শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬,
১৮ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম: ● বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬-এর উদ্বোধনে প্রধানমন্ত্রী      ● শ্রীলঙ্কার কাছে হেরে পদকশূন্য বাংলাদেশ      ● আখতারুজ্জামানকে বিমানবন্দর থানায় হস্তান্তর      ● মারা গেছেন বিডিনিউজের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী      ● দেশে ডেঙ্গুতে ৯ মাসে প্রাণ গেছে ২৫০ জনের      ● হামে ২৪ ঘণ্টায় চারজনের মৃত্যু      ● ময়মনসিংহে বাসচাপায় অটোরিকশার ৭ যাত্রী নিহত      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
বাংলাদেশের ইতিহাসের আলোকে জিন্নাহ
তৈয়ব হোসাইন
প্রকাশ: শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৫১ এএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকে ঘিরে দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসচর্চায় দীর্ঘদিন ধরে তীব্র বিতর্ক রয়েছে; বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এই বিতর্ক আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জিন্নাহ পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রধান স্থপতি হলেও ১৯৪৮ সালে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার মাধ্যমে তিনি বাংলাভাষী পূর্ববঙ্গের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক বাস্তবতার সঙ্গে পাকিস্তানি রাষ্ট্রপরিচয়ের মৌলিক সংঘাতের সূত্রপাত ঘটান।

এই প্রবন্ধে জিন্নাহকে একমাত্রিক নায়ক বা খলনায়ক হিসেবে বিচার না করে তার রাজনৈতিক চিন্তার ক্রমবিবর্তন—১৯১৬-এর লখনৌ চুক্তি থেকে ১৯২৯-এর চৌদ্দ দফা, ১৯৪০-এর লাহোর প্রস্তাব থেকে ১৯৪৬-এর ক্যাবিনেট মিশন এবং ১৯৪৭-এর দেশভাগ—অনুসরণ করা হয়েছে; পাশাপাশি ১১ আগস্ট ১৯৪৭-এর নাগরিকত্ব ও ধর্মীয় স্বাধীনতা সম্পর্কিত বক্তব্য এবং ১৯৪৮-এর ঢাকা সফরে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার দাবির মধ্যে যে আপাত বৈপরীত্য দেখা যায়, তা আলোচনা করা হয়েছে।

জিন্নাহকে বোঝার মৌলিক সমস্যা হলো তাকে প্রায়ই পূর্বনির্ধারিত চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করা—একদিকে পাকিস্তানের অবিসংবাদিত স্থপতি, অন্যদিকে শুরু থেকেই ভারত বিভক্ত করার লক্ষ্যে কাজ করা রাজনীতিক। উভয় ব্যাখ্যাই তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের পরিবর্তনশীল বাস্তবতাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয় না।

অধিক ফলপ্রসূ পদ্ধতি হলো জিন্নাহর রাজনৈতিক অবস্থানের বিবর্তন অনুসরণ করা: ১৯১৬-তে হিন্দু-মুসলিম সাংবিধানিক সহযোগিতার প্রবক্তা, ১৯২৯-এ ঐক্যবদ্ধ ভারতের মধ্যে মুসলিম সাংবিধানিক নিরাপত্তার দাবিদার, ১৯৪০-এর পর পৃথক মুসলিম রাজনৈতিক জাতিসত্তার ধারণার পক্ষে এবং ১৯৪৬-এর ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনায় ক্ষমতার সাংবিধানিক বণ্টনের প্রশ্নকে কেন্দ্রে রাখা। এই বিবর্তন বোঝা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ১৯৪৮-এ ঢাকায় উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে তার প্রকাশ্য অবস্থান পূর্ববঙ্গের ভাষাগত বাস্তবতার সঙ্গে পাকিস্তানি রাষ্ট্রপরিচয়ের মৌলিক সংঘাত প্রকাশ করে।

১৯১৬ সালের লখনৌ চুক্তি জিন্নাহর রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়; ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ও নিখিল ভারত মুসলিম লীগের এই সমঝোতা মুসলমানদের পৃথক নির্বাচকমণ্ডলীসহ রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের নিশ্চয়তা দেয়। এই পর্যায়ে জিন্নাহ পৃথক মুসলিম রাষ্ট্রের দাবি করছিলেন না; তার দৃষ্টিভঙ্গির কেন্দ্রে ছিল এমন একটি ভারতীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে মুসলমানদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক অধিকার সাংবিধানিকভাবে সুরক্ষিত থাকবে।

১৯২০-এর দশকে গান্ধীর নেতৃত্বে গণআন্দোলনের রাজনীতি জিন্নাহর সাংবিধানিক ও আইনসভাকেন্দ্রিক পদ্ধতির সঙ্গে সংঘর্ষ সৃষ্টি করে; তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে ক্ষমতা পরিচালিত হলে মুসলমানরা স্থায়ী রাজনৈতিক সংখ্যালঘুতে পরিণত হতে পারেন—এই উদ্বেগ পোষণ করতেন, তবে এই সময়েও তার দাবি পাকিস্তান ছিল না।

১৯২৮-এর নেহরু রিপোর্টের পর জিন্নাহ ১৯২৯-এ তার বিখ্যাত চৌদ্দ দফা উপস্থাপন করেন; এতে ফেডারেল রাষ্ট্রব্যবস্থা, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন, সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্ব এবং পৃথক নির্বাচকমণ্ডলীর মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। চৌদ্দ দফায় পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সরাসরি দাবি ছিল না; বরং জিন্নাহ এমন একটি সাংবিধানিক ব্যবস্থা চাইছিলেন যাতে মুসলমানদের রাজনৈতিক অধিকার একটি ঐক্যবদ্ধ ভারতীয় রাষ্ট্রের মধ্যেই কার্যকরভাবে সুরক্ষিত থাকে।

১৯৩০-এ এলাহাবাদ ভাষণে মুহাম্মদ ইকবাল উত্তর-পশ্চিম ভারতের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোর জন্য স্বতন্ত্র রাজনৈতিক এককের ধারণা তুলে ধরেন; তবে ১৯৩০-এর ইকবালের চিন্তাকে সরাসরি ১৯৪৭-এর পাকিস্তানের পূর্ণাঙ্গ নকশা হিসেবে দেখা ঐতিহাসিকভাবে সমস্যাজনক।

১৯৩৫-এর ভারত শাসন আইন এবং ১৯৩৭-এর প্রাদেশিক নির্বাচন পরিস্থিতিকে আরও পরিবর্তন করে; কংগ্রেস বিভিন্ন প্রদেশে শক্তিশালী অবস্থান অর্জন ও সরকার গঠন করার ফলে মুসলিম লীগ প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। এই অভিজ্ঞতা জিন্নাহর কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বাস্তবতা তুলে ধরে—মুসলিম রাজনৈতিক পরিচয় ঘোষণা করলেই কার্যকর ক্ষমতা নিশ্চিত হয় না; প্রয়োজন একটি বৃহত্তর গণভিত্তিক মুসলিম রাজনৈতিক সংগঠন।

১৯৩৭-৩৯ সালে কংগ্রেস-শাসিত প্রদেশগুলোতে ভাষা, শিক্ষা, রাজনৈতিক প্রতীক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় নিয়ে মুসলিম লীগের মধ্যে উদ্বেগ বৃদ্ধি পায়; এই সময়কার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা মুসলিম লীগের মধ্যে কংগ্রেস-প্রাধান্যসম্পন্ন স্বাধীন ভারত সম্পর্কে উদ্বেগকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়।

১৯৪০-এর ২৩ মার্চ মুসলিম লীগ লাহোর প্রস্তাব গ্রহণ করে; এর মাধ্যমে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোর জন্য স্বায়ত্তশাসিত ও সার্বভৌম রাজনৈতিক কাঠামোর ধারণা মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হয়ে ওঠে। ১৯১৬ থেকে ১৯৪০ পর্যন্ত জিন্নাহর রাজনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তন স্পষ্ট: ১৯১৬-তে ঐক্যবদ্ধ ভারত ও মুসলিম সাংবিধানিক সুরক্ষা, ১৯২৯-এ ঐক্যবদ্ধ ভারত, শক্তিশালী ফেডারেল কাঠামো ও মুসলিম রাজনৈতিক অধিকার, ১৯৪০-এ মুসলমানদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক জাতিসত্তা এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলের জন্য পৃথক রাজনৈতিক ব্যবস্থা। তবে লাহোর প্রস্তাবকে পরবর্তী পাকিস্তানের নির্দিষ্ট ভূখণ্ড ও সাংবিধানিক কাঠামোর সম্পূর্ণ নকশা হিসেবে দেখা ঠিক নয়; ১৯৪০ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক আলোচনায় পাকিস্তানের প্রকৃতি নিয়ে বহু প্রশ্ন খোলা ছিল।

জিন্নাহর রাজনৈতিক অবস্থান বোঝার ক্ষেত্রে ১৯৪৬-এর ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ব্রিটিশ সরকারের প্রস্তাবটি ভারতকে সম্পূর্ণভাবে বিভক্ত না করে একটি দুর্বল কেন্দ্রের অধীনে রাখার পরিকল্পনা করেছিল; কেন্দ্রের প্রধান দায়িত্ব হওয়ার কথা ছিল প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও যোগাযোগ; অন্যদিকে প্রদেশগুলোর হাতে ব্যাপক ক্ষমতা থাকার প্রস্তাব করা হয়েছিল।

মুসলিম লীগ ১৯৪৬-এর জুনে এই পরিকল্পনা গ্রহণ করে; পরবর্তীতে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে পরিকল্পনাটির ব্যাখ্যা, প্রাদেশিক দলবদ্ধকরণ ও সাংবিধানিক কর্তৃত্ব নিয়ে গুরুতর বিরোধ দেখা দেয় এবং জুলাই ১৯৪৬-এ মুসলিম লীগ পরিকল্পনাটির প্রতি তার গ্রহণযোগ্যতা প্রত্যাহার করে। এই ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নির্দেশ করে—জিন্নাহর রাজনীতিকে কেবল “শুরু থেকেই পাকিস্তান চাইতেন” এই সহজ সূত্রে ব্যাখ্যা করা যায় না; একটি শক্তিশালী ফেডারেল বা কনফেডারেল ধরনের কাঠামোর মধ্যে মুসলিম রাজনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সম্ভাবনাও তার রাজনৈতিক কৌশলের অংশ ছিল।

ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনার ব্যর্থতার সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক পরিবেশ আরও সংকটপূর্ণ হয়ে ওঠে; কংগ্রেস, মুসলিম লীগ ও ব্রিটিশ সরকারের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস বাড়তে থাকে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সাম্প্রদায়িক সহিংসতা—কলকাতা, নোয়াখালী, বিহার, পাঞ্জাবসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক সহিংসতা রাজনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনাকে আরও সংকুচিত করে। 

১৯৪৭-এ ব্রিটিশ সরকার শেষ পর্যন্ত ভারত বিভক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং ভারত ও পাকিস্তান স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। দেশভাগের মানবিক মূল্য ছিল বিপুল—লক্ষ লক্ষ মানুষ নতুন সীমান্ত অতিক্রম করেন এবং সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় বিপুল প্রাণহানি ঘটে; মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নিয়ে ঐতিহাসিক গবেষণায় মতপার্থক্য রয়েছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণাত্মক পার্থক্য বজায় রাখা জরুরি—জিন্নাহর সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক যুক্তি এক বিষয়; দেশভাগের সময় সংঘটিত সহিংসতা ও মানবিক বিপর্যয় আরেক বিষয়; দুটি বিষয় ঐতিহাসিকভাবে সম্পর্কিত হলেও একটিকে অন্যটির সম্পূর্ণ সমার্থক করা যথাযথ নয়।

পাকিস্তানের প্রথম গণপরিষদে ১১ আগস্ট ১৯৪৭-এর ভাষণে জিন্নাহ নাগরিকদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সমতার ওপর গুরুত্ব দেন; পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সংরক্ষিত সরকারি নথিতে তার এই ভাষণ আজও প্রকাশিত রয়েছে। এই বক্তব্যে তিনি এমন একটি রাষ্ট্রের ধারণা তুলে ধরেন যেখানে নাগরিকের রাজনৈতিক অধিকার তার ধর্মীয় পরিচয়ের ওপর নির্ভর করবে না—”You are free to go to your temples, you are free to go to your mosques„ that has nothing to do with the business of the State।” এই ভাষণকে ঘিরে ইতিহাসচর্চায় দুটি প্রধান ব্যাখ্যা দেখা যায়—একটি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এটি জিন্নাহর ধর্মীয়ভাবে সহনশীল ও সমঅধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রচিন্তার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ; অন্য ব্যাখ্যা তার পূর্ববর্তী রাজনৈতিক বক্তব্য ও মুসলিম লীগের রাজনৈতিক সংগঠনের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং মনে করে যে ১১ আগস্টের বক্তব্যকে তার পূর্ববর্তী রাজনৈতিক চিন্তা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করা উচিত নয়।

একটি সতর্ক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত হলো: ১১ আগস্টের ভাষণে জিন্নাহ ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নাগরিক সমতার পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছিলেন; কিন্তু তার সমগ্র রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে এই বক্তব্যের সম্পর্ক কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে, তা ইতিহাসের একটি চলমান ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন।

জিন্নাহর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক প্রশ্নগুলোর একটি হলো ভাষা। ১৯৪৭-এ পাকিস্তান ছিল একটি বহুভাষিক রাষ্ট্র; পূর্বাঞ্চলে বাংলা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা, পশ্চিম পাকিস্তানে পাঞ্জাবি, সিন্ধি, পশতু, বালুচি এবং অন্যান্য ভাষা প্রচলিত ছিল; উর্দু ছিল পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মাতৃভাষা নয়, তবে উপমহাদেশের মুসলিম রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরে এর বিশেষ মর্যাদা ছিল।

এই পরিস্থিতিতে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রশ্নটি কেবল প্রশাসনিক ভাষা নির্বাচনের প্রশ্ন ছিল না; এটি পাকিস্তানের রাষ্ট্রপরিচয় কীভাবে নির্মিত হবে—সেই মৌলিক প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। ১৯৪৮-এর ২১ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে জিন্নাহ তার ভাষায় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেন যে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু এবং অন্য কোনো ভাষা নয়; একই বক্তব্যে তিনি পূর্ববঙ্গের প্রাদেশিক ভাষা নির্বাচনের অধিকার প্রদেশের জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে থাকার কথাও বলেন। 

অতএব তার অবস্থানকে দুটি স্তরে দেখা যায়—পূর্ববঙ্গের প্রাদেশিক প্রশাসনে জনগণ বাংলা বা অন্য ভাষা নির্বাচন করতে পারে; সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু। ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে জিন্নাহ আবারও ভাষা-প্রশ্নে তার অবস্থান স্পষ্ট করেন; তিনি বলেন, প্রদেশ তার নিজস্ব সরকারি ভাষা নির্বাচন করতে পারে; কিন্তু বিভিন্ন প্রদেশের মধ্যে যোগাযোগের জন্য একটি সাধারণ যোগাযোগের ভাষা প্রয়োজন এবং তার মতে সেটি হওয়া উচিত উর্দু; তিনি একই সঙ্গে রাষ্ট্রভাষা হিসেবেও উর্দুর পক্ষে অবস্থান নেন।

এই বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, জিন্নাহ উর্দুকে কেবল প্রশাসনিক সুবিধার ভাষা হিসেবে দেখেননি; তাঁর বক্তব্যে উর্দুকে ভারতীয় মুসলিম সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল। এখানেই তার রাষ্ট্রপরিচয় নির্মাণের ধারণা এবং পূর্ববঙ্গের ভাষাগত বাস্তবতার মধ্যে সংঘাতটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে—পূর্ববঙ্গের জনগণের জন্য বাংলা ছিল শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি ছিল তাদের সাহিত্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং সামাজিক পরিচয়ের প্রধান বাহন। ফলে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর একচ্ছত্র দাবি পূর্ববঙ্গে দ্রুত রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

ভাষা-প্রশ্ন ১৯৪৮-তেই শুরু হয় এবং ১৯৫২-তে তা ব্যাপক গণআন্দোলনে পরিণত হয়; ১৯৪৭-এর শেষভাগ থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার একটি হিসেবে স্বীকৃতির দাবি জোরালো হয়, ১৯৪৮-এর মার্চে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয় এবং ১৯৫২-তে তা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়। ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২-তে ঢাকা শহরে ভাষার দাবিতে আন্দোলনরত মানুষের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণ এবং প্রাণহানি ভাষা আন্দোলনকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ইতিহাসে এক গভীর প্রতীকে পরিণত করে।

ভাষা আন্দোলনের দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পর ১৯৫৬-এর পাকিস্তান সংবিধানে বাংলা ও উর্দু—দুই ভাষাকেই রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়; সংবিধানের ২১৪ অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল যে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু ও বাংলা। ১৯৪৮-এ জিন্নাহ যে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রকাঠামো শেষ পর্যন্ত সেই একভাষিক নীতিকে ধরে রাখতে পারেনি; বাংলার রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা অর্জন তাই কেবল একটি ভাষাগত সাফল্য ছিল না; এটি পাকিস্তানের কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রপরিচয়ের বিরুদ্ধে পূর্ববঙ্গের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দাবিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিজয় ছিল

 তবে ১৯৭১-এর স্বাধীনতাকে কেবল ভাষা-প্রশ্নের সরাসরি ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঐতিহাসিকভাবে যথেষ্ট নয়; ভাষার সঙ্গে ক্রমে যুক্ত হয় অর্থনৈতিক বৈষম্য, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের সংকট, কেন্দ্রের সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, নির্বাচনী ম্যান্ডেটের প্রশ্ন, সাংস্কৃতিক পরিচয়, স্বায়ত্তশাসনের দাবি এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রক্ষমতা নিয়ে সংঘাত। ফলে ভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতীয়তাবাদের অন্যতম প্রধান ভিত্তিতে পরিণত হয়; ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে সহজ কারণ-ফল সম্পর্ক না থাকলেও উভয়ের মধ্যে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা ছিল।

জিন্নাহকে ঐতিহাসিকভাবে মূল্যায়ন করার ক্ষেত্রে দুটি বিপরীত প্রবণতা এড়ানো জরুরি—প্রথমটি হলো তাকে এমন এক নিখুঁত রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে উপস্থাপন করা যার প্রতিটি সিদ্ধান্ত ছিল ঐতিহাসিকভাবে সঠিক; দ্বিতীয়টি হলো, তাকে এমন এক ব্যক্তিত্ব হিসেবে উপস্থাপন করা যার রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই একমাত্র লক্ষ্য ছিল ভারত বিভক্ত করা। উভয় ব্যাখ্যাই তার রাজনৈতিক বিবর্তনকে অতিরিক্ত সরলীকরণ করে।

ঐতিহাসিক দলিলের আলোকে বলা যায়, জিন্নাহর রাজনৈতিক অবস্থান সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে; তিনি প্রথমে ঐক্যবদ্ধ ভারতের সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে মুসলমানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করেন, পরে মুসলমানদের পৃথক রাজনৈতিক জাতিসত্তার ধারণার দিকে অগ্রসর হন এবং শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রধান রাজনৈতিক নেতা হয়ে ওঠেন।

একই ব্যক্তি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নাগরিক সমতার কথাও বলেছেন; আবার একই ব্যক্তি ১৯৪৮-এ পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন। এই আপাত বৈপরীত্যগুলো মুছে ফেলার পরিবর্তে ইতিহাসচর্চার কাজ হলো এগুলো ব্যাখ্যা করা।

লেখক: শিক্ষক ও কলামিস্ট


কেকে/সাশ 





আরও সংবাদ   বিষয়:  ইতিহাসচর্চা   বাংলাদেশ   মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close