সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬,
২০ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম: ● সুবিধাভোগীদের আধিপত্যে ভাবমূর্তি সংকটে বিএনপি      ● এবার বাড়ল অটোগ্যাসের দাম      ● প্রতিটি সিটি করপোরেশন ও জেলায় হবে মাস্টারপ্ল্যান : প্রধানমন্ত্রী      ● হাম উপসর্গে আরও তিন মৃত্যু, মোট প্রাণহানি ১১২৫      ● ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় ছয় মৃত্যু, মোট প্রাণহানি ২৬২      ● এক লাফে ২৫২ টাকা বাড়ল এলপিজির দাম      ● গণতন্ত্র নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে ধাপে ধাপে তৈরি হয় : রাষ্ট্রপতি      
খোলাকাগজ স্পেশাল
সর্ষের ভেতর ভূত
স্বর্ণ চোরাচালানের প্রধান বাহক বিমানকর্মীরাই
শিপার মাহমুদ
প্রকাশ: সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:১৩ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দরে কঠোর নজরদারি, সিসিটিভি ক্যামেরা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযান সত্ত্বেও থামছে না স্বর্ণ চোরাচালান। নিরাপত্তাব্যবস্থার ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে প্রতিনিয়ত কৌশল বদলাচ্ছে চোরাকারবারিরা। এ কাজে বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ কর্মীদেরই ব্যবহার করা হচ্ছে, যাদের অবস্থান ও চলাচল সম্পর্কে নিরাপত্তাকর্মীদের নজরদারি তুলনামূলক কম। 

সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় বিমানকর্মীদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ উদ্ধারের পর বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। ফলে চোরাচালানের সামান্য অংশ ধরা পড়লেও বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ নিরাপত্তাব্যবস্থার নজর এড়িয়ে পাচার হয়ে যাচ্ছে।

পুলিশ ও শুল্ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত শাহজালাল বিমানবন্দর থানায় স্বর্ণ চোরাচালান-সংক্রান্ত ৬৯৭টি মামলা হয়েছে। ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন অভিযানে উদ্ধার হয়েছে অন্তত ১ হাজার ৯০৬ কেজি সোনা। এর আনুমানিক বাজারমূল্য হাজার কোটি টাকার বেশি। তবে অনেকেই বলছেন, উদ্ধার হওয়া স্বর্ণ মোট চোরাচালানের সামান্য অংশ। তাদের ভাষ্য— চোরাচালানের ১০ থেকে ২০ শতাংশের বেশি ধরা পড়ে না। সে হিসাবে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ নজরদারির বাইরে থেকেই যাচ্ছে।

দুই বিমানকর্মীর জুতার ভেতর মিলল ৯ কেজি স্বর্ণ :

গতকাল রোববার সকালে দুবাই থেকে আসা এমিরেটসের ইকে—৫৮২ ফ্লাইটের দুই বিমানকর্মীর কাছ থেকে ৯ দশমিক ৩৪ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় আটক হয়েছেন মো. মানিক মিয়া ও মো. মিজানুর রহমান। তারা দুজনই এয়ারক্রাফট টেকনিক্যাল হেলপার (এটিএইচ)।

কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (সিআইআইডি) জানিয়েছে, তাদের জুতার ভিতরে বিশেষ কায়দায় ৮০টি স্বর্ণের বার লুকানো ছিল। প্রতিটি বারের ওজন প্রায় ১১৭ গ্রাম। উদ্ধার করা স্বর্ণের আনুমানিক বাজারমূল্য ১৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা। এর আগে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ফ্লাইটটি ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দরে অবতরণের পর নজরদারি শুরু করেন সিআইআইডির কর্মকর্তারা। পরে রানওয়ের ২১ নম্বর গেট-সংলগ্ন ৪ নম্বর বোর্ডিং ব্রিজের নিচে অ্যাপ্রোন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ওই দুই কর্মীকে আটক করা হয়।

এর আগে চলতি মাসের শুরুতে শাহজালাল বিমানবন্দরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কর্মী ওবায়দুর রহমানের কাছ থেকেও স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়েছে। তার শার্টের পকেট ও কোমরের বেল্ট থেকে টিস্যুতে মোড়ানো নয়টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়। এসব বারের মোট ওজন ১ কেজি ৫ গ্রাম। আনুমানিক মূল্য প্রায় ২ কোটি টাকা। পরে ওবায়দুরের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে এক যাত্রীকেও আটক করা হয়। ঢাকা কাস্টমস হাউসের এয়ারপোর্ট ইউনিট এ অভিযান চালায়। এ সময় বিমানবন্দরের এভসেক ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছে— চোরাকারবারিরা বিমানের এমন কিছু জায়গা ব্যবহার করছে, যেখানে সাধারণ যাত্রীদের প্রবেশের সুযোগ নেই। এর মধ্যে কার্গো হোলের ভেতরের দিকের প্যানেল বক্স অন্যতম। এসব প্যানেল বক্সে ইউটিলিটি পাইপ ও বিভিন্ন সংযোগ থাকে। স্ক্রু দিয়ে আটকানো একাধিক বক্সও রয়েছে সেখানে। ফলে সাধারণ তল্লাশিতে এসব জায়গায় লুকানো স্বর্ণ ধরা পড়ার সম্ভাবনা কম। অতীতে বড় একটি চালানও এ প্যানেল বক্সে করে আনা হয়েছিল। ওই চালানে ছিল ১২৪ কেজি স্বর্ণ। এ ছাড়া বিমানের টয়লেটের টিস্যু বক্স, কমোডের পাশের জায়গা, আয়নার পেছন, গ্যাস মাস্কের সকেট এবং সিটের নিচেও স্বর্ণ লুকানো থাকে। বিমানবন্দরের ওয়াশরুমও ব্যবহার করা হচ্ছে চালান রেখে যাওয়ার জায়গা হিসেবে।

ধরা পড়ে বাহক, আড়ালে মূল হোতা : 

চোরাচালান-সংক্রান্ত মামলায় গ্রেপ্তার ও উদ্ধারের সংখ্যা বাড়লেও মূল হোতাদের অনেকে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে বেশির ভাগ সময় বাহক বা নিম্নস্তরের সদস্যরাই ধরা পড়ছেন। অনেক ক্ষেত্রে বিমানবন্দরে পরিত্যক্ত অবস্থায় ম্বর্ণের চালান উদ্ধার হয়। কিন্তু এর মালিক বা মূল হোতার সন্ধান মেলে না। কোনো বিমানকর্মী ধরা পড়লে সাময়িক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পরে চক্রটি নতুন পরিচয় ও কৌশলে আবার সক্রিয় হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। 

কাস্টমস গোয়েন্দা ও ঢাকা কাস্টমস হাউসের কর্মকর্তারা বলছেন, নজরদারি জোরদার থাকার কারণেই সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি চালান ধরা পড়েছে। তবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসে এ ধরনের ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটিকে একাধিকবার সতর্ক করা হয়েছে। বিমান কর্তৃপক্ষের বক্তব্য— অপরাধের দায় ব্যক্তির। কোনো ব্যক্তির অপরাধের দায় প্রতিষ্ঠান নেবে না। এ বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে।

সব বিমানবন্দরেই চোরাচালান চক্রের নেটওয়ার্ক : 

কেবল শাহজালাল নয়, শাহ আমানত ও ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকেও স্বর্ণ চোরাচালানের জন্য ব্যবহার করছে চক্রগুলো। এসব বিমানবন্দরে তাদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক রয়েছে। চক্রগুলোর সঙ্গে দেশের কিছু জুয়েলারি ব্যবসায়ীর যোগাযোগ রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের কথাও বলছেন সংশ্লিষ্টরা। 

বিমান ও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশের অভিযোগও রয়েছে।

গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, বাংলাদেশে সক্রিয় আন্তর্জাতিক কয়েকটি চক্র দেশের বাইরে বসেই এসব কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, পাকিস্তান, সৌদি আরব, চীন ও মালয়েশিয়াসহ অন্তত ১০টি দেশের নাগরিকদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। পুলিশ সদর দপ্তর ও শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর এমন ব্যক্তিদের একটি তালিকাও করেছে। সূত্রের দাবি, গত এপ্রিল মাসে ২০৯ জনের নামের ওই তালিকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

গোয়েন্দা সূত্র বলছে— বাংলাদেশে চোরাচালান হওয়া স্বর্ণের বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। এর মধ্যে দুবাই অন্যতম প্রধান উৎস। ওমান, কাতার ও সৌদি আরব থেকেও স্বর্ণ আসে। মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর থেকেও চালান আসে। দুবাইকে স্বর্ণ চোরাচালানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট হাব হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সেখান থেকে আকাশপথে স্বর্ণ আসে ঢাকায়। এরপর বিমানকর্মী বা অন্য সহযোগীদের মাধ্যমে তা বিমানবন্দর থেকে বের করে নেওয়া হয়। বড় চালানগুলো পরে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করা হয়। এরপর সড়কপথ, রেলপথ, ব্যক্তিগত গাড়ি কিংবা কুরিয়ার সার্ভিসে তা পাঠানো হয় সীমান্ত এলাকায়।

এ ছাড়া দেশের আটটি সীমান্ত জেলার প্রায় ৯০টি পয়েন্ট ব্যবহার করে এসব স্বর্ণ ভারতে পাচার করা হচ্ছে। এর মধ্যে যশোরের শার্শা ও বেনাপোল সীমান্তের কয়েকটি পয়েন্ট গুরুত্বপূর্ণ। শার্শার কায়বা, অগ্রভুলোট, পাঁচভুলোট, পুটখালী ও দৌলতপুর এবং চৌগাছার শাহজাদপুর, মাসিলা, কাঠগড়, আন্দুলপোতা ও কাবিলপুর সীমান্ত দিয়ে স্বর্ণ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁ ও উত্তর ২৪ পরগনার চক্রের কাছে পৌঁছায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

ঢাকা থেকে যশোর সীমান্তে পৌঁছানোর পথে কয়েক দফা হাতবদল হয়। ব্যবহার করা হয় সংকেত ও পাসওয়ার্ড। ফলে একজন বাহক সাধারণত পুরো চক্রের পরিচয় জানেন না। মাঝপথে কেউ ধরা পড়লেও তার কাছ থেকে মূল হোতা সম্পর্কে তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা কাস্টমস হাউসের অতিরিক্ত কমিশনার কামরুল হাসান খোলা কাগজকে বলেন, ‘এসব ঘটনায় আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা হয়। এরপর পুলিশ আইনগত ব্যবস্থা নেয়। একইসঙ্গে বিষয়টি জানিয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসকে অফিশিয়ালি চিঠি দেওয়া হয়। এরপর বিমান কর্তৃপক্ষও অভিযুক্ত কর্মীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় বা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে।’ 

গত এক বছরে এ ধরনের ঘটনায় কতটি মামলা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে সঠিক পরিসংখ্যান বলতে পারছি না। পরিসংখ্যান দেখে জানাতে পারব। তবে চোরাচালান বন্ধে আমরা সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নিচ্ছি।’

কেকে/ এমএস


আরও সংবাদ   বিষয়:  স্বর্ণ চোরাচালান   বিমানকর্মী  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close