দীর্ঘদিন পর রাজধানীর অনেক ফুটপাতে হাঁটার জায়গা ফিরেছে। কোথাও উচ্ছেদ করা হয়েছে অবৈধ দোকান, কোথাও সরিয়ে দেওয়া হয়েছে হকার। ব্যস্ত সড়কের পাশের ফুটপাত এখন অনেকটাই ফাঁকা। সন্তান সঙ্গে নিয়ে নির্বিঘ্নে হাঁটছেন নগরবাসী। কেউ কেউ বলছেন, এক যুগেরও বেশি সময় পর ঢাকার ফুটপাতে এমন স্বস্তি অনুভব করছেন তারা।
তবে এই স্বস্তি কতদিন থাকবে, তা নিয়েই প্রশ্ন নগরবাসীর। অতীতে বহুবার উচ্ছেদ অভিযান হলেও কয়েক দিনের মধ্যেই অনেক এলাকায় আবার ফুটপাত দখল করে বসেছে হকার ও অবৈধ দোকান। ফলে এবারও একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি হবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। নগরবাসীর দাবি, শুধু হকার উচ্ছেদ করলেই হবে না, পুনর্দখলের নেপথ্যে যারা রয়েছে, তাদেরও চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।
রাজধানীর ফুটপাত দখলমুক্ত করতে বর্তমানে তৎপর ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। নগরবাসীর নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে বিভিন্ন এলাকায় চলছে উচ্ছেদ অভিযান। পাশাপাশি উচ্ছেদের পর ফুটপাত যাতে পুনরায় দখল না হয়, সে জন্য নজরদারি জোরদারের কথাও জানিয়েছে দুই সিটি করপোরেশন।
সম্প্রতি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনার পর অনেক সড়ক ও ফুটপাত তুলনামূলক ফাঁকা দেখা গেছে। এতে দীর্ঘদিন পর স্বাভাবিকভাবে হাঁটার সুযোগ পেয়েছেন সাধারণ মানুষ। মিরপুর-১০ ও হোপ মার্কেট এলাকার পরিস্থিতিও বদলে গেছে। বুধবারের অভিযানের পর মিরপুর-১০ থেকে মিরপুর-১৩ পর্যন্ত সড়ক ও ফুটপাতের অনেক অংশ এখন ফাঁকা। স্থানীয় বাসিন্দাদের কেউ কেউ এই পরিবর্তনে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন।
সন্তানকে নিয়ে ফুটপাতে হাঁটার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে রাজধানীর এক নারী বাসিন্দা বলেন, প্রায় এক যুগেরও বেশি সময় পর এবার সন্তানকে নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে পেরেছেন। ঢাকায় এমন ফাঁকা ফুটপাত সাধারণত দেখা যায় না। আগে ফুটপাতজুড়ে এত দোকান থাকত যে হাঁটার জায়গাই পাওয়া যেত না। এর সঙ্গে রিকশা চলাচল করায় সন্তানকে নিয়ে হাঁটা আরও কঠিন হয়ে উঠত। কিন্তু এবার পুরো ফুটপাত দিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে হাঁটতে পেরেছেন।
ওই নারী মনে করেন, ফুটপাত ও প্রধান সড়ক দখল করে দোকান বসানোর পরিবর্তে হকারদের জন্য নির্দিষ্ট জায়গার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে মানুষ প্রয়োজন হলে সেখানে গিয়ে কেনাকাটা করতে পারবেন। একইসঙ্গে প্রধান সড়ক ও ফুটপাতও পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
ফুটপাত দখলের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার পেছনে শুধু হকারদের দায়ী না করে এর নেপথ্যের ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার দাবি উঠেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, প্রশাসনের কিছু সদস্য ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সম্পৃক্ততা ছাড়া বছরের পর বছর একই জায়গায় হকার বসে থাকা সম্ভব নয়।
তাদের ভাষ্য, উচ্ছেদ অভিযান হলে কয়েক দিন ফুটপাত ফাঁকা থাকে। এরপর আবার আগের জায়গায় দোকান বসে। স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী কারও সহযোগিতা ছাড়া এভাবে বারবার দখল করা সম্ভব নয় বলেও তারা মনে করেন।
একজন বাসিন্দা বলেন, শুধু হকারদের সরিয়ে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কারা তাদের বসতে দেয় এবং কারা এর বিনিময়ে টাকা নেয়, সেটিও খুঁজে বের করতে হবে। তা না হলে অভিযান শেষ হওয়ার কয়েক দিন পরই আবার ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে মিরপুর-১০ এলাকায় ফুটপাত উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে হকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষের পর বিষয়টি নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন ঢাকা-১৫ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
৩০ সেপ্টেম্বর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে তিনি অভিযোগ করেন, মাসের পর মাস ধরে একদল অসাধু ও চাঁদাবাজ ব্যক্তি এসব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা নিয়ে তাদের ব্যবসার সুযোগ করে দিয়েছে। দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক ও বার্ষিক ভিত্তিতে চাঁদা আদায়ের অভিযোগও তোলেন তিনি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, এর আর্থিক বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ ক্রেতা ও জনগণের ওপর গিয়ে পড়ে।
উচ্ছেদ অভিযান নিয়ে তিনি আরও বলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্যকে অবহিত না করে এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ায় তিনি বিস্মিত হয়েছেন। এ বিষয়ে তারও দায়িত্ব রয়েছে এবং তাকে সম্পৃক্ত করা যেত। পারস্পরিক পরামর্শের মাধ্যমে একটি কার্যকর পথ বের করা সম্ভব ছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
পরবর্তী সময়ে সরেজমিন মিরপুর-১০ এলাকা পরিদর্শন করে শফিকুর রহমান বলেন, রাজধানীর সড়ক ও ফুটপাত পথচারী ও যানবাহন চলাচলের উপযোগী রাখা জরুরি। তবে কেবল বলপ্রয়োগ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদ করলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। তাদের জন্য উপযুক্ত বিকল্প স্থান নির্ধারণ করে পুনর্বাসন ও ব্যবসার সুযোগ নিশ্চিত করার কথাও বলেন তিনি। একইসঙ্গে ফুটপাত দখল ও চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
উচ্ছেদের পর ফুটপাত যাতে আবার দখল না হয়, সেজন্য নজরদারি জোরদারের কথা জানিয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন। ৩ অক্টোবর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ফুটপাত যেখানে দখল হবে, সেখানেই উচ্ছেদ অভিযান চলবে। সম্প্রতি মিরপুর-১০ থেকে হোপ মার্কেট পর্যন্ত দীর্ঘদিনের দখলে থাকা ফুটপাত স্থানীয় জনগণের সহযোগিতায় দখলমুক্ত করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
ডিএনসিসি প্রশাসক জানান, মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে একটি মনিটরিং টিম গঠন করা হয়েছে। টিমটি নিয়মিত এলাকা পর্যবেক্ষণ করবে। ফুটপাত দখল করে কোনো দোকান বা স্থাপনা বসানো হলে মালামাল ও সরঞ্জাম জব্দসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এর আগে বুধবার মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে হোপ মার্কেটের দিকে ফুটপাতের অবৈধ দখল উচ্ছেদে অভিযান শুরু করে ডিএনসিসি। একপর্যায়ে হকার ও দোকানিদের সঙ্গে পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের কর্মীদের সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের মধ্যে ডিএনসিসির কয়েকটি গাড়িতে আগুন দেওয়া এবং পুলিশের একটি গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। গণমাধ্যমকর্মীরাও হামলার শিকার হন। পরে মিরপুর-১০ থেকে মিরপুর-১৩ পর্যন্ত সড়কের দুই পাশের ফুটপাতের ভাসমান দোকান উচ্ছেদ করা হয়।
এর আগে রাজধানীর পল্টন মোড় থেকে গুলিস্তান জিরো পয়েন্ট হয়ে বংশালের নর্থ সাউথ রোড পর্যন্ত মূল সড়ক হকারমুক্ত ঘোষণা করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। ২৪ সেপ্টেম্বর ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আবদুস সালাম ওই এলাকা পরিদর্শন করে জানান, এসব মূল সড়কে কোনোভাবেই হকার বসতে দেওয়া হবে না। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিভিন্ন হকার সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে একাধিকবার আলোচনা হয়েছে এবং তারা স্বেচ্ছায় এসব মূল সড়ক ছেড়ে দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন বলেও জানান তিনি।
তবে গুলিস্তানের রমনা ভবনসংলগ্ন পূর্ব পাশের ফুটপাতে সাধারণ মানুষের চলাচলের জায়গা রেখে নির্ধারিত স্থানে নিয়ম অনুযায়ী নিবন্ধিত নির্দিষ্টসংখ্যক হকার বসতে পারবেন। নির্ধারিত স্থান, সময়, সংখ্যা ও নিবন্ধনের বাইরে যত্রতত্র হকার বসার সুযোগ নেই বলেও জানিয়েছেন ডিএসসিসি প্রশাসক।
রাজধানীর ফুটপাত দখলমুক্ত করার সাম্প্রতিক উদ্যোগে নগরবাসীর মধ্যে স্বস্তি ফিরলেও এর স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। কারণ, অতীতে উচ্ছেদ অভিযান বারবার হলেও পুনর্দখল ঠেকানো যায়নি।
নগরবাসীর মতে, ফুটপাত পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত রাখা যেমন জরুরি, তেমনি হকারদের জীবিকার বিষয়টিও বাস্তবতার সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। নির্দিষ্ট স্থান ও সময়ের মধ্যে হকারদের ব্যবসার সুযোগ দেওয়া গেলে একদিকে তাদের জীবিকা বজায় থাকবে, অন্যদিকে পথচারীদের চলাচলেও বাধা সৃষ্টি হবে না।
তবে এর পাশাপাশি ফুটপাত দখলের নেপথ্যে থাকা ব্যক্তি, চাঁদাবাজি এবং স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের ভূমিকা নিয়ে ওঠা অভিযোগও তদন্ত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা। দীর্ঘদিন পর ফুটপাতে যে স্বস্তি ফিরেছে, সেটি কতা স্থায়ী হবে, এখন মূল প্রশ্ন সেটিই। উচ্ছেদের পাশাপাশি পুনর্দখল ঠেকানো, দখলের নেপথ্যের ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং হকারদের জন্য কার্যকর বিকল্প ব্যবস্থা—এই তিনটি বিষয়ই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে রাজধানীর ফুটপাত কতা পথচারীবান্ধব থাকে।
কেকে/ এমএস