রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোড থেকে সিপার মোস্তফা নামে এক ফ্ল্যাট মালিককে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে তুলে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। পরে তার ছোট ভাই সাবির মোস্তফা পুলিশকে জানিয়েছেন, সিপার মোস্তফাকে উত্তরার একটি রিহ্যাব সেন্টারে ভর্তি করা হয়েছে। তবে তাকে কেন হ্যান্ডকাফ পরিয়ে নেওয়া হয়েছে, কারা তাকে নিয়ে গেছে এবং তারা কোন পরিচয়ে সেখানে গিয়েছিল—এসব বিষয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সকালে মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোডের ইলোরা ৫/৭ নম্বর বাসা থেকে সিপার মোস্তফাকে তুলে নেওয়া হয় বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন। এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রিয়াঙ্কা কমিউনিটি সেন্টারের সামনে, গণভবনের পশ্চিম-দক্ষিণ কর্নারের কাছাকাছি এলাকায় ঘটনাটি ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, কয়েকজন ব্যক্তি সিপার মোস্তফার হাতে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে তাকে নিয়ে যান।
ঘটনার পর মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি ভবনের ফ্ল্যাট মালিক ও বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং ঘটনার বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করেন।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সিপার মোস্তফাকে তার আপন ছোট ভাই সাবির মোস্তফা রিহ্যাবে পাঠিয়েছেন। তাকে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের ‘লাইট হাউজ’ নামের একটি রিহ্যাব সেন্টারে ভর্তি করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে রিহ্যাবে নেওয়ার সময় সিপার মোস্তফাকে কেন হ্যান্ডকাফ পরানো হয়েছিল, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলেন, ঘটনা জানার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছে। তদন্ত চলছে। রিহ্যাবে নেওয়ার প্রয়োজন থাকলেও তাকে কেন হ্যান্ডকাফ পরিয়ে নেওয়া হয়েছে, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ঘটনাটি নিয়ে ভবনের বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। সরেজমিনে কয়েকজন বাসিন্দা অভিযোগ করেন, পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ছাড়া এভাবে কাউকে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে বাসা থেকে তুলে নেওয়া আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।
তারা ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় এবং সিপার মোস্তফাকে কেন এভাবে নেওয়া হয়েছে, তা তদন্ত করে বের করার দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সিপার মোস্তফা ও তার পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ রয়েছে। বাসিন্দাদের অভিযোগ, সিপার মোস্তফার বড় ভাইয়ের মৃত্যুর পর তার সম্পত্তির মালিকানা ও দখল নিয়ে পরিবারের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়।
এ ছাড়া সিপার মোস্তফার নিজের নামে এই ভবনে তিনটি ফ্ল্যাট রয়েছে বলেও কয়েকজন ফ্ল্যাট মালিক জানিয়েছেন।
তাদের দাবি, সিপার মোস্তফার বড় ভাই আগুনে আহত হয়ে মারা যান। অভিযোগ রয়েছে, ওই সময় তিনি পর্যাপ্ত চিকিৎসা পাননি। ভবনের এক ভাড়াটিয়া নিজ উদ্যোগে তার চিকিৎসার জন্য অর্থ ব্যয় করেছিলেন বলেও কয়েকজন বাসিন্দা দাবি করেন। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
বাসিন্দাদের আরও অভিযোগ, বড় ভাইয়ের মালিকানাধীন তিনটি ফ্ল্যাট নিজেদের দখলে নেওয়ার উদ্দেশ্যে সিপার মোস্তফাকে রিহ্যাবে পাঠানো হয়েছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সাবির মোস্তফার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ফ্ল্যাট মালিকরা ঘটনার সঠিক তদন্ত দাবি করেছেন।
এদিকে একই ভবনের এক ভাড়াটিয়াকে ফ্ল্যাট ছেড়ে দেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ ও ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় মোহাম্মদপুর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার আবেদন করেছেন ভুক্তভোগী মো. সোলায়মান সোহেল।
জিডির আবেদনে সোলায়মান সোহেল উল্লেখ করেন, তিনি মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোডের ইলোরা, বাড়ি-৫/৭-এর ৭/এ ফ্ল্যাটে দীর্ঘদিন ধরে ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস করছেন। সামশ মোস্তফার কাছ থেকে ফ্ল্যাটটি ভাড়া নেওয়ার পর তিনি নিয়মিত ভাড়া পরিশোধ করে আসছেন।
সামশ মোস্তফার মৃত্যুর পর তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা এবং ইলোরা অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে ভাড়া পরিশোধ অব্যাহত রাখেন বলেও জিডির আবেদনে উল্লেখ করেন তিনি।
তবে ভাড়া পরিশোধ করার পরও তাকে ফ্ল্যাট ছাড়ার জন্য চাপ ও হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন সোলায়মান। এমনকি তাকেও এভাবে তুলে নিয়ে যাওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
জিডির আবেদনে বলা হয়, গত ১২ আগস্ট ২০২৬ তারিখে তিন বছরের জন্য ফ্ল্যাটের ভাড়ার চুক্তি নবায়ন করা হয়। চুক্তির মেয়াদ ৩১ জুলাই ২০২৮ পর্যন্ত। মাসিক ভাড়া গ্যারেজসহ ৩০ হাজার টাকা। এর সঙ্গে নির্ধারিত সার্ভিস চার্জ রয়েছে।
সোলায়মানের অভিযোগ, চুক্তি নবায়নের পরও ফ্ল্যাটের মালিকপক্ষের সাবির মোস্তফা ও তার ভাই সিপার মোস্তফা বিভিন্ন সময়ে তাকে ফ্ল্যাট ছেড়ে দেওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকেন। এ সময় তাকে একাধিক লিখিত নোটিশও দেওয়া হয়।
শেখ ফিরোজ আহমেদ, নিমাই চন্দ্র ও ওমর চন্দ্র নামে কয়েকজন ব্যক্তি তার বাসায় গিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে ফ্ল্যাট ছেড়ে দেওয়ার জন্য চাপ দেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
জিডির আবেদনে আরও বলা হয়, বিষয়টি ইলোরা অ্যাসোসিয়েশনকে জানানো হলেও চাপ ও হুমকি অব্যাহত থাকে। গত ১৭ আগস্ট তাকে লিগ্যাল নোটিশ দেওয়া হয়। পরে ২৯ সেপ্টেম্বর থানায় অভিযোগের মাধ্যমেও ফ্ল্যাট ছাড়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
সোলায়মান জানান, তার বাবা অসুস্থ এবং মা হৃদরোগে আক্রান্ত। পারিবারিক সমস্যার কারণে ছেলে ২০২৭ সালের মার্চে এসএসসি পরীক্ষা শেষ করার পর ফ্ল্যাট ছাড়ার কথা তিনি মালিকপক্ষকে জানিয়েছেন। এর আগে উপযুক্ত বাসা পেলে ফ্ল্যাট ছেড়ে দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
জিডিতে সোলায়মান আরও অভিযোগ করেন, বর্তমানে তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। সাবির মোস্তফা ও তার প্রতিনিধিদের মাধ্যমে যেকোনো সময় তিনি বা তার পরিবারের সদস্যরা হামলা কিংবা অন্য কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার শিকার হতে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
এ অবস্থায় নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা চেয়ে মোহাম্মদপুর থানায় সাধারণ ডায়েরি করার আবেদন করেছেন সোলায়মান।
কেকে/ এমএস