নতুন কমিটি গঠনে দীর্ঘসূত্রতা নেতৃত্বের অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও সাংগঠনিক দুর্বলতায় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ক্রমেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় সাত মাস পরও নতুন নেতৃত্ব না আসায় বিভিন্ন ইউনিটে শৃঙ্খলা ও সমন্বয়হীনতার অভিযোগ উঠছে। এর সঙ্গে পদ-পদবি নিয়ে গ্রুপিং, বলয়ভিত্তিক তৎপরতা এবং ত্যাগী ও মেধাবী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন নিয়ে অসন্তোষও বাড়ছে।
এমন পরিস্থিতিতে ক্যাম্পাসে ছাত্রশিবিরের দৃশ্যমান সাংগঠনিক তৎপরতার বিপরীতে ছাত্রদলের অবস্থান দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলার অভিযোগে ছাত্রদল নেতাকর্মীদের নাম আসায় সংগঠনটির নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক জবাবদিহি নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
সাবেক ছাত্রনেতারা বলছেন, ক্যাম্পাসে কোনো সংগঠনের প্রভাব শুধু মিছিল-মিটিং বা সাংগঠনিক শক্তির ওপর নির্ভর করে না। সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, তাদের সমস্যা নিয়ে কাজ করা এবং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কার্যক্রমের মাধ্যমেই দীর্ঘমেয়াদি গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়। তাই দ্রুত কমিটি গঠন করে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাড়াতে না পারলে প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠনের তৎপরতার বিপরীতে ছাত্রদলের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন নিয়ে আলোচনা ও প্রস্তুতি চললেও কমিটি ঘোষণা হয়নি। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, সাংগঠনিক কাঠামো দ্রুত কার্যকর করা না গেলে ক্যাম্পাসে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখা কঠিন হবে। বিশেষ করে ছাত্রশিবিরের সাংগঠনিক তৎপরতা ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের প্রভাবের বিপরীতে ছাত্রদলকে শক্ত অবস্থানে রাখতে হলে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততা, যোগ্য নেতৃত্ব নির্বাচন এবং শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা জরুরি বলে মনে করছেন ছাত্রদলের কর্মীরা।
গত ৪ অক্টোবর রাতে রাবিতে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ ওঠে, এতে চার সাংবাদিকসহ অন্তত দশজন আহত হন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন মামলা করার ঘোষণা দিয়েছে; ছাত্রদলও দলীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে। সাংবাদিকরা অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের পদত্যাগের দাবিতে অনড় রয়েছেন।
গতকাল সোমবার রাবি শাখা ছাত্রদলের তিন নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এছাড়া আরও ৬ ছাত্রদল নেতাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির এই সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেন। বহিষ্কৃতরা হলেন- ছাত্রদলের সহ-সভাপতি আহসান হাবিব, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাসিব হাসান এবং বিশাল চক্রবর্তী। শোকজকৃত নেতারা হলেন- সহ-সভাপতি তাকবীর আহমেদ ইমন, শরিফুল ইসলাম, বুলবুল রহমান, ফারুক হোসেন, সহদপ্তর সম্পাদক শাহারিয়ার আলম ও ছাত্রদল কর্মী সাজু।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর সশস্ত্র হামলা ও হত্যার হুমকির ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। হামলায় জড়িতদের রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি। একইসঙ্গে, কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সহিংস লড়াই বন্ধে নিজ নিজ দল ও অঙ্গসংগঠনকে নিয়ন্ত্রণে আমূল সংস্কার ও আত্মশুদ্ধির কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের জন্য ক্ষমতাসীন বিএনপি ও বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘হামলার শিকার গণমাধ্যমকর্মী ও শিক্ষার্থীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে হামলাকারীদের এবং তাদের সহযোগী ও পৃষ্ঠপোষকদের আইনি প্রক্রিয়ায় দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।’
রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘তদন্ত কমিটি গঠন বা সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে লোকদেখানো দায়িত্ব শেষ না করে সহিংসতার প্রশ্রয় ও পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ করতে হবে। অপরাধে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। দলীয় সিদ্ধান্ত ও আচরণে গণতান্ত্রিক চর্চা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নিজেদের সংগঠনে এসব পরিবর্তন নিশ্চিত না করে রাজনৈতিক দলের প্রতি জনগণের আস্থা অর্জন করা সম্ভব নয়। রাজনৈতিক নেতৃত্বকে উপলব্ধি করতে হবে, তারা তাদের নিজেদের দলের নেতাকর্মীদের আচরণের কারণে ক্রমাগত অধিকতর জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন।’
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতা আহসান হাবিব বলেছেন, পোস্টে আহসান হাবিব দাবি করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ জিয়াউর রহমান হলের ‘কারচুপির’ রাকসু নির্বাচনে নির্বাচিত জিএস আরিফুল ইসলামকে ধরতে গেলে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ওপর সাংবাদিক পরিচয়ধারী একটি পক্ষ চড়াও হয়। ওই ঘটনায় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা তাদের ‘প্রতিহত’ করেছে। আমার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হলে ধরে নেব, ছাত্রদল-বিএনপিতে বটদের প্রভাবই সবচেয়ে বেশি।
নেতৃত্বের সংকট, বাড়ছে অনিয়মের ঝুঁকি
ছাত্রদলের কমিটি গঠনে বিলম্বের কারণ হিসেবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ছাত্রনেতা বলেন, নেতৃত্ব নির্বাচন নিয়ে অভ্যন্তরীণ টানাপড়েন, পদ-পদবি নিয়ে গ্রুপিং এবং প্রভাবশালী একটি মহলের হস্তক্ষেপের কারণে নতুন কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হচ্ছে। যোগ্যতা, ত্যাগ ও সাংগঠনিক ভূমিকার ভিত্তিতে নেতৃত্ব নির্ধারণের পরিবর্তে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ ও বলয়ভিত্তিক সমীকরণকে গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।
তাদের দাবি, কমিটি গঠনের বিষয়ে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে একাধিকবার আলোচনা হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না। এতে দীর্ঘদিন ধরে সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ত্যাগী ও মেধাবী নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হচ্ছে। একইসঙ্গে কমিটিহীন অবস্থায় বিভিন্ন ইউনিটে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা দুর্বল হয়ে পড়ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নেতা বলেন, ‘যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্বের পরিবর্তে যদি কারও ব্যক্তিগত বলয় বা সুপারিশকে প্রাধান্য দেওয়া হয়, তাহলে নতুন কমিটি নিয়েও বিতর্ক তৈরি হবে। দ্রুত স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় কমিটি গঠন করা না গেলে সংকট আরও বাড়তে পারে।’
অন্য এক নেতা বলেন, কমিটি গঠনে বিলম্বের কারণে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের সাংগঠনিক কার্যক্রম ও রাজনৈতিক অবস্থানের ওপরও পড়তে পারে।
শিবিরের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার শঙ্কা
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে ছাত্রদলের সাংগঠনিক দুর্বলতা ও নেতৃত্বের সংকট দীর্ঘায়িত হলে ক্যাম্পাসে তাদের কার্যক্রম ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা কমে যাবে।
২০২৫ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে ছাত্রদলসমর্থিত ভিপি প্রার্থী আবিদুল ইসলাম খানের বিপরীতে ছাত্রশিবিরসমর্থিত সাদিক কায়েম পান জয়ী হন। ওই নির্বাচনে জিএস ও এজিএসসহ অধিকাংশ পদে শিবিরসমর্থিত প্রার্থীরা জয় পান। তবে একটি নির্বাচনের ফল দিয়ে সার্বিক সাংগঠনিক শক্তি নির্ধারণ করা যায় না বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
তাদের মতে, ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রাখতে হলে নিয়মিত সাংগঠনিক কার্যক্রমের পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষার্থীদের সমস্যা নিয়ে কাজ করা, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো এবং শিক্ষার্থীবান্ধব কর্মসূচিতে সক্রিয় থাকা গুরুত্বপূর্ণ।
গত আগস্টে দেশের কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। এসব ঘটনায় দুই সংগঠনই পরস্পরের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ তোলে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্টদের অনেকে ক্যাম্পাসে সহাবস্থান, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন।
সাবেক ছাত্রনেতাদের মতে, কমিটিহীনতা ও অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের সংকট দীর্ঘায়িত হলে ক্যাম্পাসে নিয়মিত সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা ব্যাহত হতে পারে। এতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে শূন্যতা তৈরি হওয়ার পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠনগুলোর সাংগঠনিক তৎপরতা দৃশ্যমান হওয়ার সুযোগ বাড়তে পারে।
তাদের মতে, এ অবস্থায় ছাত্রদলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে দ্রুত সাংগঠনিক কাঠামো কার্যকর করা, যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব নির্বাচন এবং ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বাড়ানো। একইসঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা যেন সংঘাত বা দখলদারত্বে রূপ না নেয়, সেদিকেও নজর দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
কেকে/ এমএস