সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬,
২০ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম: ● সবার জন্য নিরাপদ বাসস্থান নিশ্চিত করতে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ: প্রধানমন্ত্রী      ● সুবিধাভোগীদের আধিপত্যে ভাবমূর্তি সংকটে বিএনপি      ● এবার বাড়ল অটোগ্যাসের দাম      ● প্রতিটি সিটি করপোরেশন ও জেলায় হবে মাস্টারপ্ল্যান : প্রধানমন্ত্রী      ● হাম উপসর্গে আরও তিন মৃত্যু, মোট প্রাণহানি ১১২৫      ● ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় ছয় মৃত্যু, মোট প্রাণহানি ২৬২      ● এক লাফে ২৫২ টাকা বাড়ল এলপিজির দাম      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
জাতি গঠনে শিক্ষকের বহুমাত্রিক ভূমিকা
সুলতান মাহমুদ সরকার
প্রকাশ: সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:৫১ এএম

একটি প্রচলিত কথা আছে, মোমবাতি নিজে পুড়ে অন্যকে আলো দেয়। কথাটা পুরোনো, কিন্তু শিক্ষকের জীবনের সঙ্গে এতটাই মিলে যায় যে, বারবার বলেও পুরোনো হয় না। ক্লাসরুমের সামনে যিনি দাঁড়ান, তিনি প্রতিদিন একটু একটু করে নিজেকে খরচ করেন। কারও চোখের সামনে অক্ষর স্পষ্ট করে দেন, কারও মনে প্রশ্ন জাগিয়ে দেন, কারও ভেতরে এমন এক আত্মবিশ্বাস ঢেলে দেন, যা সে নিজেও আগে চিনত না। সেই আলোয় হেঁটে একদিন কেউ ডাক্তার হয়, কেউ প্রকৌশলী, কেউ কৃষক, কেউ বিচারক। আলোটা যে কোথা থেকে এসেছিল, অনেকেই সে কথা মনে রাখে না। শিক্ষক তাতে অভিযোগও করেন না। তাঁর পাওনা বুঝি এটুকুই—ছাত্রটি যেন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে।

তাহলে শিক্ষক কে? সরকারি খাতায় তিনি একজন কর্মচারী। বেতন স্কেল আছে, পদবি আছে, বদলির সুযোগও আছে। কিন্তু একজন মানুষকে সত্যিকারের শিক্ষক বানায় এসব কাগজ নয়। শিক্ষক হলেন সেই মানুষ, যিনি একটি শিশুর ভেতরের সম্ভাবনাটাকে আগে দেখতে পান, যখন সে নিজে বা তার পরিবারও সেটা দেখে না। পাঠ্যবইয়ের কথা মুখস্থ করানো পুরো কাজের একটা অংশ মাত্র। আসল কাজ হলো শেখার আগ্রহটা জাগিয়ে দেওয়া। যে ছেলেটি সব বিষয়ে পিছিয়ে, শিক্ষক তার মধ্যে হয়তো একটা ভালো গল্প বলার ক্ষমতা খুঁজে পান। যে মেয়েটি ভয়ে মুখ খোলে না, তাকে দিয়ে একদিন বলান নিজের নামটা জোরে বলতে। এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই একটা মানুষের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

আমরা প্রায়ই ভাবি, শিক্ষকের কাজ পড়ানো, পরীক্ষা নেওয়া আর ফল ঘোষণা করা। কিন্তু একজন ভালো শিক্ষক এর চেয়ে অনেক বেশি কিছু করেন। তিনি একসঙ্গে পথপ্রদর্শক, উপদেষ্টা, কখনো অভিভাবকের মতো ভরসা, আবার কখনো বন্ধুর মতো শ্রোতা। গ্রামের একটি স্কুলে হয়তো কোনো ছাত্র কয়েক দিন ধরে আসছে না। যে শিক্ষক খোঁজ নিতে তার বাড়ি পর্যন্ত যান, তিনি তখন কেবল পাঠদান করছেন না, একটি শিশুকে ঝরে পড়ার হাত থেকে বাঁচাচ্ছেন। এ কাজের কোনো বিজ্ঞপ্তি হয় না, কোনো পুরস্কারও জোটে না। তবু সমাজের ভিত এভাবেই শক্ত হয়।

ব্যক্তি গড়ে ওঠা দিয়েই সবকিছুর শুরু। একজন মানুষ কেমন হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করে শৈশবে সে কাদের সংস্পর্শে এসেছে, তার ওপর। মা-বাবার পরেই সম্ভবত শিক্ষকের স্থান। শিশু যা শোনে, তার চেয়ে অনেক বেশি শেখে যা দেখে। শিক্ষক যদি সময়মতো আসেন, কথা দিলে কথা রাখেন, ভুল করলে স্বীকার করেন, তাহলে শিশুটি না বলা অবস্থাতেই সময়ানুবর্তিতা, সততা আর বিনয়ের পাঠ নিয়ে ফেলে। উল্টোটাও সত্য। শিক্ষক যদি নিজেই ফাঁকি দেন, পক্ষপাত করেন বা অকারণে ধমকান, তাহলে শিশুটি সেই আচরণটাকেই স্বাভাবিক বলে ধরে নেয়। সে জন্যই শিক্ষকের দায়িত্ব এত ভারী। তাঁর প্রতিটি আচরণ আসলে একটি নীরব পাঠ।

এখানেই রাষ্ট্রের দায়িত্বের প্রশ্নটা আসে। আমরা শিক্ষার আধুনিকায়নের কথা বলি, ডিজিটাল ক্লাসরুমের কথা বলি, কারিকুলাম বদলানোর কথা বলি। কিন্তু প্রতিবার নতুন কারিকুলাম এলে সবচেয়ে বিপাকে পড়েন শিক্ষকেরাই। যাকে নতুন পদ্ধতিতে পড়াতে হবে, তাকে যদি যথেষ্ট প্রশিক্ষণ, উপকরণ আর সময় না দেওয়া হয়, তাহলে সেই পরিবর্তন শেষ পর্যন্ত কাগজেই থেকে যায়। শিক্ষা আধুনিক হবে, অথচ শিক্ষক পড়ে থাকবেন পুরোনো অবস্থায়—এ হতে পারে না। বই বদলানোর চেয়ে শিক্ষক তৈরির কাজ অনেক কঠিন এবং অনেক বেশি জরুরি। তাই শিক্ষার আধুনিকায়নের পাশাপাশি শিক্ষককেও সেভাবে গড়ে তোলা রাষ্ট্রের অবশ্য কর্তব্য, কোনো করুণা বা অনুগ্রহ নয়।

এই গড়ে তোলার মানে কী? প্রথমত, শিক্ষক হওয়ার পথটাকে মেধাবীদের কাছে আকর্ষণীয় করা। এখন অনেক মেধাবী তরুণ শিক্ষকতাকে শেষ বিকল্প হিসেবে দেখে, কারণ এ পেশায় মর্যাদা আর আয় দুটোই অনিশ্চিত। যেদিন সেরা শিক্ষার্থীরা স্বেচ্ছায় শিক্ষক হতে চাইবে, সেদিন বুঝব আমরা ঠিক পথে আছি। দ্বিতীয়ত, চাকরিতে ঢোকার আগে এবং পরে নিয়মিত, বাস্তবসম্মত প্রশিক্ষণ। শিক্ষকও শিক্ষার্থী, তাকেও শিখতে হয়। কারণ যে শিক্ষক নিজে শেখা থামিয়ে দেন, তিনি ধীরে ধীরে শেখানোর ক্ষমতাও হারান। তৃতীয়ত, নিয়োগ, পদোন্নতি আর বদলিতে মেধা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, যাতে শিক্ষক তদবিরের ওপর নয়, যোগ্যতার ওপর ভরসা করতে পারেন। আর সবশেষে, তাঁকে এমন একটা জীবনমান দেওয়া, যেন তিনি পুরো মনোযোগ ক্লাসঘরে দিতে পারেন।

সমাজেরও একটা দায় আছে। অভিভাবক হিসেবে অনেক সময় শিক্ষকের কাছে কেবল ফল চাই, অথচ তাঁর পাশে দাঁড়াই না। সন্তানের একটু কম নম্বর এলেই শিক্ষককে দোষ দিই, কিন্তু সন্তানকে শৃঙ্খলা শেখাতে গেলে সেটা মেনে নিই না। শিক্ষক আর অভিভাবক যদি পরস্পরের প্রতিপক্ষ না হয়ে সহযোগী হন, তাহলে শিশুটিই সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয়। সম্মান দেওয়া মানে শুধু দিবসে ফুল দেওয়া নয়, বছরজুড়ে শিক্ষকের কথা শোনা, তাঁর পরিশ্রমকে স্বীকৃতি দেওয়া আর তাঁর মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন না করা।

একটা ছোট কথা বলি। আমরা অনেকেই জীবনে বড় কিছু হয়ে যাওয়ার পর আর সেই প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষকের খোঁজ রাখি না, যিনি আমাদের হাতে প্রথম কলম ধরিয়েছিলেন। হয়তো তিনি এখন বৃদ্ধ, হয়তো অসুস্থ, হয়তো কেউ তাঁর খবরও নেয় না। অথচ আজ আমরা যেখানেই থাকি, তাঁর সেই প্রথম হাতেখড়ির ওপরই দাঁড়িয়ে আছি। কৃতজ্ঞতা জানানোর জন্য বড় আয়োজন লাগে না, একটা ফোন, একটা চিঠি বা একটা দেখা করতে যাওয়াই যথেষ্ট। এই ছোট কাজটা একজন শিক্ষকের কাছে যে কতটা অর্থবহ, তা যিনি একবার পেয়েছেন, তিনিই জানেন।

শিক্ষকের প্রতি সম্মান আসলে নিজের প্রতি সম্মান। যে জাতি তার শিক্ষককে অবহেলা করে, সে জাতি নিজের ভবিষ্যৎকেই অবহেলা করে। আর যে জাতি শিক্ষককে মাথার ওপর তুলে রাখে, সে জাতি ইতিহাসে নিজের জায়গা নিজেই তৈরি করে নেয়। উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে এই সত্যটা আরও পরিষ্কার হয়। সেখানে শিক্ষক হওয়া মানে সম্মান, নিরাপত্তা আর সামাজিক মর্যাদার পথে হাঁটা। আমরা সেই পথে এখনো পুরোপুরি পৌঁছাইনি, কিন্তু রওনা দিতে তো কোনো বাধা নেই।

৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস। সারা পৃথিবীর শিক্ষকদের প্রতি সম্মান জানানোর এই দিনে আমরাও আমাদের শিক্ষকদের কাছে ঋণ স্বীকার করি। শহরের নামি স্কুলের শিক্ষক থেকে প্রত্যন্ত চরের একচালা ঘরের শিক্ষক, মাদ্রাসার উস্তাদ থেকে কারিগরি প্রতিষ্ঠানের প্রশিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক থেকে পাড়ার সেই স্যার, যিনি বিনা পয়সায় গরিব ছাত্রদের পড়ান—সবাইকে আন্তরিক শুভেচ্ছা।

শিক্ষকরা আছেন বলেই অন্ধকারে প্রদীপ জ্বলে, আমরা পথ চিনি, আমরা স্বপ্ন দেখি। শিক্ষকদের পরিশ্রম, ধৈর্য আর ভালোবাসার ঋণ কোনোদিন শোধ হওয়ার নয়। শুধু এটুকু বলি, মোমবাতি যেন শিক্ষকদের জন্যই কেবল পুড়ে না যায়। রাষ্ট্র, সমাজ আর আমরা সবাই যেন সেই আলোর পাশে দাঁড়াতে পারি। সবাইকে বিশ্ব শিক্ষক দিবসের শুভেচ্ছা।

লেখক : শিক্ষক, গাজীপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ

কেকে/এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close