প্রজনন মৌসুমে আগামী ৮ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত সারাদেশে ইলিশ আহরণে সরকারের ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকরভাবে বাস্তবায়নে সহায়তার লক্ষ্যে নাগরিক উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ)। এ উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে প্রজননক্ষম ইলিশ সংরক্ষণে অংশীজনদের নিয়ে পরামর্শ ও মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সোমবার (৫ অক্টোবর) বিএমইউ-এর মেঘনা ভবনের কনফারেন্স রুমে ‘প্রজননক্ষম ইলিশ সংরক্ষণ উদ্যোগ’ বিষয়ে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন বিএমইউ-এর উপাচার্য রিয়ার এডমিরাল এম নিয়ামত এলাহি, এনপিপি, এনডিসি, পিএসসি।
সভায় বক্তারা জানান, দেশে ইলিশের উৎপাদন গত দুই বছরে ধারাবাহিকভাবে কমেছে। ২০২২–২৩ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন ছিল ৫ দশমিক ৭১ লাখ মেট্রিক টন। ২০২৩–২৪ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ৫ দশমিক ২৯ লাখ মেট্রিক টনে। পরবর্তী অর্থবছর ২০২৪–২৫-এ উৎপাদন আরও কমে ৫ দশমিক ০০ লাখ মেট্রিক টনে নেমে এসেছে।
ইলিশ উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে অতিরিক্ত আহরণ, অবৈধ ও অতিক্ষুদ্র ফাঁসের জাল ব্যবহার, মা ইলিশ ও জাটকা নিধন, বটম ট্রলিং, নদীদূষণ, পলি জমা এবং জলবায়ু পরিবর্তনকে চিহ্নিত করেন বক্তারা।
জাতীয় মৎস্যজীবী সমিতি ও সিএনআরএসের প্রতিনিধিরা নিষেধাজ্ঞার সময়ে বিভিন্ন গোষ্ঠীর যোগসাজশে অবৈধভাবে ইলিশ আহরণের চিত্র তুলে ধরেন। তারা জানান, পদ্মার অভয়াশ্রম এলাকায়, বিশেষ করে জাজিরা, সুরেশ্বর ও চর ভৈরবীতে কখনো কখনো যুদ্ধাবস্থার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। এসব এলাকায় অভিযানকারী দলের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটে।
কোস্ট গার্ডের সাবেক জোনাল কমান্ডার হিসেবে বিএমইউ-এর ট্রেজারার ও আইবিবিবিএসের পরিচালক মা ইলিশ রক্ষা অভিযানে তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। ইলিশ সম্পদ রক্ষায় কোস্ট গার্ড ও বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ভূমিকার প্রশংসা করে নিষেধাজ্ঞার সময়ে তাদের আরও সক্রিয় ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন অংশগ্রহণকারীরা।
প্রধান অতিথি ইলিশ সংরক্ষণে সরকার, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক, জেলে সম্প্রদায়, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান জানান। সম্প্রতি ভারতের গুজরাট থেকে দেশে ইলিশ আসার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। দেশের নিজস্ব ইলিশসম্পদ সংরক্ষণের মাধ্যমেই দেশের চাহিদা পূরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন উপাচার্য।
গুরুত্বপূর্ণ প্রজননস্থলগুলোতে কোস্ট গার্ডের নজরদারি জোরদারে বিএমইউ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও সমন্বয়ের উদ্যোগ নিতে পারে বলেও জানান তিনি।
সভায় বিএমইউতে একটি সমন্বয় সেল গঠন এবং অংশগ্রহণকারী প্রতিটি প্রতিষ্ঠান থেকে একজন করে ফোকাল পারসন মনোনয়নের সিদ্ধান্ত হয়। আগামী ৮ ও ৯ অক্টোবর বিএমইউ, বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডের প্রতিনিধিদের নিয়ে মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এ ছাড়া নিষেধাজ্ঞার সময়ে ঘাটভিত্তিক সচেতনতা কার্যক্রম, কমিউনিটি তথ্যদাতা নেটওয়ার্ক, বরিশালের ইলিশ ঘাটে জনসমাবেশ এবং জেলেদের খাদ্য সহায়তা কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সভায় জাতীয় সেমিনার আয়োজন, মন্ত্রণালয় পর্যায়ে ‘হিলসা থিংক ট্যাংক’ গঠন এবং ইলিশের জনসংখ্যা, প্রজননক্ষেত্র ও নদীদূষণ বিষয়ে যৌথ গবেষণার প্রস্তাবও উঠে আসে। এ ধরনের গবেষণায় অর্থায়নের আগ্রহ প্রকাশ করেছে কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশন।
সভায় অংশ নেওয়া সব এনজিও এবং জাতীয় মৎস্যজীবী সমিতি সরকারের ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে পূর্ণ সহযোগিতার অঙ্গীকার করে।
সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন বিএমইউ-এর আইবিবিবিএসের পরিচালক ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ শহিদুল হক; অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল ওহাব (আহ্বায়ক); কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ড. নাথুরাম সরকার ও সিনিয়র স্পেশালিস্ট ড. মো. খলিলুর রহমান; জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আব্দুল বাকী; শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কাজী আহসান হাবীব ও মীর মোহাম্মদ আলী; বিএফআরআইয়ের সাবেক পরিচালক ড. আনিসুর রহমান; সার্ক কৃষি কেন্দ্রের ড. মো. শরীফুল ইসলাম; সিএনআরএসের মাসুদ সিদ্দিকী; কোস্ট ফাউন্ডেশনের জাহিদুল ইসলাম; সুশীলনের মো. নাসির উদ্দিন ফারুক এবং জাতীয় মৎস্যজীবী সমিতির সহ-সভাপতি দাদন মিয়া সরদার।
কেকে/ এমএস