সংকটের মধ্যে ভোক্তার ওপর আরও চাপিয়ে দেওয়ার নজির আবারও দেখা গেল। বাজারে এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার নেই, যেখানে আছে সেখানে নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি দাম দিতে হচ্ছে। এ অবস্থায় গতকাল রোববার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) প্রতি কেজি এলপিজির দাম ২১ টাকা বাড়িয়ে ১৫৩ টাকা ৬ পয়সা নির্ধারণ করেছে। ফলে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বেড়ে ১ হাজার ৫৮৫ থেকে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা হয়েছে। একইসঙ্গে অটোগ্যাসের দাম লিটারে ১০ টাকা ৯১ পয়সা বাড়িয়ে ৮৪ টাকা করা হয়েছে।
নিয়মিত মূল্য সমন্বয়ের যুক্তিতে এ সিদ্ধান্ত হয়তো প্রক্রিয়াগতভাবে সঠিক। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সরকারি দামে সিলিন্ডার কেনার সুযোগ বাজারে প্রায় নেই। নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা থাকার সময়ই ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি হয়েছে ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকায়। কোথাও কোথাও ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা বাড়তি দিয়েও মেলেনি।
বসুন্ধরা, ফ্রেশ ও ওরিয়নের সিলিন্ডার বাজার থেকে প্রায় উধাও। যমুনা ও আই-গ্যাসের সিলিন্ডার যেটুকু পাওয়া যায়, তা-ও নির্ধারিত দামে নয়। যে দাম বাস্তবে কার্যকর হয় না, তার ঘোষণা ভোক্তার কাছে শুধু আরেক দফা বোঝা বাড়ানোর বার্তা হয়ে আসে। এখন আশঙ্কা, নতুন ঘোষণার অজুহাতে খোলাবাজারের দাম আরও চড়বে। আমদানিকারক ও অপারেটররা বলছেন, মজুতে কোনো ঘাটতি নেই। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, সরবরাহই নেই। অর্থাৎ গ্যাস আছে, অথচ সিলিন্ডার নেই; এর মাঝখানে কোথাও কেউ সরবরাহ আটকে রেখে বাড়তি মুনাফা তুলছেন।
জ্বালানিমন্ত্রীর বক্তব্য, এলপিজি সরকার আমদানি করে না, বেসরকারি কোম্পানি আনে এবং কেউ কেউ অতিরিক্ত লাভের জন্য দাম বাড়াতে পারে। বাজারের সব পক্ষ এভাবে দায় এড়িয়ে যাচ্ছে অথচ বেসরকারি খাতের আমদানি হলেও বাজার তদারকির দায়িত্ব সরকারেরই। সরকার সেই দায়িত্ব অবহেলা করতে পারে না।
জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর গত শনিবার ঢাকাসহ ১৬ জেলায় অভিযান চালিয়ে ৩৯টি প্রতিষ্ঠানকে মোট ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা করেছে। উদ্যোগটি প্রশংসনীয়, তবে হিসাব করলে প্রতিষ্ঠানপ্রতি গড় জরিমানা দাঁড়ায় প্রায় ১১ হাজার টাকা। একেকটি সিলিন্ডারে শতশত টাকা বাড়তি আদায়ের যে মুনাফা, তার তুলনায় এ জরিমানা প্রতিরোধক হিসেবে যথেষ্ট নয়। এ ছাড়া কয়েক দিনের অভিযানে সংকটের কাঠামোগত কারণ দূর হয় না।
এ বছর এপ্রিলে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের জেরে বিশ্ববাজারে দাম বাড়ায় দেশেও ইতিহাসের সর্বোচ্চ মূল্যবৃদ্ধি হয়েছিল। পরে জুন-জুলাইয়ে দাম কমেছে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামার প্রভাব সামাল দেওয়ার একটি কাঠামো থাকার কথা। কিন্তু সেই প্রভাবের বাইরে দেশীয় বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে যে সিন্ডিকেট সুবিধা নিচ্ছে, তাকে নিয়ন্ত্রণে আনার সদিচ্ছা ও সক্ষমতা এখনো দৃশ্যমান নয়। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে সরকারের উচিত অবিলম্বে নিম্নলিখিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে আমরা মনে করছি।
প্রতিটি আমদানিকারক কোম্পানির আমদানি, মজুত ও ডিলারভিত্তিক সরবরাহের তথ্য প্রতিদিন অনলাইনে প্রকাশ বাধ্যতামূলক করতে হবে। ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের দোকানে বিইআরসি নির্ধারিত মূল্যতালিকা প্রদর্শন নিশ্চিত করতে হবে এবং জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করতে হবে। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি ও মজুতদারির প্রমাণ মিললে জরিমানার পাশাপাশি লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিলের মতো কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
সংকটের মূল কারণ, অর্থাৎ কোম্পানি নাকি খুচরা পর্যায়ে সরবরাহ আটকে আছে, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে চিহ্নিত করে প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে। মুষ্টিমেয় বড় কোম্পানির ওপর নির্ভরতা কমাতে বাজারে নতুন ও ছোট প্রতিযোগীর অংশগ্রহণ এবং প্রয়োজনে সরকারি উদ্যোগে আমদানির সম্ভাবনা বিবেচনা করতে হবে।
বিইআরসিকে শুধু দাম নির্ধারণে সীমিত না রেখে সেই দামের বাস্তব প্রয়োগ তদারকির দায়িত্ব ও সক্ষমতা দিতে হবে। ব্যবসায়ীদের মুনাফা করার অধিকার আছে, কিন্তু রান্নার মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদাকে পুঁজি করে মানুষকে জিম্মি করার অধিকার কারও নেই। সরকার যদি দাম নির্ধারণ করেই দায়িত্ব শেষ মনে করে, তাহলে সেই দামের কোনো অর্থ থাকে না। ভোক্তার আস্থা ফেরাতে হলে ঘোষিত দামে গ্যাস পাওয়া নিশ্চিত করাই হবে সরকারের প্রধানতম কাজ।
কেকে/ এমএস