সীমান্তে ফের অস্থিরতা ছড়ানোর পাঁয়তারা করছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী-বিএসএফ। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের তিন জেলার সীমান্ত দিয়ে একাধিক পুশইনের চেষ্টা করেছিল। তবে স্থানীয় ও বিজিবির প্রতিরোধে ব্যর্থ হয় তারা।
মঙ্গলবার জয়পুরহাটের রামকৃষ্ণপুর সীমান্ত দিয়ে ৩ যুবককে ফেলে দেয় বিএসএফ। পরে তাদের ভারতে ফেরত পাঠায় বিজিবি। এ ছাড়া গতকাল বিকেলে দিনাজপুরের ফুলবাড়ী সীমান্ত দিয়ে এক নারী ও দুই শিশুকে পুশইনের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু বিজিবির তৎপরতায় তাদের পুশইন করতে পারেনি বিএসএফ। তারা বর্তামে শূন্যরেখায় অবস্থান করছে। অন্যদিকে ভারত থেকে পুশইনের শিকার হয়ে পঞ্চগড়ে আসা ছয় বাংলাদেশি নাগরিককে আটক করেছে পুলিশ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেন, বাংলাদেশ বিষয়ে বিভ্রান্তিমূলক অবস্থান নিয়েছে ভারত। দেশটি প্রকাশ্যে বলছে ঢাকার সঙ্গে তারা সুসম্পর্ক চায়। কিন্তু সীমান্তে বিএসএফের আচরণ সম্পূর্ণ বৈরী। ভারতের এ দ্বিমুখী আচরণ দেশটির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহের জন্ম দিয়েছে।
জয়পুরহাট সীমান্ত :
জয়পুরহাট সদর উপজেলার পশ্চিম রামকৃষ্ণপুর সীমান্ত দিয়ে তিন যুবককে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। পরে তারা সীমান্তের প্রায় দুই কিলোমিটার ভেতরে কড়িয়া বাজারে চলে এলে স্থানীয় লোকজন তাদের আটক করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে (বিজিবি) খবর দেন। একপর্যায়ে বিজিবির সদস্যরা ওই যুবকদের ২৭৬ নম্বর মূল পিলারের কাছে নিয়ে গিয়ে ভারতীয় সীমান্তের ভেতরে পাঠিয়ে দেন। গতকাল সকালে এ ঘটনা ঘটে।
বিজিবি-১৪ পত্নীতলা ব্যাটালিয়নের কড়িয়া ক্যাম্প ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে ২৭৬ নম্বর মূল পিলার দিয়ে বিএসএফ ওই তিন যুবককে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়। পরে তারা কড়িয়া বাজারে চলে আসেন। স্থানীয় লোকজন তাদের আটক করে বিজিবিকে খবর দেন।
এ ঘটনায় বিএসএফ-১২৩ ব্যাটালিয়নের দুর্গাপুর ক্যাম্প ও বিজিবি-১৪ পত্নীতলা ব্যাটালিয়নের কড়িয়া ক্যাম্পের মধ্যে বেলা ১১টার দিকে পতাকা বৈঠক হয়। তবে বৈঠকে বিষয়টির কোনো সুরাহা হয়নি।
শূন্যরেখায় নারী ও শিশু :
গতকাল বিকেলে দিনাজপুরের ফুলবাড়ী সীমান্তে এক নারী ও শিশুকে পুশইন করেছে বিএসএফ। তবে বিজিবি ও স্থানীয়দের তৎপরতায় তারা সীমান্তের শূন্যরেখা সংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করছে বলে জানা গেছে।
গতকাল ভোর সাড়ে ৫টার দিকে ফুলবাড়ী উপজেলার এলুয়াড়ী ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের জলপাইতলী বিজিবি ক্যাম্পসংলগ্ন সীমান্তে মেইন পিলার ৩০-এর ৫ সাব পিলার থেকে ২০ গজ দূরে ভারতের জাকিরপুর এলাকা দিয়ে ওই নারী ও শিশুকে বাংলাদেশে পাঠানো হয়।
পুশইনের শিকার দুজন হলেন ভারতের আজমির জেলার দারোগাবাজার থানার আন্দারকোট গ্রামের মুহিন ইসলামের স্ত্রী সুলতানা বেগম (৪০) ও তার মেয়ে আলেয়া (৮)। তাদের কাছে ভারতীয় আধার কার্ড রয়েছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ভোরে বিএসএফ শূন্যরেখায় মারধর করে এক শিশুসহ দুইজনকে বাংলাদেশে পুশইন করে। পরে বিষয়টি টের পেলে স্থানীয়রা বিজিবিকে খবর দেয়। পরে বিজিবি ও স্থানীয়দের তৎপরতায় তারা শূন্যরেখায় অবস্থান নেয়।
২৯ বিজিবির অধিনায়ক জানান, ভোরে বিএসএফ দুইজন ভারতীয়কে পুশইনের চেষ্টা করে। তবে বিজিবি ও স্থানীয় জনগণের তৎপরতায় তা ভেস্তে যায়। বর্তমানে তারা শূন্য রেখায় অবস্থান করছে। এ ব্যাপারে বিজিবি ও বিএসফের মধ্যে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
পুশইন হওয়া ৬ বাংলাদেশি আটক :
গতকাল বিকেলে ভারত থেকে পুশইনের শিকার হয়ে পঞ্চগড়ে আসা ছয় বাংলাদেশি নাগরিককে আটক করেছে পুলিশ।
আটক ব্যক্তিরা হলেন সুনামগঞ্জের রঙ্গারচর বিন্দাবননগর এলাকার বাচ্চু মিয়া (৬০), তার স্ত্রী আমিনা বেগম (৫৫), মেয়ে দিলারা বেগম (৩০), সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চরারবাজার এলাকার জামাতা মফিজ উদ্দিন (৩২), সুনামগঞ্জের কোম্পানীগঞ্জের কান্দিসুমতনগর এলাকার সুমন মিয়া (২০) এবং তার ফুফাতো ভাই সজিব মিয়া (১৯)।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে আটক ব্যক্তিরা জানান, তারা সুনামগঞ্জের সীমান্ত এলাকা দিয়ে দালালচক্রের মাধ্যমে অবৈধ পথে ভারতে যান। এ জন্য প্রত্যেকে দালালদের ১৫ হাজার টাকা করে দেন। পরে ভারতের কাশ্মীরের শ্রীনগর এলাকায় ফলের বাগানসহ বিভিন্ন স্থানে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন তারা।
তারা আরও জানান, প্রায় পাঁচ থেকে ছয় মাস আগে ভারতীয় পুলিশের হাতে আটক হয়ে তারা কারাগারে যান। সম্প্রতি কারাগার থেকে তাদের বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করা হয়। গতকাল ভোরে বিএসএফ তাদের পঞ্চগড়ের কোনো একটি সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পুশইন করে।
সীমান্ত পেরিয়ে পঞ্চগড় জেলা শহরে এসে তারা একটি হোটেলে নাস্তা করেন। পরে বিকাশের মাধ্যমে টাকা এনে শ্যামলী পরিবহনের কাউন্টার থেকে গাড়ির টিকিট বুক করতে গেলে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ তাদের আটক করে।
তবে ঠিক কোন সীমান্ত দিয়ে তাদের বাংলাদেশে পুশইন করা হয়েছে, তা বলতে পারেননি আটক ব্যক্তিরা। পুলিশের ধারণা, পঞ্চগড় জেলা শহরের কাছাকাছি কোনো সীমান্ত এলাকা দিয়ে তাদের বাংলাদেশে পুশইন করা হতে পারে।
পঞ্চগড় সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোখলেছুর রহমান বলেন,আটক ছয়জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তারা নিজেদের বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। তাদের পরিচয় যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কেকে/ এমএস