তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) নিয়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে পুরোনো সিন্ডিকেট। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে চক্রটি অবধৈভাবে এলপিজিরি দাম বাড়িয়েই যাচ্ছে। অনেক এলাকায় এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়ায়ই যাচ্ছে না। বাড়তি দাম দিয়েও অনেকে সিলিন্ডার পাচ্ছেন না। এর মধ্যে নিয়মিত মূল্য সমন্বয়ের অংশ হিসেবে গতকাল রোববার ভোক্তাপর্যায়ে এলপিজি দাম বাড়িয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। এবার প্রতি কেজিতে বেড়েছে ২১ টাকা। এতে বাজারে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বেড়েছে ২৫২ টাকা। এতে ১ হাজার ৫৮৫ টাকা থেকে বেড়ে নতুন দাম হয়েছে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা। এর আগে গত মাসে দাম কমেছিল ১৩ টাকা।
তবে দাম বাড়ানোর আগেই বাজারে সংকটের অজুহাত দিয়ে ১২ কেজি সিলিন্ডার ২৪০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। ভোক্তাদের আশঙ্কা, বিইআরসির নতুন ঘোষণার পর আরও বেশি দামে এলপিজি কিনতে হবে।
এদিকে এলপিজি সংকট প্রসঙ্গে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এলপিজি সরকার আমদানি করে না। এটা প্রাইভেট কোম্পানি আনে।’ তিনি আরও বলেন, ‘অতিরিক্ত লাভের জন্য কেউ কেউ দাম বাড়াতে পারে। আমি ডিসিদের বলে দিয়েছি, দাম কেন বেড়েছে সেটা বের করতে।’
দেশের বাজারে এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহ করে সাধারণত বসুন্ধরা, ওরিয়ন, ফ্রেশ, যমুনা ও আই-গ্যাস। এর মধ্যে বসুন্ধরা, ফ্রেশ ও ওরিয়নের সিলিন্ডার বাজার থেকে সম্পূর্ণ উধাও। যমুনা ও আই-গ্যাসের সিলিন্ডার পাওয়া গেলেও তা নির্ধারিত দামে মিলছে না।
বাজার পরিস্থিতি :
খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, সিলিন্ডারের সরবরাহ নেই বলে তাদের কাছেও পণ্যটি নেই। অথচ আমদানিকারক ও অপারেটররা জানিয়েছে, এলপি গ্যাসের কোনো সংকট নেই। কিন্তু এরপরও ঢাকাসহ সারা দেশে গ্যাসসহ সিলিন্ডার সংকট আরও তীব্র হওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
এলপি গ্যাসের দাম প্রতি মাসে সমন্বয় করে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন। সে অনুযায়ী চলতি মাসের শুরুতে এলপিজির ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল এক হাজার ৫৮৫ টাকা। কিন্তু মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকেই বাজারে এই সিলিন্ডারের জন্য বাড়তি দাম নেওয়ার অভিযোগ উঠতে থাকে। এখন কোনো কোনো এলাকায় অতিরিক্ত ৬/৭শ টাকা পর্যন্ত দিয়েও গ্যাস সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না।
রাজধানীর আফতাবনগর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, এখানকার তিনটি এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার বিক্রির দোকানের মধ্যে দুটি পুরোপুরি বন্ধ এবং অন্য একটির দোকানে শাটার অর্ধেক নামানো অবস্থায় পাওয়া যায়।
বন্ধ একটি দোকানের সাইনবোর্ডে থাকা ফোন নম্বরে কল দিলে তা রিসিভ করেন দোকানে স্বত্বাধিকারী মো. হালিম হোসেনের ভাতিজা। দোকান বন্ধ কেন- এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘দোকান খোলা রেখে কী করব, গ্যাসই তো নাই। কয়েকটা সিলিন্ডার পাইছি। বিক্রি করে দোকান বন্ধ করে রাখছি।’ জানতে চাইলে তিনি জানান, ১২ কেজি প্রতিটি সিলিন্ডার তিনি ২৩০০ টাকা করে বিক্রি করেছেন।
রাজধানীর আরও কয়েকটি এলকায় গিয়ে একই চিত্র দেখা গেছে। বেশিরভাগ দোকানেই কোনো সিলিন্ডার নেই। তবে কয়েকটি দোকানে গিয়ে কথা বললে তারা জানায়, সিলিন্ডার ব্যবস্থা করে দেওয়া যাবে। সেক্ষেত্রে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা অতিরিক্ত দাবি করেন তারা।
দেশব্যাপী ভোক্তা অধিকারের অভিযান:
সরকার নির্ধারিত দামে গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি নিশ্চিতে রাজধানীসহ দেশজুড়ে বিশেষ তদারকি কার্যক্রম পরিচালনা করেছে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। গত শনিবার ঢাকাসহ দেশের ১৬ জেলায় ডিলার, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ের গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানগুলোয় এই অভিযান পরিচালিত হয়।
ওই অভিযানে নানা অনিয়মের দায়ে ৩৯টি প্রতিষ্ঠানকে মোট ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
এতে বলা হয়, বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য স্থিতিশীল রাখা, গ্যাস সিলিন্ডারের স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত দাম আদায় ঠেকাতে এ তদারকি চালানো হয়।
একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, অযৌক্তিক মজুত ও সরবরাহে প্রতিবন্ধকতা তৈরি থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দৃশ্যমান স্থানে হালনাগাদ মূল্যতালিকা প্রদর্শন এবং সরকার নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার বিক্রির বিষয়েও সতর্ক করা হয়েছে।
এর আগে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার পর বিশ্ববাজারে এলপিজির দাম বেড়ে যায়। গত এপ্রিলে দেশের ইতিহাসেও সর্বোচ্চ দাম বৃদ্ধি হয় এলপিজির। এপ্রিলের শুরুতে ১২ কেজি এলপিজির দাম বাড়ানো হয় ৩৮৭ টাকা। এরপর একই মাসের ১৯ এপ্রিল আবার বাড়ানো হয় ২১২ টাকা। তবে জুন ও জুলাইয়ে টানা দুই মাস দাম কমানো হয় দেশে।
বিইআরসি বলছে, বাজারে বিভিন্ন আকারের এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়া যায়। এখন থেকে প্রতি কেজি এলপিজির দাম ১৫৩ টাকা ৬ পয়সা। এই হিসেবে বিভিন্ন আকারের এলপিজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারিত হবে। যা আগে ছিল ১৩২ টাকা ১২ পয়সা।
বেড়েছে অটোগ্যাসের দাম :
এলপিজির পাশাপাশি যানবাহনে ব্যবহৃত অটোগ্যাসের দামও বাড়িয়েছে বিইআরসি। অক্টোবর মাসের জন্য অটোগ্যাসের দাম লিটারপ্রতি ১০ টাকা ৯১ পয়সা বাড়িয়ে ৮৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এত দিন এর দাম ছিল ৭৩ টাকা ৯ পয়সা। গতকাল সন্ধ্যা ৬টা থেকে নতুন দাম কার্যকর হবে। পরবর্তী আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত এ দাম বহাল থাকবে বলে জানিয়েছে বিইআরসি।
কেকে/ এমএস