী ও ছড়ার পাড়, সড়ক, সেতু-কালভার্টসহ বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্যও হুমকির মুখে পড়েছে।
সরেজমিনে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, লাইল্যারমার পাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুই পাশে খুটাখালী ছড়ায় প্রায় নয়টি সেলো ও ড্রেজার মেশিন বসানো হয়েছে। এসব মেশিন দিয়ে ২৪ ঘণ্টা ছড়ার তলদেশ থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। উত্তোলিত বালু দীর্ঘ পাইপের মাধ্যমে আশপাশের কৃষিজমি ও ছড়ার পাড়ে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা ও পরিবেশ অধিদপ্তরের নজরদারির ঘাটতির সুযোগে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট এ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। লাইল্যারমার পাড়া স্কুলের মতো স্পর্শকাতর এলাকার দুই পাশেও একাধিক মেশিন বসিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে বলে তারা জানান।
অভিযোগ রয়েছে, কাগজিখোলা এলাকার মৃত মোজাম্মেল হকের ছেলে মুবিনুল হক ও আজিজুল হক এবং ১ নম্বর ওয়ার্ডের আবুল বশরের ছেলে রিয়াদসহ স্থানীয় কয়েকটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী এ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। এছাড়া ফকিরাখোলা ও অংসাঝিরি এলাকায় ইজারা ছাড়াই বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে ইসমাইল, শাহজাহান, মুমিন, রাসেল, আবু, আরমান, হুমায়ুন, শুক্কুর, ধলা মিয়া ও সাইফুল মিস্ত্রীসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, অনিয়ন্ত্রিতভাবে ড্রেজার দিয়ে ছড়ার তলদেশ থেকে অতিরিক্ত বালু উত্তোলনের ফলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। ছড়ার তলদেশ গভীর হয়ে যাওয়ায় এবং দুই পাড়ের মাটি ধসে পড়ায় তীরবর্তী কৃষিজমি ও বসতবাড়ি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।
লাইল্যারমার পাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাছাকাছি এলাকায় মেশিনের বিকট শব্দে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি ছড়ার পানির সঙ্গে বালু ও কাদা আশপাশের ফসলি জমিতে গিয়ে জমা হওয়ায় উর্বরতা কমছে। এতে কৃষকেরা চাষাবাদে ক্ষতির মুখে পড়ছেন বলে স্থানীয়রা জানান।
এ ছাড়া বালু পরিবহনে ব্যবহৃত ভারী যানবাহনের কারণে নির্মাণাধীন রাস্তা, গ্রামীণ সড়ক, কালভার্ট ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অতিরিক্ত ভারী যান চলাচলের ফলে এসব অবকাঠামোর স্থায়িত্ব কমে যাচ্ছে।
অন্যদিকে, স্থানীয়দের অভিযোগ, লামা উপজেলা প্রশাসন অবৈধভাবে উত্তোলন করা বালু জব্দ দেখিয়ে পরে নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করছে। তাদের দাবি, এতে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকারীরা জরিমানা বা নিলামের অর্থ পরিশোধের মাধ্যমে উত্তোলিত বালুকে বৈধতা দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের বক্তব্য জানা যায়নি।
স্থানীয়দের দাবি, শুধু বাইশারী বা লাইল্যারমার পাড়া নয়, পুরো লামা উপজেলাজুড়ে প্রায় দুই শতাধিক অবৈধ বালু উত্তোলন পয়েন্ট সক্রিয় রয়েছে। দ্রুত এসব পয়েন্টে অভিযান পরিচালনা করে ড্রেজার ও সেলো মেশিন জব্দ এবং অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধের দাবি জানিয়েছেন বাইশারী ও ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
তারা খুটাখালী ছড়াসহ আশপাশের এলাকায় যৌথ অভিযান পরিচালনা এবং বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন ও পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসন, লামা ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা প্রশাসন এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন স্থানীয়রা।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে বান্দরবান পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নুরুল হাসান সজীবের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ না করায় তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
কেকে/সাশ