বাংলাদেশের অর্থনীতি কোন পথে হাঁটছে, বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’— তার একটি অস্বস্তিকর চিত্র তুলে ধরেছে। সংস্থাটির পূর্বাভাস, জ্বালানি সংকট, দুর্বল ব্যাংকিং খাত, কম রাজস্ব আহরণ ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার চাপে ২০২৬ ও ২০২৭ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে আসতে পারে। পূর্বাভাসের ধারাও উদ্বেগজনক।
২০২৫ সালের অক্টোবরে বিশ্বব্যাংক ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ৪ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির আভাস দিয়েছিল। এপ্রিলে তা নেমে আসে ৩ দশমিক ৯ শতাংশে, এখন আরও কমল। ২০২৩ সাল থেকে প্রবৃদ্ধির গতি ক্রমাগত কমছে। এটি সাময়িক ওঠানামা নয়, কাঠামোগত দুর্বলতার ফল। মন্দার মূল্য সবচেয়ে বেশি দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
২০২৬ অর্থবছরে প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। নতুন কর্মসংস্থান প্রায় থেমে গেছে, বিপুলসংখ্যক নারী কাজ হারিয়েছেন। উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে, ব্যবসার খরচও বেড়েছে। কাজ না থাকলে দারিদ্র্য কমবে না, আর দারিদ্র্য না কমলে অভ্যন্তরীণ চাহিদাও চাঙ্গা হবে না।
ব্যাংকিং খাতের অবস্থা আরও শঙ্কার। খেলাপি ঋণ ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬ সালের জুনে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ প্রতি তিন টাকার বেশি ঋণ ফেরত আসছে না। এতে ঋণপ্রবাহ আটকে যাচ্ছে, বিনিয়োগকারীর আস্থাও ক্ষয়ে যাচ্ছে। ব্যাংক দুর্বল থাকলে কোনো সংস্কারই বিনিয়োগে রূপ নেবে না।
রাজস্ব আহরণের দুর্বলতা আরও গভীর। রাজস্ব আদায় জিডিপির মাত্র ৮ দশমিক ৩ শতাংশ, যা বিশ্বের অন্যতম নিম্ন হার। ২০২৫ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ বছরে প্রথমবারের মতো ৭ শতাংশের নিচে নেমেছিল। রাজস্ব ঘাটতিও ৩ দশমিক ৫ থেকে বেড়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হয়েছে। রাষ্ট্রের আয় এত কম হলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষায় বিনিয়োগ করা কঠিন। জ্বালানি সংকট আর মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে শিল্প উৎপাদন ও রপ্তানিও চাপে।
রেমিট্যান্স ও রিজার্ভের কারণে বাহ্যিক খাতে কিছুটা স্থিতিশীলতা এসেছে ঠিকই, কিন্তু প্রবাসী আয়ে অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ঢাকা যায় না। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, জ্বালানি সরবরাহ ঠিক হলে এবং সংস্কার দ্রুত এগোলেও ২০২৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশে উঠতে পারে। অর্থাৎ সংস্কারের সুফল রাতারাতি আসবে না; যত দেরি, মূল্য তত বেশি।
আঞ্চলিক তুলনায় ছবিটা আরও স্পষ্ট। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ চাহিদার কারণে চলতি বছর দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে। বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি তার অর্ধেকেরও কম। বিশ্বব্যাংক আগেই বলেছিল, নির্বাচনের পর টেকসই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও দ্রুত সংস্কার অর্থনীতির জন্য শক্তিশালী পুনরুদ্ধারের ভিত্তি গড়তে পারে। সেই সুযোগ হারানো চলবে না।
সামাজিক সুরক্ষায়ও বড় ফাঁক আছে। প্রায় অর্ধেক দরিদ্রতম পরিবার এখনো কোনো কর্মসূচির আওতায় নেই। খাদ্যভিত্তিক ভর্তুকি একীভূত করে সুবিধাভোগী নির্বাচন করলে এবং ‘ফ্যামিলি কার্ড’ যুক্ত করলে অতিরিক্ত প্রায় ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করা সম্ভব।
আমরা মনে করি, এই পরিস্থিতিতে সরকারের কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি, প্রথমত খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র প্রকাশ করতে হবে, দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন ও ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। দ্বিতীয়ত করের আওতা সম্প্রসারণ, অপ্রয়োজনীয় অব্যাহতি কমানো ও কর প্রশাসনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
আমদানির উৎস বহুমুখী করা, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত নীতির অনিশ্চয়তা ও ব্যবসার খরচ কমানো এবং নারীর কর্মসংস্থান বাড়ানো। ‘ডাইনামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি’ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন। আমাদের এই মুহূর্তে আর দেরি করার সুযোগ নেই। সংস্কারের কথা অনেক হয়েছে; এবার দরকার সুস্পষ্ট সময়সীমাসহ বাস্তবায়ন ও জবাবদিহি। তবেই আসন্ন সংকট থেকে আমাদের মুক্তি মিলবে।
কেকে/ এমএস