রোববার, ৪ অক্টোবর ২০২৬,
১৯ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

রোববার, ৪ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম: ● দেশের অর্থনীতি একাধিক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে : অর্থমন্ত্রী      ● সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুরের বারসহ রাজধানীর চার বারে অভিযান      ● বঙ্গোপসাগরকে নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে রাখতে চায় বাংলা‌দেশ : মুনীরুজ্জামান      ● গাজীপুরে মেট্রিক্স গার্মেন্টসের আগুন নিয়ন্ত্রণে, আটকে পড়া ৬৯ শ্রমিক উদ্ধার      ● ডেঙ্গুতে আরও ছয়জনের মৃত্যু, হাসপাতালে নতুন ভর্তি ১৬০৮      ● ২৪ ঘণ্টায় হামে ৮ জনের প্রাণহানি      ● হা‌সিনাকে আশ্রয় দেওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প ছিল না : দীনেশ ত্রিবেদী      
খোলাকাগজ স্পেশাল
বিনিয়োগ ও উৎপাদনের কেন্দ্র হবে বাংলাদেশ
সফিকুল ইসলাম সবুজ
প্রকাশ: রোববার, ৪ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:৪৭ এএম

বাংলাদেশকে শক্তিশালী উৎপাদন ও বিনিয়োগের কেন্দ্রে পরিণত করে একটি আকর্ষণীয় বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। উৎপাদন, সেবা ও রপ্তানি খাতে কর্মসংস্থান বাড়াতে বিনিয়োগকারীদের নীতিগত নিশ্চয়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার কথা জানিয়েছেন তিনি। 

একইসঙ্গে বঙ্গোপসাগরের সম্ভাবনা কাজে লাগানো, আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানো এবং পরিবর্তিত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন আলোচকরা।

গতকাল শনিবার রাজধানীতে সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত তিন দিনব্যাপী ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬’-এ দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে দেশি-বিদেশি নীতিনির্ধারক, কূটনীতিক, ব্যবসায়ী, গবেষক, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষা, নীতিমালার ধারাবাহিকতা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিয়েছে সরকার। এখন প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময়। বিনিয়োগকারীদের জন্য নীতিগত নিশ্চয়তা ও দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিবেশ তৈরি করা হবে।

সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রেও সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি ‘ফ্যামিলি কার্ড’, ‘কৃষক কার্ড’ ও ‘হেলথ কার্ড’ চালুর কথা জানান। পরবর্তী সময়ে ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’-এর মাধ্যমে সমন্বিত সরকারি সেবা দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও বলেন। স্বাস্থ্যসেবা তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দিতে এক লাখ স্বাস্থ্যসেবাকর্মী নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার প্রায় ৮০ শতাংশ নারী হবেন।

শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নেও বড় ধরনের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। প্রথম শ্রেণি থেকে বিনামূল্যে ইউনিফর্ম, স্কুলব্যাগ, মিড-ডে মিল ও বৃত্তি দেওয়ার পরিকল্পনার পাশাপাশি মেয়েদের স্নাতক পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষার পরিধি বাড়ানোর কথা জানান। 

কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা সম্প্রসারণ, তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও স্টার্টআপে গুরুত্ব দেওয়ার কথাও বলেন তিনি। তার ভাষায়, বাংলাদেশের তরুণদের বৈশ্বিক কর্মবাজারে প্রতিযোগিতার উপযোগী করে গড়ে তোলাই লক্ষ্য।

কৃষিকে অর্থনীতির মূল ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী প্রযুক্তি, সেচ, কৃষি অর্থায়ন ও বাজারসংযোগ বাড়ানোর ওপর জোর দেন। আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও জলপথ খনন, পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের পরিকল্পনার কথাও জানান। একই সময় ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। মানবাধিকার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও আইনের শাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। জাহাজ চলাচল, মৎস্য, পর্যটন, জ্বালানি ও আঞ্চলিক সরবরাহশৃঙ্খলে বঙ্গোপসাগরের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বাণিজ্য, শিক্ষা, প্রযুক্তি, জলবায়ু ও সমুদ্র খাতে আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানোর কথা বলেন। জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি সংলাপ, অংশীদারত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করার কথাও জানান।

সংলাপে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় এশিয়ার ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে আসে। অর্থনীতিবিদ ও সিপিডির চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান বলেন, বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্র এশিয়ার দিকে সরে আসছে। চীন ও ভারতের বড় অর্থনীতির উত্থানের ফলে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি বিনিময় বাড়ছে। এ পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে।

রেহমান সোবহানের মতে, বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো এশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক সংযোগ বাড়ানো। বাংলাদেশের রপ্তানি এখনো কয়েকটি বাজারের ওপর নির্ভরশীল। বিপরীতে আমদানি ও ক্রমবর্ধমান মূলধনের বড় অংশ এশিয়া থেকে আসছে। ফলে এশিয়ার আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশকে আরও জোরালোভাবে যুক্ত হতে হবে। 

চীন ও ভারতের প্রতিবেশী হওয়াকে বাংলাদেশের বড় কৌশলগত সুবিধা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ দুই দেশের বিশাল বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি সম্ভাবনা এখনো যথেষ্ট কাজে লাগানো হয়নি।

অন্যদিকে, বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তন নিয়ে সতর্ক করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আলী রীয়াজ। তার মতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা বিশ্বব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে, কিন্তু এর বিকল্প কাঠামো এখনো তৈরি হয়নি। মধ্যম শক্তির দেশগুলো নতুন বিশ্বব্যবস্থায় বড় ভূমিকা নেবে—এমন প্রত্যাশাকে তিনি অতিরঞ্জিত বলে মনে করেন। 

তার মতে, এসব দেশের কোনো অভিন্ন এজেন্ডা নেই। জাতিসংঘ ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সংস্কার করতে হবে।

বাংলাদেশের মতো তুলনামূলক ছোট দেশগুলোকেও এ পরিবর্তিত বাস্তবতায় নিজেদের ভূমিকা নতুন করে ভাবতে হবে বলে মন্তব্য করেন আলী রীয়াজ। বিভিন্ন শক্তির মধ্যে ভারসাম্য রেখে চলার প্রচলিত কৌশল ভবিষ্যতে কতা কার্যকর থাকবে, তা নিয়েও তিনি সংশয় প্রকাশ করেন।

বাংলাদেশকে ঘিরে বড় শক্তিগুলোর আগ্রহের পার্থক্যের কথাও উঠে এসেছে আলোচনায়। জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্যারল ক্রিস্টাইন ফেয়ার বলেন, বাংলাদেশ নিয়ে চীন ও ভারতের যে মাত্রার আগ্রহ রয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ততা নেই। তার মতে, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ নিজের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েই সিদ্ধান্ত নেবে।

সব মিলিয়ে ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬’-এর আলোচনায় বাংলাদেশের সামনে একইসঙ্গে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার চিত্র উঠে এসেছে। 

একদিকে বিনিয়োগ, উৎপাদন, রপ্তানি ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর উদ্যোগ; অন্যদিকে এশিয়ার দ্রুত পরিবর্তনশীল অর্থনীতি, বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব এবং নতুন বিশ্বব্যবস্থার অনিশ্চয়তা। এ বাস্তবতায় জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষার পাশাপাশি এশিয়ার বাজার, প্রযুক্তি ও আঞ্চলিক সরবরাহশৃঙ্খলের সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ কতা গভীর করা যায়, সেটিই সামনে বড় অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রশ্ন হয়ে উঠছে।

কেকে/ এমএস


আরও সংবাদ   বিষয়:  বিনিয়োগ   উৎপাদন   বাংলাদেশ  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close