চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ বছরের নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের কার্ল ডেইসেরথ, জার্মানির পিটার হেগম্যান ও জর্জ নাগেল। আলো ব্যবহার করে মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি এবং আলো-নিয়ন্ত্রিত আয়ন চ্যানেল আবিষ্কারের স্বীকৃতি হিসেবে তাদের এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (৫ অক্টোবর) বাংলাদেশ সময় বিকেলে সুইডেনের স্টকহোমে এ বছরের চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়। নোবেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মানুষের অনুভূতি, আচরণ ও শারীরিক বিভিন্ন কার্যক্রম কীভাবে মস্তিষ্ক নিয়ন্ত্রণ করে—দীর্ঘদিনের সেই জটিল প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তিন বিজ্ঞানীর গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
মস্তিষ্কের কোন অংশ শরীরের কোন কাজ নিয়ন্ত্রণ করে, তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরে গবেষণা করলেও নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষ সক্রিয় হলে ঠিক কী ঘটে, তা পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের কার্যকর পদ্ধতির ঘাটতি ছিল। সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে বড় ভূমিকা রাখে অপটোজেনেটিকস প্রযুক্তি।
অপটোজেনেটিকস এমন একটি গবেষণাপদ্ধতি, যার মাধ্যমে আলো ব্যবহার করে নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা যায়। নোবেল কমিটির মতে, এ প্রযুক্তি জীবিত মস্তিষ্কে স্নায়ুকোষ কীভাবে স্মৃতি, অনুভূতি ও আচরণ তৈরি করে, তা সরাসরি পর্যবেক্ষণের নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।
এই গবেষণার ভিত্তি গড়ে দেন পিটার হেগম্যান ও জর্জ নাগেল। তারা ‘চ্যানেলরোডপসিন’ নামের একটি আলোকসংবেদনশীল প্রোটিন শনাক্ত করেন। তাঁদের গবেষণায় দেখা যায়, নির্দিষ্ট কোষে এই প্রোটিন যুক্ত করা হলে কোষটি আলোর প্রতি সংবেদনশীল হয়ে ওঠে।
পরবর্তী সময়ে কার্ল ডেইসেরথ এই আবিষ্কারকে স্নায়ুবিজ্ঞানের গবেষণায় ব্যবহার করেন। তিনি পরীক্ষাগারে ইঁদুরের স্নায়ুকোষে চ্যানেলরোডপসিনের জিন প্রবেশ করিয়ে নীল আলো প্রয়োগ করেন। এর মাধ্যমে আলো ব্যবহার করেই স্নায়ুকোষের সংকেত সক্রিয় করা সম্ভব হয়। পরে জীবিত ইঁদুরের মস্তিষ্কেও একই ধরনের আলো-নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করেন তিনি।
নোবেল কমিটির ভাষ্য অনুযায়ী, এই প্রযুক্তির ফলে নির্দিষ্ট স্মৃতি, অনুভূতি ও আচরণের সঙ্গে যুক্ত নিউরাল সার্কিট শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণের পথ খুলে যায়। মস্তিষ্কের এসব স্নায়বিক পথের সঙ্গে বিভিন্ন স্নায়বিক ও মানসিক রোগেরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
চিকিৎসাক্ষেত্রেও এর প্রয়োগ নিয়ে গবেষণা এগিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে দৃষ্টিশক্তি হারানো বা দুর্বল হয়ে যাওয়া মানুষের চোখে আলো সংবেদনশীলতা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে অপটোজেনেটিকস ব্যবহারের চেষ্টা চলছে।
নোবেল কর্তৃপক্ষ বলছে, মস্তিষ্কের কার্যপ্রণালি বোঝার ক্ষেত্রে অপটোজেনেটিকস গবেষণার গতিপথই বদলে দিয়েছে। আলোকে ব্যবহার করে স্নায়ুকোষের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের এই প্রযুক্তি মস্তিষ্কের জটিল রহস্য উন্মোচনে নতুন দ্বার খুলেছে এবং এর ওপর ভিত্তি করে প্রতিনিয়ত নতুন গবেষণা ও আবিষ্কার সামনে আসছে।
কেকে/সাশ