রোববার, ৪ অক্টোবর ২০২৬,
১৯ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

রোববার, ৪ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম: ● এক লাফে ২৫২ টাকা বাড়ল এলপিজির দাম      ● গণতন্ত্র নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে ধাপে ধাপে তৈরি হয় : রাষ্ট্রপতি      ● সেপ্টেম্বরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৪২৩, মোটরসাইকেলেই ১৩৯      ● ভবিষ্যতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ নিয়ে ভুল সিদ্ধান্ত হবে না: ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী      ● মদিনায় হুতিদের হামলায় বাংলাদেশের তীব্র নিন্দা      ● সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন নির্ধারণ শুরু কাল      ● দেশের অর্থনীতি একাধিক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে : অর্থমন্ত্রী      
দেশজুড়ে
সিলেট-আখাউড়া রুটে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে চলছে ট্রেন
মো. এহসানুল হক, মৌলভীবাজার
প্রকাশ: রোববার, ৪ অক্টোবর, ২০২৬, ৫:০৭ পিএম
ছবি: প্রতিবেদক

ছবি: প্রতিবেদক

নিরাপদ ও আরামদায়ক ভ্রমণের বিশ্বস্ত বাহন হিসেবে একসময় পরিচিত থাকলেও সিলেট-আখাউড়া রেলপথ এখন যাত্রী ও পর্যটকদের জন্য চরম আতঙ্কের নাম। ১২৭ বছরের জরাজীর্ণ লাইন, মেয়াদের দ্বিগুণ সময় পার করা জরাজীর্ণ সেতু এবং পুরোনো ও বিকল ইঞ্জিনের ওপর ভর করে প্রতিদিন মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে ছুটছে ট্রেন। সিলেট-আখাউড়া রুটে চলতি বছরে অন্তত সাতটি ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটেছে। গত মার্চ ও এপ্রিলে ইঞ্জিন বিকল ও লাইনচ্যুতির ধকল সামলাতে গিয়ে শিডিউল ভেঙে পড়েছে অন্তত ৬০টি ট্র্রেনের। 

অভিযোগ উঠেছে, ১২৭ বছরের জরাজীর্ণ লাইনে জোড়াতালি সংস্কারে কোটি টাকা খরচ হলেও কর্তৃপক্ষের চরম উদাসীনতায় যেকোনো মুহূর্তে ঘটতে পারে ভয়াবহ প্রাণহানি। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটে গত শুক্রবার দুপুরে। সিলেট থেৃেক ছেড়ে আসা চট্টগপ্রামগামী আন্তঃনগর ‘পাহাড়িকা এক্সপ্রেস’ কমলগঞ্জের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের পাহাড়ি খাড়া ঢালে বেয়ে ওঠার সময় হঠাৎ ট্রেনের ইঞ্জিনের হুক (ক্লিপ) ছিঁড়ে যায়। চালক টের পাওয়ার আগেই ট্রেনের পেছনের সবকটি বগি বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়ে আটকে পড়ে নির্জন গহীন অরণ্যে। বগিগুলো ফেলে রেখে চালক পুরো ট্রেন নিয়ে চলে যান শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে স্টেশনে। 

গহীন বনে মোবাইল নেটওয়ার্কহীন ও ঘুটঘুট আঁধারে টানা চার ঘণ্টা চরম আতঙ্ক আর নিরাপত্তাহীনতায় কাটে যাত্রীদের। পরবর্তী বিকল্প ইঞ্জিন পাঠিয়ে বিকাল ৫ টা ১৫ মিনিটে উদ্ধারকাজ শেষ হলে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়। তবে সৌভাগ্যবশত এ ঘটনায় প্রাণহানি না ঘটলেও এ রুটে ভ্রমণের আতঙ্ক সাধারণ যাত্রী ও পর্যটকদের। 

রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলীয় জোনের তথ্যমতে, আখাউড়া-সিলেট রেলপথে পারাবত, জয়ন্তিকা, পাহাড়িকা, উদয়ন, উপবন ও কালনি এক্সপ্রেস ট্রেনে প্রতিদিন ১২-১৫ হাজার যাত্রী সিলেট-ঢাকা এবং সিলেট-চট্টগ্রাম যাতায়াত করেন। দেশের সব রেলওয়ে সেকশন এখন ডুয়েল গেজ লাইন থাকলেও আখাউড়া থেকে সিলেট পর্যন্ত ব্রিটিশ আমলের রেল লাইনেই চলছে ট্রেন। ২০১৯ সালে সিলেট-আখাউড়া রেলপথকে ডুয়েল গেজে রূপান্তরিত করার জন্য একনেকে ১৬ হাজার ১৪৪ লাখ টাকার প্রকল্প অনুমোদন হয়। ২০২৫ সালের মধ্যে এ পপ্রকল্পের কাজশেষ হওয়ার কথা। তবে এ প্রকল্পের কাজ শুরুই হয়নি। 

অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৮৯৮ সালে আসাম-চট্টগ্রাম সরাসরি যোগাযোগের উদ্দেশ্যে নির্মিত শ্রীমঙ্গল-কুলাউড়া-আখাউড়া ১৭৯ কিলোমিটার মেটারগেজ রেলপথটি গত এক শতাব্দীতেও আধুনিক রূপ পায়নি। রেলওয়ে প্রকৌশল বিভাগের নথিমতে, যেকোনো ব্রিজের গড় আয়ু ৫০-৫৫ বছর হলেও সিলেট-আখাউড়া সেকশনের ৯০ শতাংশ সেতুর বয়স ৭০ বছর অতিক্রম করেছে। পুরো সেকশনের ১৩টি অত্যন্ত নাজুক স্থানকে চিহ্নিত করা হয়েছে ‘ডেড স্টপ’ বা ডেঞ্জার জোন হিসেবে। যেখানে ট্রেন থামিয়ে বা গতি ৫ কিলোমিটারের নিচে নামিয়ে চরম ঝুঁকিতে পার হতে হয়। 

এর মধ্যে কমলগঞ্জের শমসেরনগর-টিলাগাঁও সেকশনের ২০০ নম্বর সেতু, সিলেটের মোগলাবাজার-মাইজগাঁও সেকশনের ৪৩, ৪৫, ৪৭ নম্বর সেতু, কুলাউড়া-বরমচাল সেকশনের ৫ ও ৭ নম্বর সেতু, মাইজগাঁও-ভাটেরাবাজার সেকশনের ২৯ নম্বর সেতু, মনতলা-ইটাখোলা সেকশনের ৫৬ নম্বর সেতু,  সাতগাঁও-শ্রীমঙ্গল সেকশনের ১৪১ নম্বর সেতু, শ্রীমঙ্গল-ভানুগাছ সেকশনের ১৫৭ নম্বর সেতুকে রেলওয়ের কর্মচারীরাই বলছেন ‘মৃত্যুফাঁদ’। উপরন্তু ঘন ঘন নাট-বল্টু চুরির ঘটনা এবং প্রচণ্ড গরমে লাইন বাঁকা হয়ে যেকোনো সময় লাইনচ্যুতির আশঙ্কা লেগেই আছে। 

রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, সিলেট থেকে মোগলাবাজার স্টেশন পর্যন্ত ১৫ কিলোমিটারের মধ্যে ৮টি এবং মোগলাবাজার থেকে আখাউড়া পর্যন্ত ১৬৪ কিলোমিটারের মধ্যে ৫টি সেতু ডেড স্টপ হিসেবে চিহ্নিত। 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সিলেট-ঢাকা ও সিলেট-চট্টগপ্রাম ররুটে প্রতিদিন চলাচল করে ৬টি আন্তঃনগর ট্রেন (পারাবত, জয়ন্তিকা, পাহাড়িকা, উদয়ন, উপবন ও কালনী)। বার্ষিক যাত্রীসংখ্যা প্রায় কয়েক কোটি। এত গুরুত্বপূর্ণ রুটে সরবরাহ করা হয়েছে ২৬১০ এবং ২৯০২ সিরিজের মেয়াদোত্তীর্ণ ও পরিত্যক্ত ঘোষণা করার মতো পুরনো সব ইঞ্জিন। লাউয়াছড়ার পাহাড়ি পথ বা উঁচুতে ওঠার সময় প্রায় দিনই এ সব ইঞ্জিনের প্রেসার কমে বিকল হয়ে যায়। ফলে প্রতিটি ট্রেনের শিডিউল ২-৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিলম্বিত হওয়া স্বাভাবিক নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেখানে দেশের অন্যান্য রুট আধুনিক ডুয়েল গেজ ও ডাবল লাইনে রূপান্তর হয়েছে, সেখানে সিলেটবাসী বঞ্চিত। 

২০১৯ সালে ১৬ হাজার ১৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘আখাউড়া-সিলেট ডুয়েল গেজ রূপান্তর’ প্রকল্প একনেকে অনুমোদন পেলেও ২০২৫ সালের মধ্যে কাজ শেষের সময়সীমা ছুঁইছুঁই। অথচ দীর্ঘ ৫ বছরে মাঠপর্যাযয়ে এক টাকার কাজও শুরু করতে পারেনি সংশ্লিষ্টরা। 

স্থানীয় বাসিন্দা জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘আর আশ্বাসে আটকে না থেকে অনতিবিলম্বে ডুয়েল গেজ লাইনের কাজ শুরু করা হোক এবং সিলেট রুটে দ্রুত নতুন ইঞ্জিন বরাদ্দ দিয়ে নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা হোক। মৌলভীবাজার জেলাসহ সিলেট অঞ্চলের সাধারণ যাত্রী ও পর্যটকদের দাবি ঝুঁকিপূর্ণ লাইন ও সেতু দ্রুত মেরামত এবং সিলেট রুটে আধুনিক ডাবল লাইন ও নতুন ইঞ্জিন বরাদ্দ দেওয়া হোক।’ 

দুর্ঘটনার বিষয়ে রেলওয়ের উর্ধ্বতন প্রকৌশলীরা জোড়াতালির নিয়মিত মেরামতের অজুহাত দিলেও দৃশ্যমান কোনো উন্নতি দেখা যাচ্ছে না। এ সব বিষয়ে শ্রীমঙ্গল রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী মো. সাইফুল্লাহ বলেন, ‘রেলের এ সমস্যাগুলো দীর্ঘদিনের। আমাদের পক্ষ থেকে সব সময় লাইনে কাজ করা হয়, যাতে কোনো সমস্যা না হয়। রেলপথে হুক, ক্লিপসহ লাইন মেরামত নিয়মিত করে থাকি। এ ছাড়া ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি সেতু মেরামত করা হয়েছে।’

পর্যায়ক্রমে প্রতিটি সেতুতে কাজ হবে বলেও তিনি জানান। 

ট্রেন যাত্রা নিরাপদ ও যাত্রীদের দুর্ভোগ কমাতে নতুন ট্রেন ও বগি বাড়ানোর বিষয়ে সরকার কাজ করছে বলে জানান শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে স্টেশনের মাস্টার মো. সাখাওয়াত হোসেন। 

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (উন্নয়ন) আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমান দৈনিক খোলা কাগজকে বলেন, চাহিদার তুলনায় সারাদেশে ট্রেনের ইঞ্জিন সংকট রয়েছে। নতুন এডিপি প্রকল্প এবং বৈদেশিক অর্থায়নের প্রকল্প অনুমোদন পেলে দেড় বছরের মধ্যে সিলেটবাসীর এ সংকট কাটিয়ে ওঠা যাবে।’

একের পর এক দুর্ঘটনা এবং লাউয়াছড়ার ভয়াবহ অবহেলার বিষয়ে রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) মোহাম্মদ নাজমুল ইসলাম ও অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) মো. সুবক্তগীনকে একাধিকবার কল করা হলেও তারা ফোন রিসিভ করেন নি।

কেকে/এআই


আরও সংবাদ   বিষয়:  সিলেট   আখাউড়া   রুট   মৃত্যুর ঝুঁকি   ট্রেন  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

দেশজুড়ে- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close