দীর্ঘকাল পর রাজধানীর বেশ কিছু জনবহুল এলাকার ফুটপাত হকারমুক্ত হয়েছে। মিরপুর-১০ থেকে হোপ মার্কেট কিংবা পল্টন থেকে গুলিস্তান হয়ে বংশাল—ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উচ্ছেদ অভিযানের পর অনেক এলাকায় পথচারীরা স্বস্তিতে হাঁটতে পারছেন। এক যুগেরও বেশি সময় পর সন্তানের হাত ধরে নির্বিঘ্নে ফুটপাত ব্যবহারের অভিজ্ঞতা অনেক নগরবাসীর কাছে নতুন। এ উদ্যোগ প্রশংসার দাবি রাখে। তবে এই স্বস্তি কতদিন টিকবে, সে প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বড়। অতীতের অভিজ্ঞতা আশাব্যঞ্জক নয়।
ঢাকায় উচ্ছেদ অভিযান নতুন কিছু নয়। বহুবার ফুটপাত খালি করা হয়েছে, আবার কয়েক দিনের মধ্যেই সেখানে দোকান বসেছে। অভিযান শেষ হলে নজরদারিও শিথিল হয়েছে, আর পুরোনো চিত্র ফিরে এসেছে। এ চক্র যে বারবার ঘুরে আসছে, তার কারণ একটাই—সমস্যার মূলে হাত না দিয়ে শুধু লক্ষণের চিকিৎসা করা হয়েছে।
হকাররা ফুটপাতে বসেন শখে নয়, জীবিকার তাগিদে। রাজধানীতে তাদের সংখ্যা লাখের কোঠায়। বিকল্প কর্মসংস্থান বা নির্ধারিত বিক্রয়স্থান না থাকলে উচ্ছেদ হওয়া মানুষগুলো আবার ফিরে আসবেন, এটিই স্বাভাবিক। পেটের দায়ে মানুষ এমনকি সংঘাতেও জড়িয়ে পড়ে। মিরপুর-১০-এর সাম্প্রতিক সংঘর্ষ, সিটি করপোরেশনের গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর এবং গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর হামলা—এসব ঘটনা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু এগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে পুনর্বাসনের পরিকল্পনা ছাড়া শুধু বলপ্রয়োগে সমাধান আসে না; বরং অসন্তোষ ও অস্থিরতা বাড়ে।
সমস্যার আরেকটি দিক আরও অস্বস্তিকর। স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই অভিযোগ করেছেন, প্রশাসনের কিছু সদস্য ও স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশ ছাড়া বছরের পর বছর একই জায়গায় হকার বসে থাকা সম্ভব নয়। দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক হারে চাঁদা আদায়ের যে অভিযোগ উঠেছে, তার বোঝা শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে সাধারণ ক্রেতার ওপর। এসব অভিযোগ প্রমাণিত হলে বোঝা যাবে, ফুটপাত দখল শুধু হকারদের অপরাধ নয়; এটি একটি সংগঠিত অর্থনীতি। দরিদ্র হকারকে সরিয়ে দিয়ে এ চাঁদাবাজির কাঠামোকে অক্ষত রাখলে সমস্যা থেকেই যাবে। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি এবং দোষী প্রমাণিত হলে তারা যে পরিচয়েরই হোন, আইনের আওতায় আসা উচিত।
ডিএসসিসি প্রশাসক নির্ধারিত স্থানে নিবন্ধিত ও সীমিতসংখ্যক হকারের বসার সুযোগের কথা বলেছেন। ডিএনসিসি প্রশাসক মিরপুর-১০-এ মনিটরিং টিম গঠনের কথা জানিয়েছেন। এগুলো ভালো পদক্ষেপ, কিন্তু যথেষ্ট নয়। এসব উদ্যোগ যেন ঘোষণা আর বিচ্ছিন্ন কিছু এলাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
আমরা মনে করি, ফুটপাতকে স্থায়ীভাবে পথচারীবান্ধব রাখতে হলে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো নেওয়া জরুরি। হকারদের জন্য বিকল্প স্থান নির্ধারণ করতে হবে। ফুটপাত ও প্রধান সড়কের বাইরে নির্দিষ্ট হকার্স মার্কেট বা নির্ধারিত এলাকা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে ক্রেতাদের যাতায়াত সহজ হয়। স্থান নির্বাচনে হকার সংগঠনগুলোর মতামত নেওয়া প্রয়োজন। হকারদের তালিকা তৈরি করে পরিচয়পত্র দিতে হবে এবং নির্ধারিত ফি সরাসরি সিটি করপোরেশনের নির্দিষ্ট হিসাবে জমা নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এতে চাঁদাবাজির সুযোগ কমবে।
যারা নির্ধারিত স্থানে স্থান পাবেন না, তাদের জন্য প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্রঋণ ও বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরি করতে হবে। মনিটরিং টিম যেন শুধু অভিযানের সময় নয়, নিয়মিতভাবে কাজ করে। পুনর্দখল হলে দ্রুত ব্যবস্থা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
ফুটপাত পথচারীর, এটি যেমন সত্য, তেমনি হকারও এই শহরের অর্থনীতির অংশ; কম দামে পণ্য পেতে যাদের ওপর অনেক নগরবাসী নির্ভর করেন। এ দুই বাস্তবতাকে মুখোমুখি দাঁড় করালে সমাধান মিলবে না; দরকার ভারসাম্য। উচ্ছেদের পাশাপাশি পুনর্বাসন, দখলের পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং টেকসই নজরদারি—এই তিনটি একসঙ্গে এগোলেই শুধু নগরবাসীর এ স্বস্তি স্থায়ী হতে পারে।
কেকে/এমএস