অর্থনীতির জাগরণ ঘটাতে প্রয়োজন শিল্প ও কৃষির পাশাপাশি অথবা সম-উন্নয়ন। এর কোনোটাকে অবহেলা করলেই কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব হবে না। বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর বাস্তবতায় ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি অর্জনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রযুক্তির সর্বোচ্চ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
সম্প্রতি জাতীয় উৎপাদনশীলতা দিবস-২০২৬’ উপলক্ষে দেওয়া এক বাণীতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের অর্থনীতিকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য অর্জনে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও দক্ষ মানবসম্পদের সমন্বয়ে একটি আধুনিক ও প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন।
আমরা এই লক্ষ্য অর্জন করতে পারব এই ইচ্ছা এবং মানসিক সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে অগ্রসর হতে হবে। আর এখানেই প্রযুক্তিকে পুরোপুরি কাজে লাগানো প্রশ্ন আসছে। একইসঙ্গে শিল্প এবং কৃষি প্রযুক্তির সাহায্যে এগিয়ে নিতে হবে।
আমরা প্রযুক্তি যে বিপ্লব বলি সেটি আসলে শিল্প বিপ্লব ধারণার সঙ্গে সম্পৃক্ত। আর শিল্প বিপ্লব ধারণাটির সঙ্গে আমরা সবাই আজ কম-বেশি পরিচিত। কারণ আমরা শিল্প বিপ্লবের ধাপ পার করেই আজকের যান্ত্রিক সভ্যতায় উপনীত হতে পেরেছি।
কৃষিভিত্তিকক সমাজ ব্যবস্থাকে পাল্লা দিয়ে আজ শিল্প তার স্থান দখল করে নিচ্ছে। কৃষিতেও যান্ত্রিকরণের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রাক শিল্প বিপ্লবের অর্থনীতি এবং শিল্প বিপ্লবের পরের অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি ভিন্ন। বলা যায়, শিল্প বিপ্লবের ফলে অর্থনীতির গতিতে জাদুকরী পরিবর্তন হয়েছে। পরিবর্তন হয়েছে মানুষের অভ্যাস ও রুচির ক্ষেত্রে।
প্রথম শিল্প বিপ্লবের বহু যুগ পেরিয়ে আজ আমরা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে দাড়িয়ে আছি। অপেক্ষা শুধু সেই পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত করা।
১৭৮৪ সালে বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কারের মাধ্যমে প্রথম শিল্পবিপ্লবের সূচনা হয়। কৃষি ও শিল্পে যান্ত্রিকীকরণের ছোঁয়া লাগে। প্রথম শিল্প বিপ্লবের পরেই বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন দিগন্তের শুরু হয়। উৎপাদন ব্যবস্থার বৈজ্ঞানিক পরিবর্তনে মানুষের শিল্প উন্নয়নে পরিবর্তিত হয়। কৃষি থেকে শুরু করে কারখানার প্রক্রিয়াজাতকরণ পর্যন্ত ব্যপক পরিবর্তন আসে।
ঊনিশ শতকের শেষার্ধ থেকে বিংশ শতাব্দির প্রথমার্ধ পর্যন্ত দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লব ঘটে। মূলত বিদ্যুৎ আবিষ্কারের মাধ্যমে দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লবের যুগে প্রবেশ করি। এবং ১৯৬০ এর দশক থেকে তৃতীয় শিল্প বিপ্লব শুরু হয়।
প্রথমে বাষ্পীয় ইঞ্জিনের ব্যবহার যোগাযোগ ক্ষেত্রে প্রভূত উন্নয়ন সাধনের পর ১৯৬৯ সালে ইন্টারনেট ব্যবহার শুরু হলে শিল্প বিপ্লব পরিপূর্ণ গতি লাভ করে। যোগাযোগ ব্যবস্থা ক্রমশই সহজ হয়ে ওঠে। বিশ্বের দূরবর্তী দেশসমূহকে কাছে নিয়ে আসে। ক্রমশই উৎপাদন ব্যবস্থা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ পুরোপুরি যান্ত্রিকীকরণের রুপ লাভ করে।
বর্তমানে বিশ্ব একটি গ্লোবাল ভিলেজ বা বৈশ্বিক গ্রামে পরিণত হয়েছে। এক দেশের সঙ্গে অন্য দেশের সম্পর্ক এবং বাণিজ্যিক যোগাযোগও সহজ হয়েছে। প্রযুক্তিগত কারণে বিশ্বের জনসংখ্যা মাত্রারিক্ত হলেও উৎপাদন ব্যবস্থা আধুনিকায়নের ফলে খাদ্য উৎপাদন তাল মিলিয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
পৃথিবীতে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছে। এখানে উন্নত বিশ্বের অর্থনীতি পুরোপুরি প্রযুক্তিনির্ভর। ঘর থেকে বাইরে সব জায়গায় প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করছে দেশগুলো। সেই দেশগুলো অর্থনীতিকে জুড়ে দিয়েছে প্রযুক্তির সঙ্গে। প্রতিটি সমস্যার সমাধানে প্রযুক্তিকে ব্যবহার করছে দেশগুলো।
আমরাও সেটা করছি তবে তার গতি ধীর। উন্নত বিশ্বের দেশগুলো রোবোটিক্স শিল্পে এগিয়ে গেছে অনেকখানি। অর্থনীতি সামনে এগিয়ে নিতে হলে এর বিকল্পও নেই।
চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আমরা আজ নিজেদের প্রস্তুত করছি। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং তার ব্যবহারে শিক্ষা, কৃষি, চিকিৎসা, উৎপাদন ব্যবস্থা, যোগাযোগসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার করে নিজেদের চতুর্থ বিপ্লবের পরিবর্তনে উপযোগী করে তোলা।
প্রযুক্তিকেই আধুনিকায়নের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। হাতে হাতে এন্ড্রয়েট চালিত মোবাইল ফোন, ট্যাবলেট, ল্যাপটপ, ইন্টারনেট, ক্ষুদ্র ও শক্তিশালী সেন্সর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কাজের ক্ষেত্রে মানুষের পরিবর্তে রোবটের ব্যবহার, জিন প্রযুক্তি, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং- এসবকিছু মিলিয়েই চতুর্থ শিল্প বিপ্লব।
আমরা আজ এই পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি আমাদের সামনে। খুব দ্রুতই এসব পরিবর্তন ঘটছে। শিল্প ক্ষেত্রে মানুষের স্থলে রোবটের ব্যবহার শুরু হচ্ছে। দেশে মেধাবীরা রোবট নিয়ে গবেষণা করছে। মাঝে মাঝে পত্রপত্রিকায় সেসব রোবটের ছবি ছাপা হচ্ছে।
উন্নত বিশ্ব প্রতিনিয়ত এসব আধুনিক প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি, উৎপাদন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনছে। আমরাও বসে থাকতে পারি না। পত্রিকার পাতায় মাঝে-মধ্যেই সেসব রোবটের খবর দেখতে পাই।
এখন প্রশ্ন হলো আমাদের প্রস্তুতির। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব নিয়ে আমরা কি ভাবছি বা কিভাবে এই পরিবর্তনে নিজেদের সামিল করতে পারব সেই আলোচনা চলছে।
প্রযুক্তিগত উন্নয়ন একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া। এই উন্নয়নের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলেই কাঙ্ক্ষিত সফলতা আসবে। কিন্তু যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে একটি প্রস্তুতির প্রয়োজন।
অন্যান্য শিল্প বিপ্লবের সঙ্গে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রধান পার্থক্য হচ্ছে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শিল্প বিপ্লব শুধু মানুষের শারীরিক পরিশ্রমকে যন্ত্র ও প্রযুক্তি সেবার মাধ্যমে দ্রুততর করেছে; কিন্তু চতুর্থ শিল্প বিপ্লব শুধু শারীরিক নয়, মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিশ্রমকে আরো বেশি গতিশীল ও নিখুঁত করে তুলছে।
ইউকে ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্যমতে, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী প্রায় ৮০ কোটি মানুষ তাদের বর্তমান চাকরি হারিয়ে ফেলতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের মোট চাকরিজীবীর মধ্যে ৩৮.৪৭%, যুক্তরাজ্যে ৩০%, জাপানে ২১% এবং জার্মানির ৩৫% লোকের চাকরি হারানোর প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স এবং স্মার্ট অটোমেশন নির্ভর চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের ফলে।
এটা ঠিক এখানে প্রথমে যে সমস্যা আসতে পারে সেটি বেকার সংখ্যা বৃদ্ধি। তবে এটি প্রাথমিক পর্যায়ে। প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হলে দক্ষ মানুষও পাওয়া সম্ভব। তখন সেই জনবল প্রযুক্তির বিকাশে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করার কোনো বিকল্প আমাদের হাতে নেই। আমাদের লক্ষ্য উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া। উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হলে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রযুক্তিগত সুবিধার সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে হবে।
সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ। দারিদ্র্যতার হার শূন্যে নামিয়ে আনা, দেশকে ক্ষুধামুক্ত করা, সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ জ্বালানি সুবিধা, বৈষম্য হ্রাস ইত্যাদি লক্ষ্য পূরণ করা আবশ্যক।
সরকার এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বদ্ধপরিকর থেকে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এজন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বরাদ্দ আরও বৃদ্ধি প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের মূল ধাক্কা যাবে আমাদের চাকরি খাতে বলে মনে করা হয়। প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির কারণে এবং কর্মক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে মানুষের ছোঁয়ার পরিবর্তে সেসব স্থানে রোবটের দেখা পাওয়া যায় এবং ভবিষ্যতে এই হার আরও বৃদ্ধি পাবে।
মূলত চাকরির বাজারে এবং এর ধরনে একটি পরিবর্তন আসবে। সেই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারলে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রথম ধাক্কা সামলে ওঠা কঠিন হবে।
প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে মানুষের সময় বেঁচে যাবে অনেক, আর সেটা তাদের অন্য কাজ করার সুযোগ করে দেবে। কিন্তু সমালোচকরা হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন, যেসব কাজ চলে যাবে, তার জায়গায় যে নতুন চাকরি তৈরি হবে এর কোনো নিশ্চয়তা নেই।
তাদের রিপোর্টটিতে বলা হচ্ছে, রোবট এবং এলগরিদমের কারণে এখনকার বিভিন্ন কাজের উৎপাদনশীলতা অনেকগুণ বেড়ে যাবে। কিন্তু এর ফলে নতুন কাজ তৈরিরও সুযোগ হবে।
অর্থাৎ বিষয়টা এমন যে, প্রযুক্তির কারণে আমাদের যদি কর্মসংস্থানের ভারসাম্যে প্রভাব পরে, তার সমাধানও আছে এই প্রযুক্তিতেই।
ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরাম চতুর্থ শিল্পবিপ্লব মোকাবেলার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতার একটি তালিকা প্রণয়ন করেছে।
চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যবস্থা হবে আরও দ্রুততর। শিল্পন্নোত দেশগুলো দ্রুত থেকে দ্রুততর যান তৈরিতে ব্যস্ত। সড়ক, আকাশ, নৌ এবং রেলপথ সবদিকে গতি প্রাধান্য পাচ্ছে।
প্রাত্যহিক জীবনের কর্মকাণ্ড হবে আরও সহজতর। প্রযুক্তির ব্যবহার আপনাকে সেই সুবিধা দেবে। শুধু নিজেকে প্রস্তুত করার কাজটুকু করতে হবে।
আমরা বেশ দ্রুতগতিতেই এগিয়ে চলেছি। প্রযুক্তির ব্যবহার ইতোমধ্যেই প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছি। দক্ষ জনসম্পদ তৈরি করতে তরুণদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। দেশের ফোর-জি ইন্টারনেট প্রযুক্তি আজ শিক্ষা বিস্তারসহ তথ্যমূলক কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
আমরা এখন ফাইভ-জি ইন্টারনেট প্রযুক্তি এসেছে এবং স্যাটেলাইট রয়েছে। গড়ে উঠেছে হাইটেক পার্ক যা প্রযুক্তি এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
চতুর্থ শিল্প বিপ্লবকে কাজে লাগাতে হলে সর্বক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার করতে হবে। সেজন্য দক্ষ জনসম্পদ তৈরি করতে হবে। দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বৃদ্ধিপ্রাপ্ত জনসংখ্যার জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে। এই কর্মসংস্থান হবে প্রযুক্তিনির্ভর।
বাংলাদেশ চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে প্রবেশ করতে চায় এবং নিজের অবস্থান শক্তিশালী করতে যায়। একসময় বাইরের দেশের প্রযুক্তি পণ্যেই ব্যবহার করা হতো। আজ দেশের পণ্য দেশে ব্যবহার হয়েও বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে।
মোট কথা, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে আমরা আমাদের দক্ষতা নিয়েই প্রবেশ করব এবং পুরো সুবিধা কাজে লাগাতে নিজেদের দক্ষ করে তুলব। আর তখন দেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করা আরও বেশি সহজ হবে।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট
কেকে/ এমএস