শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬,
১৮ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম: ● বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬-এর উদ্বোধনে প্রধানমন্ত্রী      ● শ্রীলঙ্কার কাছে হেরে পদকশূন্য বাংলাদেশ      ● আখতারুজ্জামানকে বিমানবন্দর থানায় হস্তান্তর      ● মারা গেছেন বিডিনিউজের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী      ● দেশে ডেঙ্গুতে ৯ মাসে প্রাণ গেছে ২৫০ জনের      ● হামে ২৪ ঘণ্টায় চারজনের মৃত্যু      ● ময়মনসিংহে বাসচাপায় অটোরিকশার ৭ যাত্রী নিহত      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
এলপিজির বাজারে অরাজকতা নিয়ন্ত্রণে জোর দিন
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:১৯ এএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

সরকার ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করেছে ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। অথচ রান্নাঘরের এই অপরিহার্য জ্বালানি বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৩শ টাকায়। নির্ধারিত দামের চেয়ে ভোক্তাকে প্রায় ৫-৭শ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে। যে বাজারে সরকার নির্ধারিত দামকে তোয়াক্কা করা হয় না, সেখানে রাষ্ট্র কতটা নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় আছে তা বোঝা যায়।

দেশের এলপিজি বাজারের গঠনই সংকটের বড় কারণ। বিইআরসির সাম্প্রতিক হিসাবে, ৫২টি প্রতিষ্ঠানের এলপিজি ব্যবসার লাইসেন্স রয়েছে; এর মধ্যে ৩২টির নিজস্ব বোতলজাতকরণ কারখানা আছে। আগস্টে ১৩টি বেসরকারি কোম্পানি এলপিজি আমদানি করলেও ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আমদানি করেছে মাত্র ৯টি কোম্পানি।

এপ্রিলের আমদানি-তথ্যে ওমেরার অংশ ছিল ১৯ শতাংশ, পেট্রোম্যাক্সের ১৭ শতাংশ এবং মেঘনা ফ্রেশ ও যমুনা স্পেসটেকের ১৬ শতাংশ করে—চার প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত অংশ ৬৮ শতাংশ। যদিও এই হিসাব বর্তমান বাজার-সরবরাহের পূর্ণ চিত্র নয়, তবু এটি বাজারের উচ্চ কেন্দ্রীভবনকে স্পষ্ট করে। দেশের এলপিজি সরবরাহের প্রায় ৯৮ শতাংশই বেসরকারি খাতনির্ভর। এমন কেন্দ্রীভূত বাজারে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তই দাম, সরবরাহ ও মজুতের গতিপথ ঠিক করে দেয়। সেখানে প্রতিযোগিতার কথা বলা অর্থহীন।

জ্বালানিমন্ত্রী নিজেই বলছেন, একটি মধ্যস্বত্বভোগী চক্র কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বেশি দাম আদায়ের চেষ্টা করছে। প্রশ্ন হলো, সরবরাহ যদি পর্যাপ্তই থাকে এবং চক্রটি যদি চিহ্নিতই হয়ে থাকে, তাহলে এতদিন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন? ‘যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে’- এ জাতীয় আশ্বাস বছরের পর বছর শুনে আসছেন ভোক্তারা। দাম বেঁধে দেওয়া বিইআরসির দায়িত্ব, কিন্তু সেই দাম কার্যকর করার সক্ষমতা ও ইচ্ছা কোনোটিই দৃশ্যমান নয়। বাজার তদারকি যেখানে মৌসুমি অভিযানে সীমাবদ্ধ, সেখানে সিন্ডিকেট বারবার ফিরে আসবে।

আমদানির প্রতিবন্ধকতাও কম গুরুতর নয়। জেএমআই এলপিজির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানিয়েছেন, ব্যাংকের নানা জটিলতায় তারা এলসি খুলতে পারছেন না। ঋণখেলাপিসহ নানা কারণে বাকি কোম্পানিগুলো আমদানির বাইরে থাকছে। অর্থাৎ ব্যাংকিং খাতের সংকট ও নীতিগত অস্বচ্ছতা পরোক্ষভাবে বড় কোম্পানিগুলোর একচেটিয়া প্রভাবকেই শক্তিশালী করছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় অস্থিরতা এনেছে, এ কথা সত্য। কিন্তু বৈশ্বিক অস্থিরতার দোহাই দিয়ে অভ্যন্তরীণ বাজারের ব্যর্থতা ঢাকা যায় না।

প্রতিবেশী ভারতে এলপিজি বাজারে সরকারি তেল বিপণন কোম্পানিগুলোর শক্ত উপস্থিতি রয়েছে। ‘পাহাল’ কর্মসূচির আওতায় ভর্তুকি সরাসরি ভোক্তার ব্যাংক হিসাবে পাঠানো হয়, ফলে মধ্যস্বত্বভোগীর সুযোগ কমে। উজ্জ্বলা যোজনার মাধ্যমে নিম্নআয়ের পরিবারগুলোকে এলপিজি সংযোগ দেওয়া হয়েছে। ইন্দোনেশিয়া রান্নার জ্বালানি হিসেবে কেরোসিনের বদলে এলপিজি চালু করার সময় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পার্টামিনার মাধ্যমে ভর্তুকিপ্রাপ্ত ছোট সিলিন্ডার সরবরাহ করেছে। 

থাইল্যান্ড জ্বালানি তেল তহবিলের মাধ্যমে এলপিজির দামের ওঠানামা সামলানোর চেষ্টা করেছে। শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা সতর্কবার্তা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে বাজার কার্যত দুটি প্রধান কোম্পানির হাতে কেন্দ্রীভূত থাকায় ২০২২ সালের সংকটে ভোক্তা চরম ভোগান্তিতে পড়েছিলেন।

এসব দেশের মডেল হুবহু অনুকরণযোগ্য নয়, কিন্তু একটি শিক্ষা সবখানেই স্পষ্ট: জ্বালানির মতো অপরিহার্য পণ্যে রাষ্ট্রের কৌশলগত উপস্থিতি, স্বচ্ছ মূল্য কাঠামো ও কার্যকর তদারকি ছাড়া বাজার নিজে থেকে ভোক্তার স্বার্থ রক্ষা করে না। ফলে এই পরিস্থিতিতে যেসব কোম্পানির সক্ষমতা ও বৈধ লাইসেন্স আছে, ব্যাংকিং জটিলতার কারণে তারা যেন এলসি খুলতে ব্যর্থ না হয়, তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও জ্বালানি বিভাগের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

একচেটিয়া আচরণের স্বাধীন তদন্ত করতে হবে। প্রতিযোগিতা কমিশনকে সক্রিয় করে শীর্ষ চার কোম্পানির আমদানি, মজুত ও বিতরণ-ব্যবস্থা খতিয়ে দেখতে হবে। বিইআরসির নির্ধারিত দাম কার্যকর করতে  ডিলার ও খুচরা পর্যায়ে নিয়মিত তদারকি জরুরি। অতিরিক্ত দাম আদায়ে বড় অঙ্কের জরিমানা এবং লাইসেন্স স্থগিতের বিধান প্রয়োগ করতে হবে। দামের তালিকা প্রকাশ্যে টাঙানো বাধ্যতামূলক করা দরকার। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা জোরদার করতে হবে।

বাজার স্থিতিশীল রাখতে বিপিসির অধীনে এলপিজি আমদানি ও বিপণনের সক্ষমতা বাড়ানো যেতে পারে। এতে সংকটের সময় সরকারের হাতে সরাসরি হস্তক্ষেপের উপায় থাকবে। কৌশলগত মজুত গড়তে হবে। সরকারি হিসাবে ২০৩৫ সালে দেশে এলপিজির চাহিদা ৪০ লাখ টনে পৌঁছাতে পারে। এই বাস্তবতায় টার্মিনাল, সংরক্ষণাগার ও স্টোরেজ অবকাঠামো এখনই নির্মাণ না করলে ভবিষ্যতে সংকট আরও গভীর হবে।

রান্নার গ্যাস নাগরিকের মৌলিক চাহিদা। দেশে এলপিজির ৮০ শতাংশ ব্যবহার হয় রান্নায়। সেই বাজার যদি কয়েকটি কোম্পানির ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়, তবে ভোক্তার জিম্মিদশা কাটবে না। সরকারকে ‘সংকট নেই’ বলার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে। বাজারে দাম বেঁধে দেওয়াই যথেষ্ট নয়, সেই দাম কার্যকর করার সক্ষমতা দেখানোর বিকল্প নেই। 


কেকে/সাশ 



আরও সংবাদ   বিষয়:  এলপিজির বাজার   অরাজকতা নিয়ন্ত্রণ  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close