মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬,
২১ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম: ● ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় ১০ মৃত্যু, মোট প্রাণহানি ২৮১      ● হাম উপসর্গে আরও ৬ জনের মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ১৩৯৩      ● ভুল ধরিয়ে দেব, সংশোধন না হলে প্রতিরোধ: গোলাম পরওয়ার      ● জাপান সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান      ● প্রধান শিক্ষক নিয়োগে ১৮ বছরের অভিজ্ঞতার শর্ত বহাল      ● বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস: বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি নামতে পারে ৩.৪ শতাংশে      ● নির্ধারিত দামে এলপিজি না মিললে গণমাধ্যমে তুলে ধরার আহ্বান      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
প্রতিবাদের অধিকার—এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধা
মোহাম্মদ সলিমউল্যাহ
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:৩৭ পিএম আপডেট: ০৬.১০.২০২৬ ৬:৪০ পিএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

গত কয়েক দিন ধরে হযরত শাহজালাল আন্তজাতিক বিমানবন্দরে সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানকে ঘিরে ঘটে যাওয়া ঘটনা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। যাত্রীসেবার বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে অভিযোগে থেকে যার সূত্রপাত, তা পরবর্তী সময়ে বিমানবন্দরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার আচরণ, মামলা দায়ের, তার গ্রেপ্তার এবং এ নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার কারণে একটি বৃহত্তর বির্তকে রূপ নিয়েছে।

বিষয়টি তিনটি পৃথক অংশে বিবেচনা করা প্রয়োজন। 

প্রথমত, বিমানবন্দরের সেবা নিয়ে যাত্রীদের অভিযোগ—বিশেষ করে লাগেজ ট্রলির স্বল্পতা এবং ব্যাগেজ ও জমজমের পানি পেতে বিলম্ব। 

দ্বিতীয়ত, এসব অভিযোগের প্রেক্ষাপটে মজর আখতারুজ্জামান সিভিল এভিয়েশন ও বিমানবন্দরের অন্যান্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে যে আচরণ করেছেন। 

তৃতীয়ত, বিমানবন্দরের একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তার দায়ের করা মামলা, পরবর্তী সময়ে আখতারুজ্জামানের গ্রেপ্তার এবং এ বিষয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমানের প্রতিক্রিয়া। 

আলোচনার সুবিধার্থে ধরে নেওয়া যাক, সেদিন যাত্রীদের সব অভিযোগই সম্পূণ যৌক্তিক ছিল।

হযরত শাহজালাল আন্তজাতিক বিমানবন্দরের সেবা নিয়ে অভিযোগ নতুন নয়। এর কিছু নিঃসন্দেহে যৌক্তিক, আবার কিছু ক্ষেত্রে  অতিরঞ্জনও রয়েছে। বাংলাদেশের প্রধান আন্তজাতিক প্রবেশদ্বার হিসেবে এই বিমানবন্দর থেকে যাত্রীদের উন্নত ও দক্ষ সেবা প্রত্যাশা করার পূণ অধিকার রয়েছে। ট্রলির স্বল্পতা, ব্যাগেজ পেতে অযৌক্তিক বিলম্ব, যথাযথ তথ্যের অভাব কিংবা দায়িত্বে অবহেলা—এসব অভিযোগ অবশ্যই তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

তবে এটাও মনে রাখা দরকার যে ব্যাগেজ পেতে বিলম্ব, লাগেজ হারিয়ে যাওয়া, বিমানবন্দরে অতিরিক্ত ভিড় কিংবা ফ্লাইট পরিচালনায় বিঘ্ন—এসব সমস্যা শুধু বাংলাদেশেই ঘটে না। অনেক নিয়মিত যাত্রীর মতো আমিও ব্যক্তিগতভাবে এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি। সাম্প্রতিক দুটি অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করলে বিষয়টি হয়তো আরও পরিষ্কার হবে। 

একবার এমিরেটসের ফ্লাইটে কুয়ালালামপুর যাওয়ার সময় আমার লাগেজ হারিয়ে যায় এবং সেটি আর কখনো ফেরত পাইনি। একই ফ্লাইটের আরও কয়েকজন যাত্রীও তাদের লাগেজ হারানোর অভিযোগ করছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই যাত্রীদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ ছিল, কিন্তু কেউ বিমানবন্দরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে শারীরিকভাবে সংঘাতে জড়াননি। আমরা প্রচলিত নিয়ম ও পদ্ধতি অনুসরণ করেই অভিযোগ জানিয়েছিলাম। 

আরও সম্প্রতি ক্যালিফোর্নিয়া থেকে কায়ান্টাসের ফ্লাইটে মেলবোর্নে যাওয়ার পথে সাধারণ ব্যাগেজ বিলম্বের তুলনায় অনেক বেশি দুর্ভোগের সম্মুখীন হই। আমাদের ফ্লাইট হনলুলুতে আটকে যায়। চার শতাধিক যাত্রী—যাঁদের মধ্যে শিশু ও অতি অল্পবয়সী শিশুও ছিল—কয়েকবার বিমানবন্দর ও হোটেলের মধ্যে আসা-যাওয়া করতে বাধ্য হন। প্রতিবারই আমাদের বল্ট থেকে লাগেজ সংগ্রহ করে সঙ্গে নিয়ে হোটেলে যেতে হয়েছে এবং পরদিন ভোর ৩টা ৩০ মিনিটে আবার বিমানবন্দরে রির্পোট করতে হয়েছে। 

প্রতিবার পুরো চেক-ইন প্রক্রিয়া ও কষ্টসাধ্য নিরাপত্তা তল্লাশি শেষ করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ডিপারচার লাউঞ্জে অপেক্ষা করার পর শেষ পর্যন্ত জানানো হয়েছে—ফ্লাইট আবার বাতিল হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ৩০ সেপ্টেম্বরের পরির্বতে আমি মেলবোর্নে পৌঁছাই ৩ অক্টোবর। দুর্ভোগ এখানেই শেষ হয়নি। মেলবোর্নে পৌঁছে দেখি, আমার কিছু লাগেজ আসেনি। আরও অনেক যাত্রীকে হারানো লাগেজের অভিযোগ জানাতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি। এত দুর্ভোগ, ক্লান্তি ও হতাশার পরও কোনো যাত্রী বিমান সংস্থা বা বিমানবন্দরের কর্মকর্তাদের শারীরিক সংঘাতে জড়াননি। তারা ক্ষোভ ও অভিযোগ প্রকাশ করেছেন, কিন্তু নির্ধারিত প্রক্রিয়াই অনুসরণ করেছেন। 

এর অর্থ এই নয় যে বিদেশের বিমানবন্দরেও সমস্যা হয় বলে বাংলাদেশের যাত্রীদের নিম্নমানের সেবা নীরবে মনে নিতে হবে। বরং আমাদের নিজেদের বিমানবন্দরে আরও উন্নত সেবা দাবি করা উচিত। 

আমার বক্তব্য অন্য জায়গায় : অভিযোগ যতই যৌক্তিক হোক না কেন, তা প্রকাশের পদ্ধতিতে কাউকে সীমাহীন স্বাধীনতা দেয়া যায় না। এবার আসা যাক ঘটনার দ্বিতীয় এবং আমার বিবেচনায় আরও গুরুত্বপূর্ণ দিকটিতে। যে বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন করেছে তা হলো বিমানবন্দরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার প্রতি দৃশ্যত ভীতি প্রদশর্ন ও হুমকিমূলক আচরণ। এক্ষেত্রে বহুল প্রচারিত ভিডিওটি গুরুত্বপূর্ণ। 

সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মেজর আখতারুজ্জামান বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালককে ঘাড় ধরে বের করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন এবং তিনি মার খেতে চান কি না—এমন প্রশ্নও করেছেন। ভিডিওতে তার অঙ্গভঙ্গি ও শারীরিক ভাষাও দৃশ্যমান। তার আচরণ কোনো সুনির্দিষ্ট ফৌজদারি অপরাধের পর্যায়ে পড়ে কি না, তা নির্ধারণ করা আমার কাজ নয়। সেটি তদন্ত এবং শেষ পর্যন্ত আদালতের বিষয়। কিন্তু একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এ ধরনের ভাষা ও শারীরিক অঙ্গভঙ্গি অভিযোগ প্রকাশের গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি হতে পারে কি না—এই প্রশ্ন তোলার জন্য আইন বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই।

একজন কমকতার সঙ্গে তর্ক করা যায়। তার কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া যায়। তার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা যায়। সংবাদমাধ্যমের সামনে প্রশাসনিক ব্যর্থতা তুলে ধরা যায়। কোনো রাজনৈতিক দল তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করতে পারে কিংবা তাকে অপসারণের দাবিও জানাতে পারে। কিন্তু কোনো কর্মকর্তাকে শারীরিকভাবে ভয় দখানো কিংবা তার মধ্যে এই আশঙ্কা সৃষ্টি করা যে তার বিরুদ্ধে শারীরিক শক্তি প্রয়োগ করা হতে পারে—সেটি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি সীমা অতিক্রম করে। মেজর আখতারুজ্জামান সরকারি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে অনভিজ্ঞ কোনো সাধারণ ক্ষুব্ধ যাত্রী নন। তিনি একজন সাবেক সংসদ সদস্য, সাবেক সামরিক কর্মকর্তা এবং অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ।

একজন ব্যক্তির রাজনৈতিক প্রভাব যত বেশি, দৃঢ়ভাবে প্রতিবাদ করেও যে ভীতি প্রদর্শন থেকে বিরত থাকা যায়—নিজের আচরণের মাধ্যমে তা দেখানোর দায়িত্বও তার তত বেশি হওয়া উচিত। তার সামনে প্রতিবাদের আরও অনেক পথ খোলা ছিল। বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে উত্থাপন করা যেত। জামায়াতে ইসলামী সংবাদ সম্মেলন করে বিমানবন্দরের অব্যবস্থাপনার তথ্য-প্রমাণ তুলে ধরতে পারতো। দলটির সংসদ সদস্যরা বিষয়টি সংসদে তুলতে পারতেন। দলটি আইনসম্মত প্রতিবাদ কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারত। সিভিল এভিয়েশন, বিমান সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কিংবা কোনো অপরাধ সংঘটতি হয়েছে বলে মনে করলে পুলিশের কাছেও আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করা যেত। 

কিন্তু তার পরিব সংঘাতটি এমন রূপ নিয়েছে, যা এখন পুরো বির্তকে চলে এসেছে। এক পর্যায়ে আখতারুজ্জামান জামায়াতকে ট্রলি সরবরাহ করতে বলা যেতে পারে বলেও মন্তব্য করেন। তিনি বিমানবন্দরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের যোগ্যতা ও নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। এসব মন্তব্য সাধারণ একজন যাত্রীর অভিযোগের সীমা ছাড়িয়ে ঘটনাটিকে অনিবার্যভাবেই একটি রাজনৈতিক মাত্রা দিয়েছে। 

আমার মনে হয়, এখানে একটি গুরুত্বপূণ নীতি উপেক্ষিত। সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নাগরিকদের অধিকার নিয়ে আমরা যথাথভাবেই কথা বলি। কিন্তু সরকারি কর্মকর্তাদের নিজেদের অধিকার নিয়ে তুলনামূলকভাবে অনেক কম আলোচনা করি। শুধু আইন, মন্ত্রণালয়, ভবন কিংবা বিধিবিধান দিয়ে একটি সরকার পরিচালিত হয় না। সরকার পরিচালিত হয় মানুষের মাধ্যমে—প্রশাসক, নিরাপত্তাকর্মী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, পুলিশ কর্মকর্তা এবং আরও হাজার হাজার কর্মচারীর মাধ্যমে, যারা রাষ্ট্রযন্ত্রকে সচল রাখেন। তাদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় থাকতে হবে। অযোগ্য কর্মকর্তাকে তার ব্যথতার পরিণতি ভাগ করতে হবে। দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাকে আইনের মুখোমুখি হতে হবে। 

কোনো কর্মকর্তা অহংকারী আচরণ করলে শুধু সরকারি পদে আছেন বলে তাকে রক্ষা করা উচিত নয়। কিন্তু জবাবদিহির অর্থ এই হতে পারে না যে সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে একজন মানুষ তাঁর মর্যাদা ও আইনি অধিকার বিসর্জন দিবেন। বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা। কিন্তু মেষ বিচারে তার পদমর্যদা এখানে মূল বিষয় নয়। যাকে হুমকি দেওয়া হয়েছে তিনি যদি বিমানবন্দরের সবকনিষ্ঠ কর্মচারীও হতেন, তাহলেও নীতিগত প্রশ্নটি একই থাকত।

কোনো সরকারি কর্মচারীকে তার দায়িত্ব পালনের আগে সামনে দাঁড়ানো ব্যক্তির শারীরিক শক্তি কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব কতটা—সেটি হিসাব করতে যাওয়া উচিত নয়। এই নীতিটি যদি হারিয়ে যায়, তাহলে রাষ্ট্রযন্ত্রের কী অবস্থা হতে পারে তা ভবে দেখা দরকার। আজ একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার সামনে বিমানবন্দরের একজন কর্মকর্তা ভীতির মুখে পড়তে পারেন। কাল একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারেন সরকারি হাসপাতালের একজন চিকিৎসক, বিদ্যুৎ বিভাগের একজন প্রকৌশলী, কাস্টমস কর্মকর্তা, ভূমি কর্মকর্তা, কর কর্মকর্তা কিংবা একজন পুলিশ কর্মকর্তা। এসব খাতের সবকটিতেই সমস্যা ও র্দুবলতা রয়েছে। নাগরিকদের অনেক অভিযোগও সম্পূর্ণ যৌক্তিক। কিন্তু অভিযোগ যৌক্তিক হলেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে হুমকি দেওয়া কিংবা শারীরিকভাবে ভীতি প্রদর্শন গ্রহণযোগ্য হয়ে যাবে—আমরা কি এমন একটি নীতি প্রতিষ্ঠা করতে চাই? যদি তা-ই হয়, তাহলে একসময় রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালনা করাই অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে। 

একজন সৎ কর্মকর্তা তখন নিজেকেই প্রশ্ন করতে পারেন: আমি কেন হস্তক্ষেপ করব? কেন একটি অজনপ্রিয় বিধান কার্যকর করতে যাব? কেন একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির মুখোমুখি হব? দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে রাষ্ট্র যদি আমাকে রক্ষা করতে না পারে, তাহলে আমি কেন দায়িত্ব নেব? প্রতিষ্ঠান এভাবেই ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে—আইন বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার কারণে নয়, বরং আইন বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা মানুষগুলো তাঁদের বোধ কর্তৃত্ব প্রয়োগ করতে ভয় পতে শুরু করার কারণে। একটি কার্যকর রাষ্ট্রের উচিত সরকারি কর্মচারীদের জন্য যথাযথ আইনি প্রতিকারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, যাতে নিজেদের সুরক্ষার জন্য তাঁদের কখনো সম্মিলিতভাবে কাজ বন্ধ করার মতো পথে যেতে না হয়। 

এবার আসা যাক ঘটনার তৃতীয় অংশে—মেজর আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মামলা এবং পরবর্তী সময়ে তাঁর গ্রপ্তার। আমি আইন বিশেষজ্ঞ নই এবং তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো শেষ  পর্যন্ত আইনের বিচারে টিকবে কি না, সে সিদ্ধান্ত দেওয়ার চেষ্টাও করছি না। শুধু একটি এফআইআর দায়ের হয়েছে বলেই কাউকে দোসী ধরে নেওয়াও উচিত নয়। কিন্তু একটি অত্যন্ত সাধারণ প্রশ্ন করতেই হয়: সিভিল এভিয়েশনের যেসব কর্মকর্তা নিজেদের ক্ষতিগ্রস্ত বা সংক্ষুব্ধ মনে করছেন, তাঁদের কি অন্য যেকোনো নাগরিকের মতো আইনের আশ্রয় নেওয়ার সমান অধিকার নই? 

একজন সাধারণ নাগরিক যদি মনে করেন কেউ তাকে হুমকি দিয়েছে বা তাঁর ওপর হামলা করেছে, তাহলে পুলিশের কাছে গিয়ে অভিযোগ করার অধিকার তার রয়েছে। তিনি সরকারি কর্মচারী হলেই কেন সেই অধিকার হারাবেন? আর যার বিরুদ্ধে অভিযোগ করছেন তিনি একজন প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ হলেই বা কেন সেই অধিকার বিলুপ্ত হয়ে যাবে? অভিযোগকারীর অভিযোগ করার অধিকার রয়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার রয়েছে। পুলিশের দায়িত্ব তদন্ত করা। আর আদালতের দায়িত্ব তার সামনে উপস্থাপিত বিষয়ের বিচার করা। মামলা দায়ের হওয়া কাউকে দোষী প্রমাণ করে না। 

আবার রাজনৈতিক প্রভাবও কাউকে অভিযোগের ঊর্ধ্বেনিয়ে যায় না। আইনের দৃষ্টিতে সমতার অর্থই তা এটাই। এই কারণেই জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের প্রতিক্রিয়াটিও সর্তকতার সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার।

আখতারুজ্জামান গ্রেপ্তার হওয়ার পর ডা. শফিকুর তার অবিলম্বে মুক্তি এবং যে মামলাটিকে তিনি ‘সাজানো মামলা’ বলে অভিহিত করেছেন, সেটি প্রত্যাহারের দাবি জানান। তিনি আরও বলেন, আখতারুজ্জামান কাউকে শারীরিকভাবে আঘাত করেননি এবং পরবর্তী সময়ে তাকে ক্ষুব্ধ যাত্রীদের প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর হিসেবেও বর্ণনা করেন। জামায়াতের আমির অবশ্যই তাঁর দলের একজন সহকর্মীর পক্ষে কথা বলতে পারেন। অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন তোলা, গ্রপ্তারের সমালোচনা করা কিংবা মামলাটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে যুক্তি দেওয়ার অধিকারও তার রয়েছে। কিন্তু মামলা প্রত্যাহারের দাবি একটি ভিন্ন এবং আরও মৌলিক প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে: যারা নিজেদের সংক্ষুব্ধ মনে করছেন, তাদের আইনি অধিকারের কী হবে? সিভিল এভিয়েশনের কোনো কর্মকর্তা যদি মনে করেন যে তাকে বা তার সহকর্মীদের হুমকি দেওয়া হয়েছে, ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে কিংবা আক্রমণ করা হয়েছে, তাহলে অন্য যেকোনো নাগরিকের মতো তারও কি পুলিশের কাছে যাওয়ার অধিকার নই? 

জনাব আখতারুজ্জামান বিমানবন্দরের প্রকৃত অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছিলেন—এই যুক্তিতে যদি বলা হয় যে মামলাটি এগোনো উচিত নয়, তাহলে কার্যত ওই কর্মকর্তার জন্য অন্য সবার মতো আইনি সুরক্ষা পাওয়ার সুযোগ অস্বীকার করার ঝুঁকি তৈরি হয়। আর সেখানেই একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে আসে: রাজনৈতিক নেতারা কি আইনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার ঊর্ধ্বে থাকবেন? মেজর আখতারুজ্জামান (অবঃ) যদি কোনো বেআইনি কাজ না করে থাকেন, তদন্তেই তা প্রমাণিত হোক। প্রমাণ পরীক্ষা করা হোক। সাক্ষীদের বক্তব্য নেওয়া হোক। ভিডিওসহ প্রাসঙ্গিক সব উপাদান বিবেচনা করা হোক। তার আইনজীবীরা তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ সুযোগ দিন। অভিযোগ প্রমাণিত না হলে তিনি আইনের পূর্ণ সুরক্ষা পাবেন। কিন্তু একই আইন সেই কর্মকর্তাদেরও সুরক্ষা দিতে হবে, যারা মনে করছেন তাদের হুমকি দেওয়া হয়েছে কিংবা তাদের ওপর হামলা হয়েছে। এক পক্ষের জন্য আইনের সুরক্ষা দাবি করে অন্য পক্ষকে আইনের আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ তেখেও বিরত করা যায় না। 

উল্লেখযোগ্যভাবে, ডা. শফিকুর রহমান নিজেই পরে বলেছেন, কোনো মানুষই ভুলের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। সেই নীতি নিশ্চয়ই এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট সবার ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত। বিমানবন্দরের কর্মকর্তারা ভুল করে থাকলে তদন্ত হোক। বিমানের কর্মীরা দায়িত্বে অবহেলা করে থাকলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক—বিমান ইতোমধ্যে সে প্রক্রিয়া শুরু করেছে। 

আর কোনো রাজনৈতিক নেতা যদি আইনসম্মত প্রতিবাদের সীমা অতিক্রম করে থাকেন, সেই অভিযোগও তদন্ত করা হোক। আইনের শাসনের সামঞ্জস্যপূণ প্রয়োগ বলতে এটিই বুঝায়। এখানে আরেকটি প্রশ্ন জামায়াতে ইসলামী—এবং প্রকৃতপক্ষে প্রতিটি রাজনৈতিক দলেরই—বিবেচনা করা উচিত। আজ যে দল বিরোধী অবস্থানে রয়েছে, কাল সেই দলই সরকারে থাকতে পারে। ধরা যাক, আগামী দিনে জামায়াত সরকার পরিচালনা করছে এবং তাদের কোনো মন্ত্রী, ঊর্ধ্বতন প্রশাসনিক কর্মকর্তা, বিমানবন্দরের কর্মকর্তা, চিকিৎসক কিংবা পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে বিরোধী দলের কোনো নেতা ঠিক একই ভাষায় ও একই শারীরিক ভঙ্গিতে আচরণ করলেন। জামায়াত কি তখনও একই ভাষা ও শারীরিক ভঙ্গিকে বৈধ গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ হিসেবে মনে নেবে? 

নাগরিকের মূল অভিযোগটি যৌক্তিক ছিল বলে কি তাদের কর্মকর্তার প্রতি হুমকিও উপেক্ষা করতে বলবে? সংক্ষুব্ধ কর্মকর্তাকে কি পুলিশের কাছে না যেতে বলা হবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোনো দল সরকারে আছে না বিরোধী দলে—তার ওপর গণতান্ত্রিক নীতি পরিবর্তিত হতে পারে না। আইনের শাসনের প্রতি একটি রাজনৈতিক দলের অঙ্গীকারের প্রকৃত পরীক্ষা শুধু এই নয় যে তারা প্রতিপক্ষের কাছ থেকে কী ধরনের আচরণ প্রত্যাশা করে; বরং নিজের দলের সদস্যদেরও অন্য সবার জন্য দাবি করা একই আইনি প্রক্রিয়ার অধীন করতে তারা প্রস্তুত কি না। 

সুতরাং বিমানবন্দরের এই ঘটনা শুধু ট্রলির স্বল্পতা কিংবা জমজমের পানি পেতে বিলম্বের চেয়ে অনেক বড় একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে। প্রশ্নটি হলো—রাজনৈতিক প্রতিবাদের কোনো ভাষা ও পদ্ধতিকে আমরা বৈধতা দিতে প্রস্তুত? কোনো প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার হুমকিমূলক ভাষা ও দৃশ্যত শারীরিক ভীতি প্রদশনের মতো আচরণ যদি আজ শুধু এই কারণে গ্রহণযোগ্য হয়ে যায় যে তার মূল অভিযোগটি যৌক্তিক ছিল, তাহলে অন্যরাও ভবিষ্যতে একই পথ অনুসরণ করতে পারে। ধীরে ধীরে এটি একটি প্রতিষ্ঠিত রীতিতে পরিণত হওয়ার বাস্তব আশঙ্কা রয়েছে—অর্থাৎ কেউ নিজেকে সংক্ষুব্ধ মনে করলেই এ ধরনের আচরণ প্রতিবাদের স্বীকৃত ভাষা হয়ে উঠতে পারে। 

সরকারি হাসপাতালে মানুষ দুর্ভোগের শিকার হয়। বিদ্যুৎ সমস্যায় মানুষ কষ্ট পায়। ভূমি অফিস, পাসপোর্ট অফিস, থানা, কাস্টমসসহ সরকারের আরও বহু প্রতিষ্ঠানে মানুষ নানা সমস্যার সম্মুখীন হয়। প্রতিটি যৗক্তিক অভিযোগই কি একই ধরনের আচরণের অনুমতি দিবে? যদি না দেয়, তাহলে কোথাও একটি স্পষ্ট সীমারেখা টানতেই হবে। নাগরিকের প্রশাসনিক ব্যর্থতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার অধিকার রয়েছে। সরকারি কর্মকর্তারও হুমকি ও ভীতি ছাড়া নিজের দায়িত্ব পালনের অধিকার রয়েছে।

কোনো কর্মকর্তা দায়িত্বে ব্যর্থ হলে তাকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। আবার কোনো নাগরিক বা রাজনীতিবিদ আইনসম্মত প্রতিবাদের সীমা অতিক্রম করলে তাকেও আইনের আওতায় আসতে হবে। এই নীতিগুলো পরস্পরবিরোধী নয়; বরং একে অপরকে শক্তিশালী করে। এই ঘটনাটি সেই মানদণ্ড প্রতিষ্ঠার একটি সুযোগও এনে দিয়েছে। কেন পর্যাপ্ত ট্রলি ছিল না—তদন্ত করা হোক। যাত্রীদের ব্যাগেজ ও জমজমের পানির জন্য এত দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হলো কেন—তদন্ত করা হোক। দায়িত্বে অবহেলা করা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। 

একই সঙ্গে ভীতি প্রদর্শন, হুমকি ও হামলার অভিযোগও নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করা হোক। এরপর কোনো পক্ষের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়াই আইনকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দেওয়া হোক। বিষয়টি কখনোই যাত্রী বনাম সিভিল এভিয়েশন কর্মকর্তা কিংবা সরকার বনাম জামায়াতে ইসলামী—এমন একটি দ্বন্ধে পরিণত হওয়া উচিত নয়। এর চেয়ে অনেক মৌলিক একটি প্রশ্ন এখানে জড়িত: আমরা কেমন সমাজ গড়তে চাই? একটি গণতান্ত্রিক সমাজে এমন নাগরিক প্রয়োজন, যারা কর্তৃপক্ষকে প্রশ্ন করতে ভয় পান না। আবার একটি কার্যকর রাষ্ট্রের জন্য এমন সরকারি কর্মচারীও প্রয়োজন, যারা তাদের আইনসম্মত দায়িত্ব পালন করতে ভয় পান না। তাই সবার অধিকারই আমাদের রক্ষা করতে হবে। ভীতি প্রদর্শন নয়—প্রতিবাদ হোক। অহংকার নয়—কর্তৃত্ব হোক দায়িত্বশীল। রাজনৈতিক পক্ষপাত নয়—জবাবদিহি হোক সবার। আর বিচার হোক আইন অনুযায়ী।

লেখক : সাবেক সেনা কর্মকর্তা

কেকে/এআই


আরও সংবাদ   বিষয়:  প্রতিবাদ   অধিকার   আইন   শ্রদ্ধা  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close