বিশ্বজুড়ে বৈদেশিক উন্নয়ন সহায়তা বা অনুদান দেখা দিয়েছে নজিরবিহীন ধস। জাতীয় নিরাপত্তার অগ্রাধিকার পরিবর্তন, প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন দাতা সংস্থার দপ্তর গুটিয়ে নেওয়ার কারণে আন্তর্জাতিক অনুদান প্রবাহ ঐতিহাসিক সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
এ বৈশ্বিক ধাক্কা সরাসরি এসে পড়ছে বাংলাদেশের সামাজিক উন্নয়ন ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর (এনজিও) ওপর। বিশেষ করে যেসব এনজিও শুধু বৈদেশিক অনুদানের ওপর নির্ভর করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও বিশুদ্ধ পানির মতো মৌলিক সামাজিক সেবা প্রদান করে আসছিল, তারা চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) ‘বিদেশ-নির্ভরতা পেরিয়ে :
বাংলাদেশে এনজিও অর্থায়নের ভবিষ্যৎ’ শিরোনামের এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকার আগারগাঁওয়ে বিআইডিএসের সম্মেলনকক্ষে গবেষণার সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা পরিচালক কাজী ইকবাল।
বৈদেশিক অনুদান সংকোচনের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে রয়েছে দেশের প্রায় ২ হাজার ২০০ ছোট ও মাঝারি এনজিও। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠানের ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম নেই এবং যারা প্রায় পুরোপুরি বিদেশি অনুদানের ওপর নির্ভরশীল, তাদের আর্থিক সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নতুন প্রকল্পের প্রবাহ কমে যাওয়া এবং পুরোনো প্রকল্পের অর্থ শেষ হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম, কর্মসংস্থান ও সেবাদান সক্ষমতার ওপরও চাপ বাড়তে পারে।
এক বছরে বিদেশি সহায়তা কমেছে ২৩ শতাংশ :
বিআইডিএসের গবেষণায় বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে বৈদেশিক উন্নয়ন সহায়তা দ্রুত কমছে। ২০২৫ সালে ধনী দেশগুলোর সরকারি উন্নয়ন সহায়তা (ওডিএ) প্রকৃত মূল্যে ২৩ শতাংশ কমেছে, যা এক বছরে সহায়তা কমার সর্বোচ্চ হার। যুক্তরাষ্ট্র তাদের বৈদেশিক সাহায্য সংস্থা ইউএসএআইডির কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে। একইসঙ্গে যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও ফ্রান্স আগামী কয়েক বছরের জন্য সহায়তার বাজেট কমিয়ে প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়ানোর দিকে যাচ্ছে। ফলে বৈদেশিক সহায়তায় সাম্প্রতিক এ সংকোচন দ্রুত আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা কম।
বাংলাদেশে এর পুরো অভিঘাত এখনো দৃশ্যমান হয়নি। এর অন্যতম কারণ, আগে অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর অর্থ এখনো ছাড় হচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আগের অনুমোদিত প্রকল্পের বিপরীতে ১০ হাজার ১৪৩ কোটি টাকা ছাড় হয়েছে। তবে নতুন প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে যেখানে ২ হাজার ৬১টি নতুন প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছিল, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে ১ হাজার ৬৫৪টিতে নেমে এসেছে।
সবচেয়ে ঝুঁকিতে অনুদাননির্ভর এনজিও : ৪৬টি এনজিওর ওপর পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, বিদেশি অনুদাননির্ভর সেবাধর্মী এনজিওগুলোর বাজেট গড়ে ৪০ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম থাকা এনজিওগুলোর বাজেট কমেছে প্রায় ১২ শতাংশ। অর্থাৎ যেসব এনজিওর নিজস্ব আয় বা ক্ষুদ্রঋণভিত্তিক অর্থের উৎস রয়েছে তারা তুলনামূলকভাবে সংকট সামাল দিতে পারছে। কিন্তু অনুদাননির্ভর ছোট ও মাঝারি এনজিওগুলোর বিকল্প অর্থের উৎস সীমিত। এ কারণে প্রায় ২ হাজার ২০০ প্রতিষ্ঠান সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
অর্থের সংকট দেখা দিলে প্রথম ধাক্কা মাঠপর্যায়ের সামাজিক সেবায় পড়তে পারে। স্থায়ী ব্যয় বহাল থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মসূচি কমিয়ে দিতে বা কর্মী সংখ্যা কমাতে বাধ্য হতে পারে। কেউ কেউ টিকে থাকার জন্য সামাজিক কার্যক্রম কমিয়ে ক্ষুদ্রঋণ বা আয়মূলক কার্যক্রমে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারে। এতে প্রত্যন্ত অঞ্চলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হওয়া এনজিওগুলোর যোগাযোগ ও সেবা দেওয়ার সক্ষমতা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সরকারের অর্থে এনজিওকে যুক্ত করার প্রস্তাব :
সংকট মোকাবিলায় চারটি বিকল্প অর্থায়নের পথের কথা গবেষণায় বলা হয়েছে। এগুলো হলো—সরকারি ব্যয় ও প্রকল্পে এনজিওকে যুক্ত করা, করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার (সিএসআর) অর্থ ব্যবহার, সামাজিক ব্যাবসা এবং নতুন ধরনের অর্থায়ন ব্যবস্থা।
গবেষকদের মতে, এসব বিকল্পের মধ্যে বড় পরিসরে অর্থ জোগানের সক্ষমতা মূলত সরকারেরই রয়েছে। বিদেশি অনুদানের পরিমাণ বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির মাত্র ৩ দশমিক ৪ শতাংশের সমান। ২০২৫ সালের সরকারি ক্রয়বিধিতে সরকারি সেবা প্রদানে এনজিওকে যুক্ত করার সুযোগ রাখা হলেও বাস্তবে এ সুযোগ খুব কম ব্যবহার করা হচ্ছে।
গবেষণায় সরকার ও এনজিওর যৌথভাবে সেবা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গবেষকদের মতে, এনজিওগুলোর প্রত্যন্ত এলাকায় পৌঁছানোর সক্ষমতা, স্থানীয় জনগোষ্ঠী সম্পর্কে জ্ঞান এবং সেবা গ্রহণে মানুষকে সম্পৃক্ত করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। ফলে কিছু সেবা সরকার একা দেওয়ার পরিবর্তে এনজিওকে সঙ্গে নিয়ে দিলে ব্যয় কমানোর পাশাপাশি সেবার কার্যকারিতাও বাড়তে পারে।
সিএসআরেও কমছে অর্থ :
বিদেশি অনুদানের বিকল্প হিসেবে সিএসআরকে গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে দেখা হলেও এখানেও সংকোচন দেখা দিয়েছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, ব্যাংকগুলোর সিএসআর ব্যয় ২০২৫ সালে ৩৪৫ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। ফলে বিদেশি অনুদানের বড় ঘাটতি এককভাবে সিএসআর দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়।
সামাজিক ব্যবসা ও নতুন আর্থিক ব্যবস্থাও বিকল্প হতে পারে। তবে, ছোট এনজিওগুলোর ক্ষেত্রে বন্ড বা ফলভিত্তিক অর্থায়নের মতো ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় জামানত, ঋণ পোর্টফোলিও ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে।
যোগ্য এনজিওর তালিকার সুপারিশ :
সংকট মোকাবিলায় যোগ্য এনজিওগুলোর একটি উন্মুক্ত তালিকা তৈরির সুপারিশ করেছে বিআইডিএস। তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারি ক্রয়, সিএসআরসহ বিভিন্ন তহবিল ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া সরকারি ক্রয়বিধিতে এনজিওকে সেবা প্রদানকারী হিসেবে যুক্ত করার বিধান কার্যকর করতে আলাদা নির্দেশিকা তৈরির সুপারিশ করা হয়েছে। ছোট ও মাঝারি এনজিওর জন্য এনজিও ফাউন্ডেশন ও পিকেএসএফের মাধ্যমে তহবিল গঠন, সিএসআর নীতিতে যোগ্য বাস্তবায়নকারী সংস্থা ও নির্দিষ্ট অর্থ বরাদ্দ এবং সামাজিক ব্যাবসার আইনি স্বীকৃতি ও কর সুবিধা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমে এনজিওগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ানো গেলে একদিকে তাদের অর্থায়নের বিকল্প তৈরি হবে, অন্যদিকে উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিও আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, মানব উন্নয়ন, স্থানীয় সংস্কৃতি রক্ষা ও বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণে একটি সমন্বিত কাঠামো দরকার। সৃজনশীল অর্থনীতিসহ নানা ক্ষেত্রে এনজিওসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ইতোমধ্যে কাজ করছেন। এই অংশীদারত্বকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও নীতিগত রূপ দেওয়া প্রয়োজন।
এনজিও, বেসরকারি খাত ও সরকারের মধ্যে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়ে মন্ত্রী বলেন, সরকারের সার্বিক সেবা সরাসরি প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে এনজিওর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কেকে/ এমএস