চট্টগ্রামের খুলশীতে সবজি বিক্রেতার ছেলে হৃদয়ের খুন আর কুমিল্লায় স্কুলশিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে হত্যা করে লাশ গুমের ঘটনা আমাদের নতুন করে মনে করিয়ে দিল, কিশোর গ্যাং এখন আর শহরের কোনো কোণে আটকে থাকা সমস্যা নয়।
পুলিশের পর্যালোচনায় ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪২৪টি মামলায় ৩০৭টি গ্যাংয়ের ২ হাজার ৬২৫ সদস্যের বিরুদ্ধে ২৩ ধরনের অপরাধের তথ্য মিলেছে। তালিকায় আছে চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মাদক, অস্ত্র, সাইবার অপরাধ, অপহরণ, ধর্ষণ ও হত্যা। আটটি মহানগর ও ৬৪ জেলায় এই গ্যাংয়ের উপস্থিতি বলে দিচ্ছে, সমস্যাটি এখন জাতীয়।
অপ্রতিমের হত্যার পর পুলিশ সারা দেশে অভিযানে নেমেছে। ২১ থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর, ১০ দিনে গ্রেপ্তার হয়েছে ৩ হাজার ৮৪৪ জন। একদিনে লক্ষ্মীপুরেই ৯৯ জন। জনউদ্বেগের মুখে এই তৎপরতা প্রত্যাশিত। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই গণগ্রেপ্তার কি সমস্যার সমাধান করবে, নাকি শুধু সংখ্যার হিসাব বাড়াবে?
লক্ষ্মীপুরের ওসি নিজেই বলেছেন, আটক কিশোরদের তথ্য যাচাই-বাছাই করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অর্থাৎ ধরার পর যাচাই। এতে নিরপরাধ বা প্রান্তিক কোনো কিশোরের হয়রানির ঝুঁকি থাকে। আবার প্রকৃত অপরাধীদের সঙ্গে প্রাথমিক অপরাধীদের একই হাজতে রাখলে কিশোর সংশোধন না হয়ে আরও পাকা অপরাধী হয়ে বের হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কিশোরদের জন্য শিশু আইন ও সংশোধনমূলক ব্যবস্থার মর্যাদা রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
এই সমস্যার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, ছোটদের পেছনে বড়দের ছায়া। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, খুলশীর ‘সেভেন স্টার’ গ্রুপ পরিচালনায় নাম এসেছে এক বহিষ্কৃত রাজনৈতিক নেতার, যার বিরুদ্ধে ১৭টি মামলা রয়েছে। মোহাম্মদপুরে জমি দখলের চেষ্টার নেপথ্যেও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের সঙ্গে আঁতাতের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগগুলো আদালতে প্রমাণের অপেক্ষায় থাকলেও প্রবণতাটি স্পষ্ট। দখল, চাঁদাবাজি ও ক্ষমতার প্রদর্শনে কিশোরদের ব্যবহার করা হচ্ছে ঢাল হিসেবে। কিশোরেরা ধরা পড়ে, ‘গডফাদাররা’ থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে।
অধ্যাপক কেএম জাহিদুল ইসলাম ঠিকই বলেছেন, কারা কিশোরদের এই পথে ঠেলে দিচ্ছে, তা খুঁজে বের করা এবং তাদের আইনের আওতায় আনা জরুরি। এই জায়গায় ব্যর্থ হলে একটি গ্যাং ভাঙলে আরেকটি জন্ম নেবে।
সেই সঙ্গে সমাজের দিকেও তাকাতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞানের শিক্ষক মু. রেজাউল করিম সোহাগ দেখিয়েছেন, দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ শিশু-কিশোর। অভিভাবকের নজরদারির ঘাটতি, মাদকের সহজলভ্যতা আর স্কুল থেকে ঝরে পড়া এই পরিস্থিতিকে জটিল করছে। যে কিশোরের হাতে কাজ নেই, মাঠ নেই, স্কুলে মন নেই, তাকে গ্যাংয়ের ‘ভাই’ খুব সহজেই আপন করে নেয়। সিনিয়র-জুনিয়র বিরোধের মতো তুচ্ছ কারণে প্রাণ যাওয়ার ঘটনা দেখায়, এই কিশোরদের মধ্যে সহিংসতা কতটা স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে।
তাই অভিযানের পাশাপাশি আমরা কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি মনে করি। প্রথমত, গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষক সন্ত্রাসী ও রাজনৈতিক নেতাদের চিহ্নিত করে দলীয় পরিচয় নির্বিশেষে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। কেবল বহিষ্কার যথেষ্ট নয়।
দ্বিতীয়ত, গ্রেপ্তার হওয়া কিশোরদের ক্ষেত্রে শিশু আইনের বিধান মানতে হবে। প্রাথমিক অপরাধীদের জন্য কাউন্সেলিং, পুনর্বাসন ও শিক্ষায় ফেরানোর ব্যবস্থা থাকতে হবে।
তৃতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করে তাদের জন্য শিক্ষা, দক্ষতা প্রশিক্ষণ ও খেলাধুলার সুযোগ বাড়াতে হবে।
চতুর্থত, অভিভাবক, শিক্ষক ও জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম কাগজে না রেখে মাঠপর্যায়ে নিয়মিত চালাতে হবে। মাদকের সরবরাহ বন্ধেও কঠোর হতে হবে।
কিশোর অপরাধ দমনে পুলিশের অভিযান দরকার, কিন্তু একা তা যথেষ্ট নয়। যে সমাজ তার কিশোরদের নিরাপদ আশ্রয় দিতে পারে না, সেখানে অপরাধী গোষ্ঠী সেই শূন্যতা পূরণ করে। হৃদয় ও অপ্রতিমের মতো আর কোনো কিশোরের জীবন যেন এভাবে শেষ না হয়, সেটাই হোক এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার।
অভিযানের সংখ্যা নয়, গ্যাংয়ের পেছনের শক্তি ভাঙা আর কিশোরদের সুস্থ পথে ফেরানোই হবে সাফল্যের আসল মাপকাঠি।
কেকে/ এমএস