রোববার, ৪ অক্টোবর ২০২৬,
১৯ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

রোববার, ৪ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম: ● দেশের অর্থনীতি একাধিক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে : অর্থমন্ত্রী      ● সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুরের বারসহ রাজধানীর চার বারে অভিযান      ● বঙ্গোপসাগরকে নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে রাখতে চায় বাংলা‌দেশ : মুনীরুজ্জামান      ● গাজীপুরে মেট্রিক্স গার্মেন্টসের আগুন নিয়ন্ত্রণে, আটকে পড়া ৬৯ শ্রমিক উদ্ধার      ● ডেঙ্গুতে আরও ছয়জনের মৃত্যু, হাসপাতালে নতুন ভর্তি ১৬০৮      ● ২৪ ঘণ্টায় হামে ৮ জনের প্রাণহানি      ● হা‌সিনাকে আশ্রয় দেওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প ছিল না : দীনেশ ত্রিবেদী      
খোলাকাগজ স্পেশাল
আ.লীগপন্থি ঠিকাদারে জিম্মি খাদ্য অধিদপ্তর
জামালুদ্দিন হাওলাদার, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: রোববার, ৪ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:৫৭ এএম আপডেট: ০৪.১০.২০২৬ ৮:৫৯ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া দুই হাজার ৫০৫ পরিবহন ঠিকাদারের কাছে জিম্মি হয়ে আছে দেশের খাদ্য অধিদপ্তর। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের দুই বছর দুইমাস পরও দফায় দফায় বাড়ানো হচ্ছে পুরোনো ও বিতর্কিত এসব ঠিকাদারের চুক্তির মেয়াদ। আর এ সুযোগে সরকারি খাদ্যশস্য পরিবহন, মেজর ক্যারিয়ার, শ্রম ও হ্যান্ডলিংয়ে হাজার কোটি টাকা লুটে নিচ্ছে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগসহ এর অঙ্গ-সংগঠনের নেতাকর্মীরা। 

অভিযোগ রয়েছে, এসব ঠিকাদারের মাধ্যমে সরকারি খাদ্যশস্য পরিবহন, মেজর ক্যারিয়ার, শ্রম ও হ্যান্ডলিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে প্রতিবছর বিপুল অর্থের লেনদেন হচ্ছে। নতুন ঠিকাদার নিয়োগের প্রক্রিয়াও মামলা ও প্রশাসনিক জটিলতায় বছরের পর বছর আটকে আছে।

সর্বশেষ গত বুধবার খাদ্য মন্ত্রণালয় সারা দেশের মেজর ক্যারিয়ার, শ্রম ও হ্যান্ডলিংসহ সিআরটিসি, ডিআরটিসি, আইআরটিসি এবং ডিবিসিসি ঠিকাদারদের কার্যক্রম আরও তিন মাস চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। ১ অক্টোবর থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিদ্যমান ঠিকাদারদের কাজ অব্যাহত রাখার পাশাপাশি এ সময়ের মধ্যে নতুন ঠিকাদার নিয়োগের প্রক্রিয়া শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, কেন্দ্রীয় ও সাত আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকের অধীনে এক থেকে দেড় দশক আগে দলীয় বিবেচনায় বিভিন্ন শ্রেণির ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। অনেকের চুক্তির মেয়াদ বহু বছর আগে শেষ হলেও নতুন নিয়োগ না হওয়ায় তারাই কাজ করে যাচ্ছেন। খাদ্য অধিদপ্তরের ২০২২-২৩ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারি খাদ্যশস্য পরিবহনে সারা দেশে বিভিন্ন শ্রেণির ২ হাজার ৫০৬ ঠিকাদার রয়েছে। তাদের মধ্যে সিআরটিসি ৫৮৭, চট্টগ্রামে ডিআরটিসি ৪৬৯, রাজশাহীতে ৪১৪, খুলনায় ২৬৭ এবং ঢাকায় ১০৬ জনসহ বিভিন্ন পর্যায়ে আরও ঠিকাদার রয়েছেন।

অভিযোগ রয়েছে, ২০০৭ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ঠিকাদার নিয়োগ, খাদ্যশস্য পরিবহন, গ্রহণ, মজুত, সরবরাহ, ট্রানজিট ও ঘাটতিসহ বিভিন্ন পর্যায়ে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান করেছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগও অনুসন্ধানের আওতায় ছিল। তবে সেই অনুসন্ধান পরে আর এগোয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

মামলার জালে নতুন নিয়োগ : 

চট্টগ্রামে সর্বশেষ ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ডিআরটিসি ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয়। ২০২২ সালে নতুন ঠিকাদার তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া শুরু হলেও আবেদন জমার শেষ দিনের আগেই ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের দুটি মামলায় তা আটকে যায়। এরপর পুরোনো ঠিকাদারদের মেয়াদ বাড়িয়ে কাজ চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

হালিশহর কেন্দ্রীয় খাদ্য সংরক্ষণাগারে (সিএসডি) শ্রম ও হস্তান্তর কাজের ঠিকাদার মেসার্স রাজ্জাক এন্টারপ্রাইজের ক্ষেত্রেও নতুন দরপত্র ছাড়াই চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর অভিযোগ উঠেছে। ২০ সেপ্টেম্বরের অফিস আদেশে ২৩ সেপ্টেম্বর চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ২৪ থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত একই দর ও শর্তে প্রতিষ্ঠানটিকে কাজ চালিয়ে যেতে বলা হয়। একইসঙ্গে নতুন ঠিকাদার নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত কাজ চালিয়ে যাওয়ার শর্ত রাখা হয়।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী আবদুর রাজ্জাক বাঁশখালী উপজেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা ছিলেন এবং ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলন ঘিরে অস্ত্র ও খাবার সরবরাহ এবং হত্যা মামলায় অভিযুক্ত। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, হালিশহর সিএসডিতে খাদ্যশস্য পরিবহনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের কাছ থেকে প্রতি ট্রাকে ১ হাজার ৭০০ টাকা করে ‘হ্যান্ডেলিং খরচ’ বা বখশিশের নামে আদায় করা হয়। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

ছয় বছরেও হয়নি সিআরটিসি নিয়োগ : 

২০২০ সালে ২০২০-২১ ও ২০২১-২২ অর্থবছরের জন্য নতুন সিআরটিসি ঠিকাদার নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হলেও ছয় বছর পর ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে এসে তা বাতিল করা হয়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ২৪ সেপ্টেম্বরের নোটিসে ১৮ আগস্ট ২০২০ সালের বিজ্ঞপ্তির আওতায় নেওয়া নিয়োগ কার্যক্রম বাতিলের কথা বলা হয়েছে। ফলে এ সময়ে পুরোনো ঠিকাদারদের মেয়াদ বাড়িয়ে কাজ চালানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

খুলনা-বরিশালেও ২০১২-১৩ ও ২০১৩-১৪ অর্থবছরে নিয়োগ পাওয়া ডিবিসিসি ঠিকাদারদের চুক্তির মেয়াদ-পরবর্তী সময়ে বাড়ানো হয়েছে। খাদ্য অধিদপ্তরের নথিতে এসব চুক্তি ২০২৪ সাল পর্যন্ত গড়ানোর তথ্য রয়েছে। অন্যদিকে রাজশাহীতে ২০২০ সালে নতুন ডিআরটিসি নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলেও ২০২৬ সালের মার্চেও পুরোনো ডিআরটিসি চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর উদ্যোগের নোটিশ প্রকাশ করা হয়েছে।

ময়মনসিংহ, রংপুর ও সিলেটের ক্ষেত্রেও পুরোনো ঠিকাদারদের তালিকা পাওয়া গেলেও পরবর্তী নিয়োগের ধারাবাহিক তথ্য অনেক ক্ষেত্রে প্রকাশ্য নথিতে নেই। ফলে এসব অঞ্চলে ঠিকাদার নিয়োগ ও চুক্তির বর্তমান অবস্থা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

ইজিপি জটিলতায় নতুন টেন্ডার : 

চট্টগ্রাম আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক জি এম ফারুক হোসেন পাটওয়ারী বলেন, নতুন ঠিকাদার নিয়োগে এখন সরাসরি টেন্ডার আহ্বান করা সম্ভব নয়। ইজিপিতে টেন্ডার করতে হলে বাজার যাচাই করে মূল্য নির্ধারণসহ কয়েকটি বিষয় আগে নিষ্পত্তি করতে হবে।

আইআরটিসি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ২০১৩ সালের পর কেন টেন্ডার হয়নি, সে বিষয়ে তিনি কিছু বলতে পারবেন না। আইআরটিসির কাজের ধরন ভিন্ন হওয়ায় এটি ইজিপিতে করা সম্ভব নয়। ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে টেন্ডার আহ্বানের অনুমতি চেয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কমিটির কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। অনুমতি পাওয়া গেলেই টেন্ডারে যাওয়া সম্ভব হবে।

এদিকে ব্যবসায়ীদের একটি অংশ নতুন ঠিকাদার নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত পুরোনো ঠিকাদারদের বাদ দিয়ে মাস্টাররোলে কাজ পরিচালনার দাবি জানিয়ে আসছেন। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে পুরোনো ঠিকাদারদের মেয়াদ বাড়ানোর ফলে নতুন প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগের পথ বন্ধ হয়ে আছে।

খাদ্য পরিবহন ও হস্তান্তর খাতের এই দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে একদিকে পুরোনো ঠিকাদারদের প্রভাব ও মেয়াদ বৃদ্ধির অভিযোগ, অন্যদিকে নতুন দরপত্রের প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতা—দুই দিকই সামনে এসেছে। ফলে বিপুল অর্থের এ খাতে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক ঠিকাদারি ব্যবস্থা কবে কার্যকর হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close