পরিবারের সচ্ছলতার আশায় প্রায় ১৫ বছর আগে দেশ ছেড়েছিলেন কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার মিজানুর রহমান। দীর্ঘ প্রবাসজীবনে পরিবারের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন তিনি। দেড় বছর আগে তার ঘর আলো করে জন্ম নেয় একটি কন্যাসন্তান। মেয়ের মুখ দেখা, তাকে কোলে নেওয়া ও বাবার আদর দেওয়ার স্বপ্ন ছিল মিজানুরের। দেশে ফেরার অপেক্ষাতেও ছিলেন তিনি।
কিন্তু সেই অপেক্ষা আর শেষ হলো না। মেয়েকে একবারও কোলে নেওয়ার সুযোগ না পেয়েই মালয়েশিয়ায় হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন মিজানুর রহমান। তার মৃত্যুতে পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। একই সঙ্গে একমাত্র সন্তানকে বাবার স্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়ে বড় হতে হবে এমন বাস্তবতায় ভেঙে পড়েছেন স্বজনেরা।
মিজানুর রহমান কটিয়াদী উপজেলার আচমিতা ইউনিয়নের আচমিতা গ্রামের মো. মিলন মিয়ার ছেলে। শনিবার (৩ অক্টোবর) দুপুরে মিজানুরের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন আচমিতা ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য শামসুজ্জামান সোয়েব।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, জীবিকার তাগিদে প্রায় ১৫ বছর আগে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমান মিজানুর। বিদেশের মাটিতে কঠোর পরিশ্রম করে উপার্জিত অর্থ নিয়মিত পরিবারের কাছে পাঠাতেন। তাঁর পাঠানো অর্থেই চলত পরিবারের নানা প্রয়োজন ও খরচ। দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকলেও পরিবারের প্রতি তাঁর টান ছিল প্রবল।
মালয়েশিয়ায় মিজানুর এল অ্যান্ড এল মেটাল স্টেইনলেস স্টিল মিল নামের একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। প্রতিদিনের মতো গত বৃহস্পতিবার মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে কর্মস্থলে ছিলেন। বিকেলে হঠাৎ হৃদ্রোগে আক্রান্ত হলে সহকর্মীরা তাকে নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করেন। পরে সেখানেই তার মৃত্যু হয়। মিজানুরের মৃত্যুর খবর দেশে পৌঁছালে স্বজনদের মধ্যে কান্নার রোল পড়ে যায়। বিশেষ করে দেড় বছর বয়সী কন্যাসন্তানকে ঘিরে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে নেমে আসে গভীর শোক।
পরিবারের সদস্যরা জানান, মিজানুরের উপার্জনের ওপর পরিবারের অনেকটাই নির্ভরশীল ছিল। দীর্ঘদিন বিদেশে থেকে নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কথা না ভেবে পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা করেছেন তিনি। দেশে ফিরে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর ইচ্ছা থাকলেও শেষ পর্যন্ত সেই সুযোগ আর হয়ে ওঠেনি।
মিজানুরের সহকর্মী প্রবাসী মোহাম্মদ উজ্জল মিয়া জানান, বৃহস্পতিবার বিকেলে কর্মস্থলে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হন মিজানুর। পরে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর খবর সহকর্মীদের মধ্যেও শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
মিজানুরের বাবা মো. মিলন মিয়া বলেন, দেড় বছর আগে তার ছেলে একটি কন্যাসন্তানের বাবা হয়েছিলেন। কিন্তু মেয়ের জন্মের পরও দেশে ফেরার সুযোগ হয়নি মিজানুরের। দীর্ঘ প্রবাসজীবনে তিনি মেয়েকে দেখার অপেক্ষায় ছিলেন।
তিনি বলেন, ‘আমার নাতনির জন্মের পর তার বাবা তাকে দেখতে পারেনি, কোলে নিতে পারেনি। মেয়েটা বাবার আদর থেকে বঞ্চিত হলো। আমরা অনেক কষ্টে আছি। আমার ছেলে পরিবারের জন্য বিদেশে গিয়ে এত বছর কাজ করেছে। এখন তার মরদেহটাও আমাদের কাছে নেই। ছেলের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করার জন্য সরকারের কাছে আবেদন করছি।’
স্থানীয়রা জানান, পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতার জন্য দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে প্রবাসে ছিলেন মিজানুর। পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে গিয়ে নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় কাটিয়েছেন বিদেশের মাটিতে। সন্তানের জন্মের পর দেশে ফিরে মেয়েকে কোলে নেওয়ার যে স্বপ্ন ছিল, তা আর পূরণ হলো না।
আচমিতা ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য শামসুজ্জামান সোয়েব বলেন, “মিজানুরের মৃত্যুর খবর শুনে আমরা গভীরভাবে শোকাহত। তার স্ত্রী ও দেড় বছর বয়সী একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। মিজানুরের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়াতে সমাজের বিত্তবানসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাই।”
কেকে/সাশ