এক বছর আগেও প্রতিমাসে বিদ্যুৎ বিল দিতে হতো ৩৫-৪০ হাজার টাকা। বছরে ব্যয় হতো প্রায় সাড়ে ৪ লাখ থেকে পৌনে ৫ লাখ টাকা। এখন সেই বিদ্যুৎ বিল নেমে এসেছে প্রায় শূন্যে। ছয় লাখ টাকা খরচ করে ছাদে সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থা করায় এমন পরিবর্তন এসেছে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার ভূজপুর ইউনিয়নের আল মাহাদুল ইসলামি বালক-বালিকা মাদরাসায়।
হেফজ ও এতিমখানাসহ ৯৫০ শিক্ষার্থীর এ মাদ্রাসায় শ্রেণিকক্ষ, আবাসিক ভবন, রান্নাঘরসহ বিভিন্ন স্থাপনায় বিদ্যুতের ব্যবহার রয়েছে। শিক্ষার্থীদের একটি অংশ আবাসিক হওয়ায় দিন-রাতই বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে নেট মিটারিং পদ্ধতিতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের পর নিজেদের উৎপাদিত বিদ্যুৎ দিয়েই সেই চাহিদার বড় অংশ মেটাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।
মাদরাসা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, সোলার ব্যবস্থা স্থাপনের আগে মাসে গড়ে ৩৫-৪০ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল দিতে হতো। এখন সেই ব্যয় প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়েছে। মাসে ৩৫-৪০ হাজার টাকা সাশ্রয় হলে বছরে সাশ্রয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৪ লাখ ২০ হাজার থেকে ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা। সরল হিসাবে, প্রায় ৬ লাখ টাকার বিনিয়োগ এক থেকে দেড় বছরের কিছু বেশি সময়ে উঠে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
নেট মিটারিং পদ্ধতিতে ছাদের সৌর প্যানেল থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ প্রথমে গ্রাহকের নিজের কাজে ব্যবহৃত হয়। উৎপাদন বেশি হলে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা যায়। দ্বিমুখী মিটারে গ্রিড থেকে নেওয়া ও গ্রিডে সরবরাহ করা বিদ্যুতের হিসাব রাখা হয় এবং নিয়ম অনুযায়ী তা বিদ্যুৎ ব্যবহারের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়।
আল মাহাদুল বালক-বালিকা মাদরাসার সহকারী পরিচালক হাফেজ মো. এমদাদ বলেন, ‘একসময় মাদরাসায় প্রতি মাসে বিদ্যুৎ বিল বাবদ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ ব্যয় হতো। নেট মিটারিং পদ্ধতিতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের পর এখন সেই বিল প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে। এতে মাদরাসার নিয়মিত ব্যয় অনেকটাই কমেছে। পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও আবাসিক কার্যক্রমও নির্বিঘ্নে পরিচালনা করা যাচ্ছে।’
ফটিকছড়িতে শুধু এ মাদ্রাসায় নয়, আবাসিক ভবনেও এ ধরনের সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ছে। উপজেলার ৭ নম্বর ওয়ার্ডে এক প্রবাসীর ছয়তলা ভবনের ছাদে সাড়ে ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে স্থাপন করা হয়েছে ১৫ কিলোওয়াট ক্ষমতার সৌর প্যানেল। সেখান থেকে প্রায় ১০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। ভবনটির চাহিদা ৬-৭ কিলোওয়াট। বাতি, ফ্যান, ২৬টি সিসি ক্যামেরা, লিফট ও পানির মোটর চালানোর পর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহের সুযোগ রয়েছে।
ভবনের মালিক মো. আলম বলেন, ‘সৌর প্যানেল স্থাপনের পর বিদ্যুৎ বিলের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। একই সঙ্গে নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর পর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে দেওয়ার সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে।’
চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ ফটিকছড়ি জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার আবুল বাসার শামছুদ্দিন আহম্মদ বলেন, ‘ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে নেট মিটারিং কার্যকর একটি পদ্ধতি। অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হলে তা বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়।’
ফটিকছড়ির অনেক বহুতল ভবনেও এরই মধ্যে নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে সৌর প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে। ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহীম বলেন, ‘বড় ভবন ও প্রতিষ্ঠানের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে অব্যবহৃত জায়গাকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে লাগানো সম্ভব। এতে একদিকে ভবন বা প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ ব্যয় কমছে, অন্যদিকে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন স্থাপনায় এ ধরনের উদ্যোগ বাড়ানো গেলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ সাশ্রয় ও পরিবেশ সুরক্ষায়ও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।’
কেকে/এআই