আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে শেষ ম্যাচ খেলার আগে বিরল সম্মানে ভূষিত হয়েছেন লিওনেল মেসি। বেনিনের বিপক্ষে বিদায়ী ম্যাচে মাঠে নামার কয়েক মিনিট আগে আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যবাহী ক্লাব রিভার প্লেট তাকে সম্মানসূচক সদস্যপদ দেয়।
ম্যাচটি শেষ হয়েছে মেসির জন্য স্মরণীয় এক জয় দিয়ে। বেনিনকে ৩-০ গোলে হারানোর ম্যাচে একটি গোল ও দুটি অ্যাসিস্ট করেছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা। বিদায়ী ম্যাচে এমন পারফরম্যান্সের পর রিভার প্লেটের দেওয়া সম্মাননাও তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়কে করেছে আরও আবেগঘন।
রিভার প্লেটের সম্মানসূচক সদস্য মেসি
বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচ শুরুর আগে রিভার প্লেটের প্রেসিডেন্ট স্তেফানো দি কার্লো নিজ হাতে মেসির কাছে সম্মানসূচক সদস্যপদ কার্ড তুলে দেন। একই সঙ্গে তার হাতে তুলে দেওয়া হয় একটি স্মারক ফলক এবং বিশেষ একটি জার্সি।
বুয়েনস আয়ার্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি পাওয়ার পর মেসি যান মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ে। সেখানেই রিভার প্লেটের কাছ থেকে এই বিশেষ সম্মান গ্রহণ করেন তিনি।
মেসির জন্য ‘পবিত্র জার্সি’
রিভার প্লেট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেসিকে সম্মান জানানোর বিষয়টি প্রকাশ করে। ক্লাবটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, ঐতিহাসিক এই দিনে সভাপতি স্তেফানো দি কার্লোর সঙ্গে থাকা মেসিকে এমন একটি সদস্যপদ কার্ড দেওয়া হয়, যা তাকে ক্লাবের সম্মানসূচক সদস্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
একই সঙ্গে দেওয়া হয় একটি স্মারক ফলক এবং মেসির নাম লেখা ‘পবিত্র জার্সি’। ক্লাবটি মেসিকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছে, ‘ফুটবলের জন্য ধন্যবাদ, লিওনেল মেসি।’
রিভার প্লেটের এই সম্মান শুধু আনুষ্ঠানিক সদস্যপদ দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচের দিন বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলারের প্রতি নিজেদের শ্রদ্ধাও প্রকাশ করেছে ক্লাবটি।
সদস্যপদ কার্ডে বিশ্বকাপ জয়ের স্মৃতি
মেসিকে দেওয়া সম্মানসূচক সদস্যপদ কার্ডেও রাখা হয়েছিল বিশেষত্ব। সাধারণত সদস্যপদ কার্ডে যে নম্বর থাকার কথা, সেখানে লেখা হয় ‘ARG18122022’।
এই কোডের মাধ্যমে স্মরণ করা হয়েছে ২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বরের সেই ঐতিহাসিক দিনকে, যেদিন কাতারে আর্জেন্টিনা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল।
মেসির হাতে তুলে দেওয়া স্মারক ফলকেও ছিল বিশেষ বার্তা। সেখানে তাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন এবং আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে মনুমেন্টালে অপরাজিত খেলোয়াড় হিসেবে উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি তাকে ফুটবলের কিংবদন্তি ও জাতীয় ক্রীড়ার চূড়ান্ত প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করে সম্মানসূচক সদস্য করার ঘোষণা দেয় রিভার প্লেট।
রিভার প্লেট ও মেসির সম্পর্কের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। রিভার প্লেটের ঘরের মাঠ এস্তাদিও মনুমেন্টালে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে মেসি কাটিয়েছেন অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত।
এই মাঠে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচ, প্রীতি ম্যাচ এবং আর্জেন্টিনার হয়ে জেতা চারটি শিরোপা উদ্যাপনের স্মৃতিও রয়েছে তার। মনুমেন্টালে মেসির গোলসংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। তার ক্যারিয়ারে যে চারটি স্টেডিয়ামে তিনি সবচেয়ে বেশি গোল করেছেন, মনুমেন্টাল তার একটি।
বেনিনের বিপক্ষে বিদায়ী ম্যাচের আগে এই মাঠে আর্জেন্টিনার হয়ে খেলা ২৮ ম্যাচে কখনো হারেননি মেসি। শেষ ম্যাচেও সেই রেকর্ড অক্ষুণ্ন রেখেছেন তিনি। বেনিনকে ৩-০ গোলে হারিয়ে মনুমেন্টাল থেকেই আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানিয়েছেন আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি।
মেসি ও রিভার প্লেটের সম্পর্কের ইতিহাস আরও পুরোনো। ২০০০ সালে, তখন তার বয়স মাত্র ১৩ বছর, বার্সেলোনায় যাওয়ার কিছুদিন আগে মেসি খুব কাছাকাছি চলে গিয়েছিলেন রিভার প্লেটের হয়ে খেলার।
২০১৯ সালে ফক্স স্পোর্টসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সেই সময়ের কথা স্মরণ করেছিলেন মেসি। তিনি জানিয়েছিলেন, একটি ছেলে রিভারে যাওয়ার সময় তাকে জিজ্ঞেস করেছিল, সে কি সঙ্গে যেতে চায় কি না। মেসিও রাজি হয়ে তার সঙ্গে গিয়েছিলেন।
রিভারে গিয়ে নিজের বয়সী খেলোয়াড়দের সঙ্গে খেলেছিলেন মেসি এবং তিন-চারটি গোলও করেছিলেন। এরপর তাকে সেখানে থেকে যাওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
মেসির ভাষ্য অনুযায়ী, তখন তাকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে আসতে বলা হয়েছিল। তার চিকিৎসার বিষয়টিও আলোচনায় আসে এবং রিভার প্লেটের পক্ষ থেকে চিকিৎসায় সহযোগিতা করার কথাও বলা হয়েছিল।
তবে শেষ পর্যন্ত মেসির ফুটবলযাত্রা রিভারে থেমে থাকেনি। বার্সেলোনায় গড়ে ওঠে তার কিংবদন্তি ক্যারিয়ার।
মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ দিনটি তাই ছিল সম্মান, আবেগ ও সাফল্যে ভরা। ম্যাচের আগে রিভার প্লেটের সম্মানসূচক সদস্যপদ, স্মারক ফলক ও বিশেষ জার্সি পাওয়ার পর মাঠে নেমে বেনিনের বিপক্ষে গোল ও দুটি অ্যাসিস্ট করেন তিনি।
শেষ পর্যন্ত ৩-০ গোলের জয় নিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানান মেসি। রিভার প্লেটের দেওয়া সেই কার্ডে বিশ্বকাপ জয়ের তারিখ, স্মারক ফলে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে স্বীকৃতি এবং নাম লেখা বিশেষ জার্সি—সবকিছু মিলিয়ে বিদায়ের দিনটি হয়ে ওঠে মেসির দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের এক আবেগঘন সমাপ্তি।
কেকে/ এমএস