শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬,
১৮ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম: ● বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬-এর উদ্বোধনে প্রধানমন্ত্রী      ● শ্রীলঙ্কার কাছে হেরে পদকশূন্য বাংলাদেশ      ● আখতারুজ্জামানকে বিমানবন্দর থানায় হস্তান্তর      ● মারা গেছেন বিডিনিউজের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী      ● দেশে ডেঙ্গুতে ৯ মাসে প্রাণ গেছে ২৫০ জনের      ● হামে ২৪ ঘণ্টায় চারজনের মৃত্যু      ● ময়মনসিংহে বাসচাপায় অটোরিকশার ৭ যাত্রী নিহত      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
জ্বালানি সিন্ডিকেটে জিম্মি ভোক্তা
ফারদিন মোহাম্মদ
প্রকাশ: শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:১৫ এএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

বর্তমানে দেশের জ্বালানি খাতে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় আস্থার জায়গা তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজি। বিশেষ করে পাইপলাইনের প্রাকৃতিক গ্যাসের তীব্র ঘাটতি এবং নতুন আবাসিক সংযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায়, দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ পরিবার রান্নাবান্নার প্রাত্যহিক চাহিদার জন্য ১২ কেজির সিলিন্ডারের ওপর নির্ভরশীল।

কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, দেশের এই বিশাল ও সংবেদনশীল বাজারটির প্রায় ৯৯ শতাংশই বেসরকারি আমদানিকারকদের নিয়ন্ত্রণে; সরকারি কোম্পানিগুলোর বাজার মাত্র ১ শতাংশ। আর এই একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের সুযোগ নিয়ে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী ও মধ্যস্বত্বভোগীদের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট, যারা কৃত্রিম সংকটকে পুঁজি করে সাধারণ মানুষের পকেট কাটছে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) প্রতি মাসের শুরুতে আন্তর্জাতিক বাজার, বিশেষ করে সৌদি আরামকোর কন্ট্রাক্ট প্রাইসের (সৌদি সিপি) সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এলপিজির খুচরা মূল্য নির্ধারণ করে দেয়। সেই ধারাবাহিকতায় সেপ্টেম্বর মাসের জন্য ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম পূর্ববর্তী মাসের চেয়ে ১৩ টাকা কমিয়ে ১ হাজার ৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল।

সরকারি এই নির্দেশনা যখন আসে, তখন সাধারণ ভোক্তারা কিছুটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিলেন। কিন্তু সেই স্বস্তি উবে যেতে সময় লাগেনি। বিইআরসি-র কাগজ-কলমের মূল্যের সাথে দেশের বাস্তব বাজারের মূল্যের আকাশ-পাতাল ব্যবধান তৈরি হয়েছে।

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের খুচরা বাজারে ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৮৩০ থেকে ২ হাজার ১০০ টাকায়; কোনো কোনো স্থানে তা সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা, এমনকি ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত বেশি। ভোক্তাদের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, এই অতিরিক্ত ও চড়া দাম দেওয়ার পরও অনেক সময় দোকানে গিয়ে কাঙ্ক্ষিত সিলিন্ডার মিলছে না, শুনতে হচ্ছে “গ্যাস নেই” নামক কৃত্রিম হাহাকার।

বাজারের এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির পেছনে শুরু হয়েছে এক অদ্ভুত ব্লেম-গেম বা পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ি। সাধারণ খুচরা বিক্রেতারা সরাসরি দায় চাপাচ্ছেন ডিলার ও আঞ্চলিক পরিবেশকদের ওপর; তাদের দাবি, ডিলাররা সংকটের কথা বলে তাদের কাছ থেকেই বেশি দাম রাখছেন, যার কারণে নির্ধারিত মূল্যে গ্যাস বিক্রি করলে তাদের লোকসান গুনতে হবে।

অন্যদিকে ডিলারদের আঙুল বড় বড় বেসরকারি আমদানিকারক ও বোতলজাতকরণ কোম্পানিগুলোর দিকে। এই চক্রাকার অজহাতের বলি হচ্ছেন কেবল সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত ভোক্তারা। শুধু গৃহস্থালি ব্যবহারকারীই নন, এই অন্যায্য মূল্যবৃদ্ধির কারণে ভয়াবহ আর্থিক চাপে পড়েছেন দেশের হাজার হাজার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, বিশেষ করে ফুটপাথের কিংবা ছোট চায়ের দোকান ও হোটেল-রেস্তোরাঁ মালিকরা; উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয় অত্যাধিক বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন, যা পরোক্ষভাবে সাধারণ মানুষের খাবারের দামকেও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

অথচ সরকারের দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে। সচিবালয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, দেশে এলপি গ্যাসের সামগ্রিক সরবরাহে কোনো ধরনের ঘাটতি বা সংকট নেই।

মন্ত্রী কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, সরবরাহ স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও যারা অসৎ উদ্দেশ্যে এলপিজি মজুত করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে এবং বিইআরসি-র নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে, তাদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, নীতি নির্ধারকদের এই কঠোর হুঁশিয়ারি এবং আশ্বাস মাঠ পর্যায়ে কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে? সরবরাহ যদি পর্যাপ্তই থাকে, তবে কার স্বার্থে এবং কার ইশারায় প্রকাশ্য দিবালোকে কোটি কোটি ভোক্তার পকেট কেটে সিন্ডিকেটগুলো লাভবান হচ্ছে? আইন ও নীতিমালার চোখ রাঙানিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যখন একটি অসাধু চক্র পুরো বাজার ব্যবস্থাকে জিম্মি করে ফেলে, তখন শুধু মৌখিক আশ্বাস বা তদন্তের নির্দেশ সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ও কষ্ট লাঘব করতে পারে না।

এই নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি থেকে দীর্ঘমেয়াদে বাঁচতে হলে আমাদের এলপিজির একক নির্ভরতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। বিকল্প হিসেবে বাসাবাড়িতে সাশ্রয়ী উন্নত বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট স্থাপন কিংবা রান্নায় বৈদ্যুতিক ইন্ডাকশন ও ইনফ্রারেড স্টোভের ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে; বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, দাম বৃদ্ধির কারণে অনেক ভোক্তা ইতিমধ্যেই ইন্ডাকশন ও ইনফ্রারেড চুলার দিকে ঝুঁকছেন।

তবে তাৎক্ষণিক স্বস্তির জন্য অবিলম্বে বিইআরসি, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং স্থানীয় জেলা প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে মাঠে নামতে হবে। মিলগেট বা বোতলজাতকরণ কারখানা থেকে শুরু করে ডিলার পয়েন্ট এবং সর্বশেষ খুচরা দোকান প্রতিটি ধাপে রসিদ বা ভাউচার পরীক্ষা করার মাধ্যমে কঠোর ও নিয়মিত বাজার তদারকি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

যারা আইন অমান্য করে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে এক টাকাও বেশি রাখবে, তাদের লাইসেন্স বাতিল, সিলগালা এবং কঠোর জেল-জরিমানার মতো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। অন্যথায়, আইনের এই শিথিলতার সুযোগ নিয়ে কৃত্রিম সংকটের এই মরণব্যাধি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয়কে আরও দুর্বিষহ এবং নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যাবে।

এলপিজি বাজারের এই সংকট কেবল মূল্যস্ফীতির বিষয় নয়; এর পেছনে আন্তর্জাতিক জোগান শৃঙ্খলের জটিলতাও কাজ করছে। ২০২৬ সালের আগস্টে দেশে এলপিজি আমদানি আগের মাসের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ কমে যায়; মধ্যপ্রাচ্যে সরবরাহ বিঘ্ন ও দাম বাড়ার কারণে আমদানিকারকরা কম পরিমাণ এলপিজি কিনতে বাধ্য হন। ফলে বাজারে জোগান কমে যাওয়ার সুযোগে মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকট তৈরির প্রবণতা বেড়েছে।

একই সময়ে বিইআরসি আন্তর্জাতিক দামের ওপর ভিত্তি করে দাম কমালেও আমদানিকারকদের মতে, তাদের ক্রয়মূল্য ও পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তারা সরকারি দামে বিক্রি করতে অনীহা দেখাচ্ছে।ৎ

এই পরিস্থিতিতে ভোক্তাদের আরেকটি বড় সমস্যা হলো—রসিদ বা ভাউচারের অভাব। অনেক ক্ষেত্রে ভোক্তারা অতিরিক্ত দাম দিয়ে সিলিন্ডার কিনলেও তারা কোনো আনুষ্ঠানিক রসিদ পান না; ফলে পরবর্তীতে অভিযোগ করলে প্রমাণের অভাবে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিজিটাল বিলিং ও অনলাইন অর্ডার সিস্টেম চালু করলে এই অনিয়ম অনেকটা কমানো সম্ভব; কিছু বড় এলপিজি কোম্পানি ইতিমধ্যেই মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে বুকিং ও হোম ডেলিভারি শুরু করেছে, তবে তা এখনও সীমিত পরিসরে।

দীর্ঘমেয়াদে সমাধানের জন্য শুধু বিকল্প জ্বালানির দিকে ঝোঁকাই যথেষ্ট নয়; রাষ্ট্রকে এলপিজি বাজারে তার প্রত্যক্ষ অংশীদারিত্ব বাড়াতে হবে। বর্তমানে সরকারি কোম্পানিগুলোর বাজার মাত্র ১ শতাংশ; এই অনুপাত বাড়িয়ে অন্তত ২০-২৫ শতাংশে নিয়ে গেলে বেসরকারি সিন্ডিকেটের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ভাঙা সম্ভব।

পাশাপাশি, এলপিজি আমদানির জন্য একাধিক উৎস—যেমন কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া—থেকে চুক্তি করার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমানো যেতে পারে।

লেখক : কলামিস্ট


কেকে/সাশ 



মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close