অটোভ্যানে চড়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর পর ভাড়া দিতে এগিয়ে এল এক মাদ্রাসাছাত্র। কিন্তু টাকা নিলেন না চালক ইয়ার মাহমুদ। বরং স্নেহভরে শিশুটির মাথায় হাত রেখে বললেন, ‘আমাকে দোয়া করবেন।’ দীর্ঘদিন ধরে এভাবেই মাদ্রাসাছাত্র ও কোরআনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিনা ভাড়ায় গন্তব্যে পৌঁছে দিচ্ছেন তিনি। বিনিময়ে চান শুধু দোয়া।
টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার কালিয়াপাড়া ঘোনারচালা এলাকার বাসিন্দা ইয়ার মাহমুদ (৪২)। জীবিকার তাগিদে প্রায় এক যুগ ধরে অটোভ্যান চালিয়ে সংসার চালাচ্ছেন তিনি। তার নিজের ছেলেও স্থানীয় একটি দাখিল মাদ্রাসায় পড়াশোনা করছে।
ইয়ার মাহমুদের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগের পেছনে রয়েছে জীবনের এক বেদনাবিধুর স্মৃতি। ২০১১ সালে জন্মের কয়েক ঘণ্টা পরই তার এক নবজাতক ছেলে মারা যায়। সন্তান হারানোর সেই শোকের মধ্যে তিনি নিয়ত করেন, ভবিষ্যতে আল্লাহ তাকে আরেকটি সন্তান দান করলে তাকে হাফেজ বানাবেন। পাশাপাশি কোরআনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানুষদের সম্মান করবেন।
এরপর জীবিকার সন্ধানে ২০১৪ সালে ধারদেনা করে ইউরোপের গ্রিসে পাড়ি জমান ইয়ার মাহমুদ। কিন্তু বৈধ কাগজপত্র না থাকায় সেখানে ১১ মাস থাকার পর দেশে ফিরে আসতে হয় তাকে। ২০১৫ সালে একটি অটোভ্যান কিনে শুরু করেন যাত্রী পরিবহনের কাজ। সেই সঙ্গে বাস্তবায়ন করতে থাকেন নিজের দীর্ঘদিনের নিয়ত।
অটোভ্যানে মাদ্রাসাছাত্র, আলেম, হাফেজ, মুফতি, ইমাম ও মুয়াজ্জিন উঠলে তাদের কাছ থেকে ভাড়া নেন না তিনি। গন্তব্যে পৌঁছে দিয়ে বিনিময়ে চান দোয়া।
ইয়ার মাহমুদ বলেন, ‘আমার নবজাতক সন্তান যখন মারা যায়, তখনই নিয়ত করেছি—আমি আজীবন মাদ্রাসাছাত্র, আলেম ও হাফেজদের সম্মান করব। সেই ভালোবাসা থেকেই ২০১৫ সাল থেকে অটোভ্যানে মাদ্রাসাছাত্র, আলেম, হাফেজ ও মুফতিদের ভাড়া নিই না।’
তবে জীবনযুদ্ধে এখনো তাকে লড়তে হচ্ছে ঋণের বোঝা নিয়ে। বিদেশ যাওয়ার সময় ধার করা টাকার বড় একটি অংশ পরিশোধ করতে পারেননি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা ঋণ রয়েছে। অটোভ্যান চালিয়ে সেই ঋণ পরিশোধের পাশাপাশি সংসারের খরচও বহন করছেন।
মাদ্রাসাছাত্রদের কাছ থেকে ভাড়া না নেওয়ায় আয়ে প্রভাব পড়ে কি না, জানতে চাইলে ইয়ার মাহমুদ বলেন, এতে তার কোনো আফসোস নেই। বরং তিনি বিশ্বাস করেন, এ কাজের মধ্য দিয়ে তার রিজিকে বরকত হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আল্লাহ আমাকে দিচ্ছেন। এমনিতেই যদি ২০০ টাকা কামাই করি, মাদ্রাসাছাত্রদের কাছ থেকে ভাড়া না নিলে মনে হয় ওই দিন আরও বেশি হয়।’
নিজের উদ্যোগকে লোক দেখানো কাজ হিসেবে দেখতে নারাজ ইয়ার মাহমুদ। তার কাছে এটি আল্লাহকে খুশি করার পাশাপাশি কোরআনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রকাশের একটি মাধ্যম।
তিনি বলেন, ‘আমি মাদ্রাসার ছাত্র, কোরআনের পাখিদের কাছ থেকে কোনো ভাড়া চাই না, আমি তাদের কাছ থেকে দোয়া চাই। মানুষের দোয়া থাকলে জীবনে ভালো কাজ করা সম্ভব। এটা লোক দেখানো কোনো কাজ নয়। নিজের ইচ্ছায়, আল্লাহকে খুশি করার জন্য এবং কোরআনের পাখিদের সম্মান করার জন্য আমি এটি করছি।’
ইয়ার মাহমুদের দাবি, প্রতিদিন গড়ে অন্তত ১০ জন মাদ্রাসাছাত্র, ইমাম, মুয়াজ্জিনসহ ধর্মীয় ব্যক্তিকে বিনা ভাড়ায় গন্তব্যে পৌঁছে দেন তিনি। এতে আয়ের কিছুটা কমতি হলেও নিজের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার ইচ্ছা নেই তার।
সাধারণত সখীপুর-সাগরদিঘী ও কচুয়া-ভালুকা সড়কে অটোভ্যান চালান ইয়ার মাহমুদ। এর বাইরে অবসর সময়ে শখের বশে ‘Ear Mahmud’ নামের ফেসবুক আইডিতে ভিডিও ও বিভিন্ন কনটেন্ট তৈরি করেন তিনি।
তার অটোভ্যানে নিয়মিত যাতায়াত করা স্থানীয় ইমাম ও মাদ্রাসা পরিচালক আইন উদ্দিন বলেন, ‘ইয়ার মাহমুদ ভাই খুব সুন্দর মনের মানুষ। এমন মহৎ কাজ করে তিনি মাদ্রাসাছাত্রদের সম্মানিত করেছেন।’
যাত্রী মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘আজকাল এমন মানুষ দেখাই যায় না। অনেকেই ১০ টাকার ভাড়া ২০ টাকা নিয়ে থাকেন। কিন্তু তিনি কোরআনের পাখিদের, অর্থাৎ মাদ্রাসাছাত্রদের কাছ থেকে ভাড়া নেন না। এটি নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।’
জীবনের হিসাব-নিকাশে ইয়ার মাহমুদের চাওয়া খুব বেশি নয়। অটোভ্যান চালিয়ে ঋণ পরিশোধ করা, সংসার চালানো আর সামর্থ্য অনুযায়ী মাদ্রাসাছাত্র ও কোরআনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানুষদের সম্মান করে যাওয়াই তাঁর লক্ষ্য।
ইয়ার মাহমুদ বলেন, ‘মরার আগ পর্যন্ত আমি এই পেশায় থাকতে চাই এবং মাদ্রাসাছাত্র, কোরআনের পাখিদের এই সম্মান জানাতে চাই। আমার আর কিছু চাওয়ার নেই।’
কেকে/সাশ