জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার পুনট ইউনিয়নের মাদাই খরপা গ্রামের বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ফাতেমা (৫০) নামে এক সৎ মাকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে সতিনের ছেলে-মেয়ে ও ছেলের বউয়ের বিরুদ্ধে। শুধু মারধরই নয়, তার হাত ও বুকে জখম এবং দাঁত ভেঙে দিয়েছে। এমনকি হাত-পা বেঁধে সারারাত বাড়ির বাইরে তেঁতুলগাছের নিচে ফেলে রেখেছে।
এ লোমহর্ষক ঘটনা গত বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) দিবাগত রাতে ঘটার পর শুক্রবার সন্ধ্যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠে। পরে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী নারীকে স্থানীয় লোকজন উদ্ধার করে কালাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করান। খবর পেয়ে রাতেই ওই নারীর বাবার বাড়ির লোকজন হাসপাতালে আসেন। পরে চিকিৎসকের পরামর্শে তাকে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে তার চিকিৎসা চলছে।
ভুক্তভোগী ওই নারী মাদাই গ্রামের মো. খয়বর আলীর স্ত্রী।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পরিবারের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ফাতেমা দীর্ঘদিন ধরে মানসিক রোগে ভুগছিলেন। তার স্বামী মো. খয়বর আলীর বয়স ৮৫ বছর হওয়ায় অসুস্থ হয়ে ঘরের মধ্যে বিছানায় শয্যাশায়ী। এ অবস্থায় তাদের ভরণ-পোষণ ও দেখভাল নিয়ে সন্তান ও তাদের স্ত্রীদের মধ্যে চরম অসন্তোষ বিরাজমান করছে। এর আগেও বেশ কয়েকবার সন্তানরা তাদের ওপর শারীরিক নির্যাতন করেছেন।
এরই ধারাবাহিকতায় গত বৃহস্পতিবার রাতে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী নারীর সতিনের ছেলে আব্দুল খালেক ও আব্দুল খলিল এবং তাদের স্ত্রীরা মিলে ফাতেমার হাত-পা বেঁধে বেধড়ক মারপিট করেন। এতে ফাতেমার দাঁত ভেঙে যায়, বুকে আঘাত পান, হাতে ও বুকে মারাত্মক জখম হয়। পিঠ-ঘাড়সহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে মারপিটের চিহ্ন রয়েছে। এতেই ক্ষান্ত না হয়ে তারা সবাই মিলে ফাতেমার হাত-পা বেঁধে সারারাত বাড়ির বাইরে তেঁতুলগাছের নিচে ফেলে রাখেন।
প্রতিবেশী গৃহবধূ রিমি আক্তার বলেন, ‘সৎ ছেলে ও ছেলের বউ মিলে মারধর করেছে। হাত-পা বেঁধে সারারাত বাইরে ফেলে রেখে গেছে। সকালে গিয়ে দেখি, তেঁতুলগাছের নিচে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় জ্ঞান হারিয়ে পড়ে আছে। ওই অবস্থায় গ্রামের লোকজন তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করেছে।’
আরেক প্রতিবেশী পারমিনা আক্তার বলেন, ‘পূর্বেও ফাতেমাকে মারধর করেছে ছেলেরা। তাকে খুব বেশি নির্যাতন করেছে ওরা। ওর দাঁত পর্যন্ত ভেঙে ফেলেছে তার সৎ ছেলে ও ছেলের বউরা। ওদের শাস্তি চাই।’
ছাফিয়া নামের আরেক প্রতিবেশী বলেন, ‘সতিনের ছেলে ও ছেলের বউদের অত্যাচারে ফাতেমা বাড়িতে থাকতে পারত না। ওই অবস্থায় বৃদ্ধ স্বামীর খাবারের জন্য গ্রামের সবার বাড়িতে চলাচল করতেন ফাতেমা। তারপরও তারা সবাই মিলে তাকে নির্যাতন করে।’
অভিযুক্ত সৎ ছেলে মো. আব্দুল খলিল বলেন, ‘আমরা তাকে মারপিট করিনি। ওই রাতে আমার ভাই আব্দুল খালেক সৎ মাকে ধরেছিল, আর বাবা তাকে মারপিট করেছে। তাতে আমাদের দোষ কী?’ বেঁধে রেখে মারপিট করে দাঁত ভাঙা ও হাতে জখম হয়েছে—এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সবই সত্য, তবে আমরা মারপিট করিনি।’
ভুক্তভোগীর ভাই মো. আলম হোসেন বলেন, ‘আমার বোনকে ওরা নিয়মিত মারপিট করে আসছে। অনেক বিচার-সালিশও হয়েছে। বয়স বেশি হওয়ায় আমরা তাকে বাড়িতে নিয়ে আসতে পারিনি। রাতের ঘটনার পরদিন রাতে খবর পেয়ে হাসপাতালে গিয়ে দেখি, আমার বোন বেডে শুয়ে আছে। চিকিৎসকের পরামর্শে পরে তাকে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেছি। সেখানেই তার চিকিৎসা চলছে।’
কালাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইদুল আলম বলেন, ‘খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। ততক্ষণে তাকে প্রতিবেশীরা হাসপাতালে ভর্তি করেছে। পরে হাসপাতালে গিয়ে তাকে না পাওয়ায় নিকটাত্মীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত ওই ঘটনায় কোনো অভিযোগ করেনি। অভিযোগ করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
কেকে/ এমএস