কিশোরগঞ্জের তাড়াইলে কবর দেওয়ার প্রায় সাড়ে নয় মাস পর মুদাচ্ছির (৮) নামে এক শিশুর মরদেহ আদালতের নির্দেশে উত্তোলন করা হয়েছে। প্রথম ময়নাতদন্তে তার মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হলেও এতে আপত্তি জানিয়ে আসছিল পরিবার। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে শিশুটির বাবা আদালতের দ্বারস্থ হলে পুনঃময়নাতদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়।
সোমবার (৫ অক্টোবর) দুপুরে উপজেলার দামিহা ইউনিয়নের রাহেলা গ্রামের পারিবারিক কবরস্থান থেকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে শিশুটির মরদেহ উত্তোলন করা হয়।
এ সময় তাড়াইল উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জিসান আলী, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের এসআই নাজিমউদ্দীন ও তাড়াইল থানা পুলিশের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
মুদাচ্ছির রাহেলা গ্রামের জিয়াউর রহমানের ছেলে। সে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালী এলাকার মাদরাসাতুল ইতকান লি উলুমিল কোরআন মাদরাসার আবাসিক শিক্ষার্থী ছিল। প্রায় তিন বছর ধরে ওই মাদরাসার হিফজ বিভাগে পড়াশোনা করছিল সে।
শিশুটির বাবার করা এজাহার ও আদালতের আদেশনামা সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ২০ ডিসেম্বর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে মাদরাসার মুহতামিম মাওলানা ক্বারী আনিছুর রহমান ফোন করে জিয়াউর রহমানকে দ্রুত মাদরাসায় যেতে বলেন। সেখানে গিয়ে তিনি চতুর্থ তলার শিক্ষকদের টয়লেটের ভেন্টিলেটরের গ্রিলের সঙ্গে গামছা পেঁচানো অবস্থায় ছেলেকে ঝুলতে দেখেন বলে এজাহারে উল্লেখ করেন।
এজাহারে জিয়াউর রহমান আরও দাবি করেন, শিশুটির দুই পা মেঝের সঙ্গে বাঁকা অবস্থায় লাগানো ছিল। পরে পুলিশ মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়। ঘটনার পরদিন যাত্রাবাড়ী থানায় মামলা করেন তিনি। মামলায় মাদরাসার মুহতামিম মাওলানা ক্বারী আনিছুর রহমান, শিক্ষক হাফেজ মাওলানা জহিরুল ইসলাম ও হাফেজ মোহাম্মদ উল্লাহসহ অজ্ঞাতনামা আরও ৪-৫ জনকে আসামি করা হয়।
জিয়াউর রহমানের অভিযোগ, তার ছেলের সঙ্গে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছিল অথবা সে কোনো ঘটনা দেখে ফেলেছিল এ কারণে তাকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। পরে ঘটনাটি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে মরদেহ টয়লেটের ভেন্টিলেটরের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয় বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
তবে প্রথম ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে শিশুটির মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এতে আপত্তি জানিয়ে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে মেডিকেল বোর্ড গঠন করে পুনঃময়নাতদন্তের আবেদন করেন শিশুটির বাবা।
আদালতের আদেশে বলা হয়েছে, ন্যায়বিচারের স্বার্থে শিশুটির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটন প্রয়োজন। ‘দ্য কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর, ১৮৯৮-’এর ১৭৬ (২) ধারার বিধান অনুযায়ী জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, সিভিল সার্জন ও পুলিশ সুপারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে মেডিকেল বোর্ড গঠন করে পুনঃময়নাতদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণের জন্য তদন্ত কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
শিশুটির বাবা জিয়াউর রহমান বলেন, ‘আমার ছেলে কীভাবে মারা গেল, সেটি আমরা এখনো নিশ্চিতভাবে জানতে পারিনি। প্রথম ময়নাতদন্তে আত্মহত্যার কথা বলা হলেও ঘটনাটি নিয়ে শুরু থেকেই আমাদের সন্দেহ রয়েছে। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ বেরিয়ে আসুক এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।’
পরিবারের স্বজন আরমান হোসেন বলেন, ‘মুদাচ্ছিরের মৃত্যুর বিষয়টি নিয়ে শুরু থেকেই নানা প্রশ্ন রয়েছে। আমরা কারও বিরুদ্ধে নিজেরা কোনো সিদ্ধান্ত দিতে চাই না। সুষ্ঠু তদন্ত ও পুনঃময়নাতদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসুক—এটাই আমাদের দাবি।’
তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের এসআই নাজিমউদ্দীন বলেন, ‘আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে মরদেহ উত্তোলন করা হয়েছে। পরবর্তী কার্যক্রম আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী সম্পন্ন করা হবে।’
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জিসান আলী বলেন, ‘আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী মরদেহ উত্তোলন করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে মেডিকেল বোর্ডের মাধ্যমে পুনঃময়নাতদন্ত করা হবে। তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য ও আলামতের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
কেকে/এআই