বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬,
২২ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম: ● নিয়ন্ত্রণহীন সিলিন্ডারের বাজার       ● বিদায়ী ম্যাচে মেসির গোল-অ্যাসিস্ট, আর্জেন্টিনার বড় জয়      ● অক্টোবরে ৫ দিনেই ৫১৩ মিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স      ● ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় ১০ মৃত্যু, মোট প্রাণহানি ২৮১      ● হাম উপসর্গে আরও ৬ জনের মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ১৩৯৩      ● ভুল ধরিয়ে দেব, সংশোধন না হলে প্রতিরোধ: গোলাম পরওয়ার      ● জাপান সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
মৃত্যুফাঁদে স্বপ্নের প্রলোভন, সুনামগঞ্জে মানবপাচার চক্র
রাসেল আহমদ
প্রকাশ: বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:৩৭ পিএম

সুনামগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের তরুণদের কাছে ইউরোপ এখনো উন্নত জীবনের প্রতীক। কর্মসংস্থানের সংকট, দারিদ্র্য, সামাজিক মর্যাদা অর্জনের আকাঙ্ক্ষা এবং দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নতির স্বপ্ন অনেককে বৈধ পথ এড়িয়ে অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কিন্তু এই স্বপ্নের পথ ক্রমেই পরিণত হচ্ছে মৃত্যু, নির্যাতন ও সর্বস্ব হারানোর এক ভয়াবহ ফাঁদে। 

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমান্ত ও উপকূলরক্ষী সংস্থা ফ্রন্টেক্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতা- ইউরোপে অবৈধভাবে প্রবেশের সংখ্যা সামগ্রিকভাবে কমলেও মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় রুটে এখনো বাংলাদেশিরাই শীর্ষে রয়েছে। 

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্যমতে, চলতি বছরেই ভূমধ্যসাগরে প্রায় ১ হাজার ৩০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; বরং বাংলাদেশের সামাজিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং মানবপাচার চক্রের নির্মমতার এক ভয়াবহ প্রতিচ্ছবি। সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের বাস্তবতা বিবেচনায় নিলে এই সামাজিক ক্ষতটি আরও স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। 

মৌসুমি কর্মসংস্থান, সীমিত শিল্পায়ন, পর্যাপ্ত কাজের অভাব এবং দ্রুত ভাগ্য বদলের ব্যাকুলতার কারণে এখানকার সহজ-সরল তরুণরা দালালচক্রের সহজ টার্গেটে পরিণত হচ্ছে। গত দুই বছরে শুধু সুনামগঞ্জ থেকেই অন্তত ২১৫ জন তরুণ লিবিয়ায় নির্যাতনের শিকার হয়ে নিঃস্ব অবস্থায় দেশে ফিরেছেন। 

চলতি বছরের মার্চে লিবিয়া থেকে গ্রিসগামী নৌকায় অন্তত ১৮ বাংলাদেশির মৃত্যুর ঘটনায় ১২ জনই ছিলেন সুনামগঞ্জের বাসিন্দা। সাগরে প্রাণ হারানোর এই ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই সম্প্রতি আবারও একাধিক তরুণের নিখোঁজ হওয়া জনমনে চরম উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

ভুক্তভোগীদের বর্ণনায় উঠে এসেছে অমানবিক নির্যাতন, জিম্মিদশা ও মুক্তিপণের জন্য পরিবারের ওপর অমানুষিক চাপের মতো ভয়ঙ্কর বাস্তবতা।

উদ্বেগের বিষয় হলো- বর্তমানে মানবপাচার শুধু সীমান্তপথের অপরাধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি প্রযুক্তিভিত্তিক ডিজিটাল অপরাধেও রূপ নিয়েছে। সংঘবদ্ধ আন্তর্জাতিক পাচার চক্রের পাশাপাশি দেশীয় দালালরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে বড় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। ফেসবুক, টিকটক কিংবা মেসেঞ্জারে ‘গেম’ নামের কোডওয়ার্ডে চালানো হচ্ছে মৃত্যুযাত্রার চটকদার বিপণন। ইতালির সুন্দর শহর, সমুদ্রসৈকত কিংবা ভুয়া সফলতার গল্প দেখিয়ে তরুণদের প্রলুব্ধ করা হচ্ছে। 

স্থানীয় ভাষায় ভিডিও তৈরি ও কৃত্রিম মন্তব্য সাজিয়ে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের সুপরিকল্পিত জাল বিছানো হচ্ছে। অথচ এই ঝকমকে প্রচারণার আড়ালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে লিবিয়ার বন্দিশিবিরের বিভীষিকা কিংবা ভূমধ্যসাগরের উত্তাল ঢেউয়ে ভেসে যাওয়া নিথর দেহের করুণ চিত্র।

অন্যদিকে, প্রবাসী নিয়োগে প্রতারণা, জালিয়াতিও এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাঠানোর কথা বলে ভুয়া ভিসা, ওয়ার্ক পারমিট ও জাল বিমান টিকিট দিয়ে প্রতারকচক্র ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। গ্রামের মানুষ জমিজমা বিক্রি করে, সুদে ঋণ নিয়ে কিংবা গবাদিপশু বিক্রি করে ৮ থেকে ১২ লাখ টাকা তুলে দিচ্ছে দালালদের হাতে। নথি জাল প্রমাণিত হলে দালালদের কাছে জমানো সর্বস্ব হারিয়ে পরিবারগুলো যেমন দেনার দায়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে, তেমনি সাগর কিংবা মরুভূমির পথে বন্দি ও নিহত হয়ে পরিবারগুলো আজীবনের কান্নায় দিনাতিপাত করছে। সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে নিখোঁজ ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলো দালালদের ভয়ভীতি ও সামাজিক চাপে মুখ খুলতেও সাহস পায় না।

মানবপাচার এখন আর শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর রুটিন বিষয় নয়; এটি জাতীয় পর্যায়ের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকট। এই মহামারি ঠেকাতে কেবল মামলা দায়ের করাই যথেষ্ট নয়।  প্রতারণা ও পাচার চক্রের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা (জিরো টলারেন্স) নীতি গ্রহণ করে মূল হোতা ও তাদের স্থানীয় সহযোগীদের দ্রুত তদন্ত ও দৃশ্যমান শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। চলমান মামলাগুলোর অগ্রগতি জনসম্মুখে তুলে ধরে অপরাধীদের কাছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি অবসানের স্পষ্ট বার্তা পৌঁছাতে হবে। 

প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা অত্যন্ত জরুরি। ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, গণমাধ্যম, সামাজিক সংগঠন ও ধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্ত করে নিয়মিত দিকনির্দেশনামূলক প্রচার চালাতে হবে।

অনিয়মিত সাগরযাত্রা বা দালালের খপ্পরে পড়া যে জীবন ধ্বংসের নামান্তর, তা তরুণদের স্পষ্টভাবে বোঝাতে হবে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষকে শেখাতে হবে কীভাবে সরকারি রিক্রুটিং এজেন্সি, ভিসা, নিয়োগপত্র ও ট্রাভেল ডকুমেন্ট যাচাই করতে হয়, যাতে নগদ টাকা ঢেলে জাল নথির প্রতারণায় কেউ সর্বস্ব না হারায়।

তবে কেবল দমনপীড়ন আর সচেতনতা বাড়িয়েই এই সংকট স্থায়ীভাবে নিরসন করা যাবে না। তরুণরা কেন মৃত্যুর ঝুঁকি নিচ্ছেন, সেই মূল কারণ তথা বেকারত্ব দূর করতে হবে। বিদেশে বৈধ ও নিরাপদ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, বিশেষ করে কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার সরকারি উদ্যোগগুলো দ্রুত ও সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা আবশ্যক। প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোকে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের আধুনিক চাহিদা অনুযায়ী ঢেলে সাজাতে হবে- যেখানে ভাষা শিক্ষা, টেকনিক্যাল স্কিল ও পেশাগত আচরণের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।

সরকার নিয়ন্ত্রিত বৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়াকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও নিরাপদ করতে হবে, যাতে দালালের মধ্যস্থতা ছাড়াই সাধারণ মানুষ সরাসরি ও কম খরচে বিদেশে যেতে পারেন। একই সঙ্গে হাওরভিত্তিক কৃষি, আধুনিক মৎস্য চাষ, পর্যটন খাত ও স্থানীয় ক্ষুদ্র শিল্পে তরুণদের উৎসাহিত করে নিজ জেলাতেই সম্মানজনক আয়ের পথ সুগম করতে হবে। নিজ মাটিতে অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সুযোগ তৈরি হলে আমাদের তরুণরা কোনো অবস্থাতেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভূমধ্যসাগরের উত্তাল ঢেউ কিংবা লিবিয়ার বন্দিশিবিরের উদ্দেশ্যে পা বাড়াবে না।

স্বপ্ন দেখা প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার। কিন্তু দালালচক্রের মিথ্যা প্রলোভনে পড়ে সেই স্বপ্ন যদি ভূমধ্যসাগরের নোনা জলে অকালে ভেসে যায়, তবে তা কেবল একটি পরিবারের ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত ব্যর্থতা। দেশের প্রতিটি তাজা প্রাণের এমন করুণ পরিণতি রোধে রাষ্ট্র, প্রশাসন এবং সমাজকে এখনই কঠোর ও সমন্বিত পদক্ষেপে নামতে হবে। আর যেন কোনো মায়ের কোল খালি না হয়, ভূমধ্যসাগরের ঢেউয়ে আর একটি প্রাণও যেন হারিয়ে না যায়- এটিই হোক আমাদের সর্বজনীন অঙ্গীকার।

লেখক :  ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক 

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close