কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে চাষাবাদের মৌসুমে প্রয়োজন অনুযায়ী সার না পাওয়ায় দুর্ভোগে পড়েছেন অনেক কৃষক। জমিতে সময়মতো সার প্রয়োগ করতে না পারায় ফসলের উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন তারা।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, স্থানীয় বাজার ও সার বিতরণকেন্দ্রে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় প্রয়োজনীয় পরিমাণ সার পাওয়া যাচ্ছে না। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও অনেকে খালি হাতে ফিরে যাচ্ছেন। আবার কেউ কেউ প্রয়োজনের তুলনায় কম সার পাওয়ায় জমির পুরো চাহিদা মেটাতে পারছেন না।
এ দিকে অসাধু সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কৃষকদের জন্য বরাদ্দকৃত সার সীমান্তপথে মিয়ানমারে পাচার করা হচ্ছে, এমন অভিযোগও উঠেছে। কৃষকদের একটি অংশের দাবি, স্থানীয় পর্যায়ে সারের সরবরাহে ঘাটতি এবং সীমান্ত এলাকায় সারের অবৈধ বেচাকেনার বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
কৃষকদের দাবি, জমিতে সার দেওয়ার সময় চলে যাচ্ছে। কিন্তু প্রয়োজন অনুযায়ী সার পাচ্ছি না। সার না পেলে ফসলের ফলন কীভাবে হবে, তা নিয়ে আমরা চিন্তায় আছি। কৃষকের জন্য বরাদ্দ সার যদি বাইরে চলে যায়, তাহলে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হব। বিষয়টি প্রশাসনের তদন্ত করে দেখা দরকার
কৃষক বাবুধন চাকমা বলেন, ‘জমিতে দেওয়ার জন্য যতটুকু সার প্রয়োজন, তার অর্ধেকও পাচ্ছি না। সময়মতো সার দিতে না পারলে ফসলের ক্ষতি হতে পারে। আমরা কৃষক মানুষ, ফসলের ওপরই আমাদের সংসার নির্ভর করে। সার না পেলে আমরা কোথায় যাব। গত বছরের তুলনায় এ বছর কৃষিখাতে ব্যাপক ক্ষতির আশংকা রয়েছে।’
আরেক কৃষকের ভাষ্যমতে, সারের জন্য এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ঘুরতে হচ্ছে। সময় ও টাকা দুটোই খরচ হচ্ছে। চাহিদা অনুযায়ী সার পেলে আমরা ঠিকমতো চাষাবাদ করতে পারতাম।
কৃষকদের মতে, চাষাবাদের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সার সংকট তৈরি হলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বাড়তে পারে কৃষকের উৎপাদন খরচ। এতে শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়তে পারে বাজারদরেও।
কৃষকদের দাবি, স্থানীয় পর্যায়ে সারের সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা হোক। একই সঙ্গে প্রকৃত কৃষকরা যাতে ন্যায্য ও নির্ধারিত মূল্যে প্রয়োজনীয় পরিমাণ সার পান, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
কৃষকদের প্রত্যাশা, চাষাবাদের মৌসুমে দ্রুত সার সরবরাহ স্বাভাবিক করে তাদের দুর্ভোগ কমানো হবে। সময়মতো প্রয়োজনীয় সার নিশ্চিত হলে উৎপাদনও স্বাভাবিক থাকবে, এমনটাই মনে করছেন কৃষকরা।
এ বিষয়ে টেকনাফ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হুমায়ূন কবির জানান, টেকনাফে বর্তমানে সারের কোনো সংকট নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন জায়গায় সারের সংকটের খবর ছড়িয়ে পড়ায় কৃষকদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘টেকনাফ উপজেলার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ সার বরাদ্দ পাওয়া গেছে। বরং আমাদের প্রয়োজনের তুলনায় অধিক বরাদ্দ রয়েছে। তাই কৃষকদের সারের সংকট নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।’
কৃষকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘সার একটি রাসায়নিক পণ্য। তাই প্রয়োজনের অতিরিক্ত সার কেউ যেন বাড়িতে মজুদ করে না রাখেন। জমিতে যখন যতটুকু সার প্রয়োজন হবে, কৃষকরা ততটুকুই নির্ধারিত ডিলার পয়েন্ট থেকে সংগ্রহ করবেন। এতে প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী সবার মধ্যে সার সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।’
সারের অবৈধ পাচারের বিষয়ে কৃষি কর্মকর্তা বলেন, ‘টেকনাফ সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় এখান থেকে সার মিয়ানমারে পাচার হতে পারে, এমন একটি আশঙ্কা মানুষের মধ্যে রয়েছে। সম্প্রতি গত ২৫ তারিখ চট্টগ্রামের আনোয়ারা এলাকা থেকে প্রায় ৯০০ বস্তা সার জব্দ করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এ সব সার সাগরপথে মিয়ানমারে পাচারের উদ্দেশ্যে নেওয়া হচ্ছিল।’
তিনি আরও বলেন, ‘সীমান্ত দিয়ে যাতে কোনোভাবেই সার পাচার হতে না পারে, সে বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে কঠোরভাবে মনিটরিং করা হচ্ছে। বিশেষ করে প্রান্তিক কৃষকরা যাতে সার পেতে কোনো ধরনের সমস্যায় না পড়েন, সেদিকে প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে।’
চাষাবাদের মৌসুমে প্রয়োজনীয় সার না পাওয়ার আক্ষেপ সাধারণ কৃষকের। তাদের দাবি, কৃষির স্বার্থে চাহিদা অনুযায়ী সার সরবরাহ নিশ্চিত করে দ্রুত এ সংকটের সমাধান করা হোক।
কেকে/এআই