মানুষের জীবনে কিছু মানুষ থাকেন, যাদের অবদান কোনো হিসাবের খাতায় লেখা যায় না। তারা নীরবে আমাদের জীবনের ভিত গড়ে দেন। শিক্ষক তেমনই একজন মানুষ। তিনি শুধু বইয়ের অক্ষর পড়ান না, জীবনের অর্থও বুঝতে শেখান। আমাদের স্বপ্ন দেখতে শেখান, ভুল করলে শুধরে দেন, আর অন্ধকারে পথ দেখান।
আমার হাতে প্রথম যে কলম উঠেছিল, সেটি শুধু অক্ষর লেখার জন্য ছিল না; সেটি ছিল আমার ভবিষ্যতের প্রথম দরজা। আর সেই দরজাটি খুলে দিয়েছিলেন আমার শিক্ষকরা।
আমার শিক্ষার হাতেখড়ি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার মারবদী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। আমার প্রাথমিক শিক্ষাজীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন চারজন শিক্ষক প্রধান শিক্ষক মোসলেম স্যার এবং সহকারী শিক্ষক ফজলুল হক স্যার, এবিএম আমিনুল স্যার ও খালেকুজ্জামান জীবন স্যার। তাঁদের হাত ধরেই আমার শিক্ষাজীবনের প্রথম ভিত্তি তৈরি হয়েছিল।
শৈশবের সেই দিনগুলো এখন অনেক দূরের। সময়ের সঙ্গে বিদ্যালয়ের চেহারা বদলেছে, বদলেছে জীবনের পথ। কিন্তু শিক্ষকদের দেওয়া শিক্ষা ও তাদের স্মৃতি আজও মনের ভেতর আগের মতোই আছে।
এর মধ্যে মোসলেম স্যার, আমিনুল স্যার ও ফজলুল হক স্যার আজ পৃথিবীতে নেই। তাদের কথা মনে হলে বুকের ভেতর এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়। মানুষ চলে যায়, কিন্তু তার দেওয়া শিক্ষা থেকে যায়। তাদের প্রতি আমার বিনম্র শ্রদ্ধা। মহান আল্লাহ তাদের জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন।
প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়ে আমার মাধ্যমিক শিক্ষাজীবন শুরু হয় পঞ্চমীঘাট উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেখানে আরও অনেক শ্রদ্ধেয় শিক্ষকের সান্নিধ্য পেয়েছি। তারা শুধু পাঠ্যবইয়ের শিক্ষা দেননি, ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে শিখিয়েছেন। কোন পথে এগোব, কীভাবে নিজের পছন্দ ও যোগ্যতার জায়গাটি খুঁজে নেব এসব নিয়েও তাঁরা কথা বলেছেন।
এরপর সরকারি তোলারাম কলেজে উচ্চমাধ্যমিকের পাঠ শেষ করি। পরে নাজিমউদ্দীন ভূঁইয়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে হিসাববিজ্ঞান বিষয়ে অনার্স এবং সরকারি তোলারাম কলেজ থেকে এমবিএ সম্পন্ন করি।
শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপেই কোনো না কোনো শিক্ষক আমার সামনে আলোর মতো ছিলেন। তাদের কেউ হয়তো আজ আমাকে মনে রাখেন, কেউ হয়তো রাখেন না। কিন্তু আমি তাদের ভুলিনি। কারণ একজন শিক্ষক হয়তো একটি ক্লাস নেন এক ঘণ্টার জন্য, কিন্তু তার একটি কথা একজন শিক্ষার্থীর জীবনে থেকে যেতে পারে সারাজীবন।
আজ আমি সাংবাদিকতা পেশায় আছি। দেশের সুনামধন্য দৈনিক খোলা কাগজ ও অনলাইন নিউজ পোর্টাল ঢাকা পোস্টে কাজ করছি। প্রতিদিন হাতে কলম নিয়ে মানুষের কথা লিখি। সমাজের নানা সমস্যা, মানুষের আনন্দ-বেদনা, স্বপ্ন ও প্রত্যাশা তুলে ধরার চেষ্টা করি।
কখনো কখনো সংবাদ লিখতে বসে মনে হয়, এই যে আমি আজ কলম দিয়ে মানুষের কথা লিখছি, সেই কলমের শুরু তো অনেক আগে। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে। কোনো এক শিক্ষক হয়তো পাশে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন ‘লেখো।’সেই ‘লেখো’ শব্দটির পথ ধরেই হয়তো আজও লিখে চলেছি।
তাই শিক্ষক দিবসে প্রিয় শিক্ষকের হাতে একটি কলম তুলে দেওয়া আমার কাছে আনুষ্ঠানিকতা নয়। এটি আমার শৈশবের কাছে ফিরে যাওয়া, আমার শিক্ষকদের স্মরণ করা এবং তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর একটি ছোট্ট প্রয়াস।
কলমটি হয়তো খুব সাধারণ। কিন্তু এর ভেতরে আমার কাছে অনেক গল্প। আছে প্রথম অক্ষর লেখার স্মৃতি, আছে শিক্ষকের শাসন, আছে ভুল শুধরে দেওয়ার মুহূর্ত, আছে ভালো করার জন্য উৎসাহ। আছে এমন কিছু মানুষের প্রতি ভালোবাসা, যাঁদের ঋণ কোনোদিন শোধ করা সম্ভব নয়।
প্রিয় শিক্ষক, আপনার হাতে তুলে দেওয়া এই কলমটি আমার পক্ষ থেকে সামান্য উপহার। কিন্তু এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় কৃতজ্ঞতাগুলোর একটি।
আপনি আমাকে শুধু লিখতে শেখাননি আপনি আমাকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন। আর সেই স্বপ্নের পথেই আজও আমি হাঁটছি।
কেকে/ এমএস