মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষা বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি ক্রমেই মাদক পাচারের ঝুঁকিপূর্ণ রুট হিসেবে আলোচনায় আসছে। দুর্গম পাহাড়, ঘন জঙ্গল, ছড়া ও সীমান্তের অপ্রচলিত পথ ব্যবহার করে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে ঢুকছে ইয়াবা, বিদেশি মদসহ বিভিন্ন চোরাই পণ্য।
দিনের আলোয় অনেকটা নীরব থাকলেও সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে সক্রিয় হয়ে ওঠে পাচারকারীদের নেটওয়ার্ক। সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নেয় বহনকারী, দালাল ও পাহারাদাররা। সুযোগ বুঝে গভীর রাতে মাদকের চালান ঢুকে পড়ে দেশের অভ্যন্তরে।
সীমান্তঘেঁষা একাধিক এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা ও বিভিন্ন সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম, সোনাইছড়ি, ফুলতলী, জারুলিয়াছড়ি ও আশপাশের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় মাদক পাচারের একাধিক রুট সক্রিয় রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব রুটের কয়েকটিতে নিয়মিত ইয়াবা ও বিদেশি মদের চালান আসে। সীমান্তের অন্তত ৭ থেকে ১০টি পয়েন্টকে পাচারকারীরা বিভিন্ন সময়ে ব্যবহার করছে বলে স্থানীয়দের দাবি। কোনো পয়েন্ট পাহাড়ি ছড়া, কোনোটি ঘন জঙ্গলের ভেতর, আবার কোনোটি লোকালয় থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে পাচারকারীরা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সীমান্তের দুর্গম এলাকাগুলোই মাদক কারবারিদের বড় ভরসা। দিনের বেলায় অনেকটা স্বাভাবিক পরিবেশ থাকলেও সন্ধ্যার পর বদলে যায় চিত্র। সীমান্তের কাছাকাছি বিভিন্ন পয়েন্টে ছোট ছোট দলে অবস্থান নেয় বহনকারী ও সহযোগীরা। গভীর রাতে সীমান্ত পার করে আনা মাদকের চালান প্রথমে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় রাখা হয়। পরে সুবিধাজনক সময়ে তা ছোট ছোট অংশে ভাগ করে বিভিন্ন গন্তব্যে পাঠানো হয়।
সেপ্টেম্বরে দেড় লাখের বেশি ইয়াবা উদ্ধার
জেলা পুলিশের তথ্যমতে, ১ থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বান্দরবানের বিভিন্ন থানা, তদন্ত কেন্দ্র, পুলিশ ফাঁড়ি ও জেলা গোয়েন্দা শাখার পৃথক মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযানে মোট ১ লাখ ৫০ হাজার ২৮৩ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে ১০৮ লিটার দেশীয় তৈরি চোলাই মদ, এক বোতল হুইস্কি ও এক বোতল বিয়ার উদ্ধার করা হয়। এসব ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১৫ জনকে।
অভিযানে মাদক পরিবহণ ও বিক্রির কাজে ব্যবহৃত একটি প্রাইভেটকার, একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, একটি সিএনজি ও দুটি মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি তিনটি মোবাইল ফোন ও নগদ ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১০০ টাকা জব্দ করা হয়।
জেলা পুলিশের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সেপ্টেম্বর মাসে উদ্ধার হওয়া ইয়াবার বড় অংশই নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করা হয়েছে। বিশেষ করে ঘুমধুম ও নাইক্ষ্যংছড়ি এলাকায় একাধিক বড় চালান আটকের ঘটনা সীমান্তপথে মাদক প্রবেশের ঝুঁকির বিষয়টি সামনে এনেছে।
চার দিনে এক লাখ ৪০ হাজার ইয়াবা
পুলিশের তথ্যমতে, ৪ সেপ্টেম্বর বান্দরবান জেলা গোয়েন্দা শাখার অভিযানে ৩০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। এ সময় একটি প্রাইভেটকার ও একটি মোবাইল ফোন জব্দসহ একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। উদ্ধার ইয়াবার আনুমানিক মূল্য ৯০ লাখ টাকা।
৯ সেপ্টেম্বর ঘুমধুম পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের অভিযানে ৬০ পিস ইয়াবা, এক বোতল হুইস্কি ও এক বোতল বিয়ার উদ্ধার করা হয়। এ সময় নগদ ৫ লাখ ৯০ হাজার টাকা উদ্ধারসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এর পরদিন ১০ সেপ্টেম্বর আলীকদম থানা পুলিশ ২৮ পিস ইয়াবা ও মাদক বিক্রির ৪ হাজার ১০০ টাকা উদ্ধার করে একজনকে গ্রেপ্তার করে।
১১ সেপ্টেম্বর নাইক্ষ্যংছড়ি থানা পুলিশের অভিযানে ২০ হাজার পিস ইয়াবা ও একটি অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
১২ সেপ্টেম্বর নাইক্ষ্যংছড়িতে পুলিশের অভিযানে ধরা পড়ে আরও বড় চালান—৬০ হাজার পিস ইয়াবা। যার ওজন ৫ কেজি ৪০০ গ্রাম এবং আনুমানিক মূল্য ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এ ঘটনায় একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা জব্দ ও দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
১৪ সেপ্টেম্বর আলীকদমে ১৬৫ পিস ইয়াবা ও একটি রেজিস্ট্রেশনবিহীন মোটরসাইকেলসহ একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
১৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ঘুমধুম পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের অভিযানে ২০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। যার ওজন ১ কেজি ৮০০ গ্রাম এবং আনুমানিক মূল্য ৬০ লাখ টাকা। এ সময় একটি সবুজ রঙের তিন চাকার সিএনজি জব্দ ও একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
২৫ সেপ্টেম্বর বান্দরবান সদর থানা পুলিশ ৩০ পিস ইয়াবা ও একটি ভিভো ওয়াই৩১ স্মার্টফোন জব্দ করে একজনকে গ্রেপ্তার করে।
২৮ সেপ্টেম্বর নাইক্ষ্যংছড়ি থানা পুলিশ ১০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করে। উদ্ধার ইয়াবার ওজন ৯০০ গ্রাম এবং আনুমানিক মূল্য ৩০ লাখ টাকা। এ ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পরদিন ২৯ সেপ্টেম্বর নাইক্ষ্যংছড়ি সদর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের চেরারকুল এলাকায় অভিযান চালিয়ে আরও ১০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করে পুলিশ। তবে এ ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।
ইয়াবার পাশাপাশি দেশীয় তৈরি চোলাই মদের বিরুদ্ধেও সেপ্টেম্বরজুড়ে অভিযান চালিয়েছে জেলা পুলিশ। ১১ সেপ্টেম্বর লামার ফাইতং পুলিশ ফাঁড়ির অভিযানে ৩০ লিটার চোলাই মদ ও একটি রেজিস্ট্রেশনবিহীন মোটরসাইকেল জব্দ করে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
১৮ সেপ্টেম্বর বান্দরবান সদর থানা পুলিশ ৪২ লিটার চোলাই মদসহ একজনকে গ্রেপ্তার করে। ২২ সেপ্টেম্বর লামা থানা পুলিশ ৩৬ লিটার চোলাই মদসহ আরও একজনকে গ্রেপ্তার করে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সোনাইছড়ি সীমান্তের কয়েকটি পয়েন্ট দিয়ে গভীর রাতে নিয়মিত মাদক ঢোকে। তাদের দাবি, অন্তত চারটি রুট ব্যবহার করে ইয়াবা ও বিদেশি মদ বাংলাদেশে আনা হয়। পরে এসব মাদক স্থানীয় পর্যায়ে সরবরাহের পাশাপাশি বিভিন্ন পরিবহণযোগে কক্সবাজারসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলে পাঠানো হয়।
স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা জানান, সীমান্তের দুর্গম পাহাড়ি পথগুলো সম্পর্কে স্থানীয়দের একটি অংশের ধারণা থাকলেও বহিরাগতদের পক্ষে এসব পথ চেনা কঠিন। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে পাচারকারীরা কখনো পাহাড়ি ছড়া, কখনো জঙ্গলের ভেতরের সরু পথ, আবার কখনো লোকালয় এড়িয়ে বিকল্প পথ ব্যবহার করে।
তাদের ভাষ্য, সীমান্তের ওপারে মাদকের চালান প্রস্তুত হওয়ার পর বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা একটি চক্রের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। এরপর নির্দিষ্ট সময় ও স্থান ঠিক করে বহনকারীদের মাধ্যমে চালান পার করা হয়। চালান দেশে প্রবেশের পর সেটি একাধিক হাতবদল হয়ে বিভিন্ন গন্তব্যে পৌঁছে যায়।
তবে স্থানীয়দের এসব অভিযোগের সবকটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
বড় চালান আটকালেও পালিয়ে যায় অনেকে
স্থানীয়দের ভাষ্য, সীমান্তবর্তী দুর্গম পাহাড়ি পথ ও যোগাযোগব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে মাদক কারবারিরা বিভিন্ন কৌশলে ইয়াবা পরিবহণের চেষ্টা করে থাকে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় মাঝেমধ্যে বড় চালান আটক হলেও এর সঙ্গে জড়িতদের একটি অংশ পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
সীমান্ত এলাকায় নিয়মিত টহল, চেকপোস্ট ও বিশেষ অভিযান বাড়ানো হলেও দুর্গম ভূপ্রকৃতির কারণে পুরো সীমান্ত এলাকায় নজরদারি নিশ্চিত করা কঠিন বলে মনে করেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, মাদকের মূল উৎস ও পাচারচক্রের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা গেলে সীমান্তপথে মাদক প্রবেশ অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
ঘুমধুম পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ (আইসি) মো. মঈন উদ্দীন বলেন, সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকাগুলোতে মাদক পাচার ঠেকাতে পুলিশ নিয়মিত টহল ও বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে। মাদক কারবারিরা দুর্গম পাহাড়ি পথ ও অপ্রচলিত রুট ব্যবহার করে মাদক পরিবহণের চেষ্টা করে থাকে। তবে পুলিশও এসব রুটে নজরদারি বাড়িয়েছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন অভিযানে ইয়াবাসহ মাদকদ্রব্য উদ্ধার এবং সংশ্লিষ্টদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তিনি বলেন, মাদক পরিবহণের সঙ্গে জড়িতদের পাশাপাশি এর পেছনে থাকা মূল কারবারিদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। সীমান্তবর্তী এলাকায় সন্দেহজনক গতিবিধি সম্পর্কে তথ্য পেলে তাৎক্ষণিকভাবে অভিযান চালানো হচ্ছে। মাদকবিরোধী এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।
নাইক্ষ্যংছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মোজাম্মেল হক বলেন, নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তবর্তী উপজেলা হওয়ায় মাদক পাচার প্রতিরোধে পুলিশকে বাড়তি সতর্ক থাকতে হচ্ছে। সীমান্তের দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, জঙ্গল ও অপ্রচলিত পথ ব্যবহার করে যাতে মাদকের চালান দেশের অভ্যন্তরে ঢুকতে না পারে, সে জন্য নিয়মিত অভিযান ও নজরদারি চালানো হচ্ছে।
তিনি বলেন, সেপ্টেম্বর মাসেও নাইক্ষ্যংছড়ির বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে। এসব ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মাদক কারবারিদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। মাদক পাচার, পরিবহণ ও বিক্রির সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে পুলিশের অভিযান আরও জোরদার করা হবে।
ওসি আরও বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদেরও সচেতন ও সহযোগী হতে হবে। সীমান্ত এলাকায় কোনো সন্দেহজনক ব্যক্তি, গতিবিধি বা মাদক পাচারের তথ্য পাওয়া গেলে দ্রুত পুলিশকে জানালে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।
বান্দরবান জেলা পুলিশ সুপার মো. ওহাবুল ইসলাম খন্দকার বলেন, মাদকদ্রব্যের বিস্তার রোধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং মাদকমুক্ত সমাজ গঠনের লক্ষ্যে জেলা পুলিশের মাদকবিরোধী অভিযান ও আইনগত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
তিনি বলেন, মাদক কারবারি, পরিবহণকারী ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। মাদকের সঙ্গে জড়িতদের কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। মাদকবিরোধী অভিযান আরও জোরদার করা হবে।
পুলিশের অভিযানে যা উদ্ধার
পুলিশের তথ্যমতে, সেপ্টেম্বর মাসের এসব অভিযানে সর্বমোট ১ লাখ ৫০ হাজার ২৮৩ পিস ইয়াবা, ১০৮ লিটার দেশীয় তৈরি চোলাই মদ, এক বোতল হুইস্কি ও এক বোতল বিয়ার উদ্ধার করা হয়েছে। একই সঙ্গে নগদ ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১০০ টাকা, একটি প্রাইভেটকার, একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, একটি সিএনজি, দুটি মোটরসাইকেল ও তিনটি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়। এসব ঘটনায় মোট ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
এক মাসের এই পরিসংখ্যান বলছে, মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষা নাইক্ষ্যংছড়িতে মাদক পাচার ঠেকানো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, সীমান্তের অপ্রচলিত পথ এবং রাতের আঁধারকে কাজে লাগিয়ে পাচারকারীরা সক্রিয় থাকার অভিযোগ উঠেছে। ফলে শুধু চালান আটকের পাশাপাশি মাদকের উৎস, বহনকারী, স্থানীয় সহযোগী ও গন্তব্যভিত্তিক নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
কেকে/সাশ