বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬,
২২ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম: ● একনেকে ১৬ হাজার ২০৭ কোটি টাকার ১৩ প্রকল্প অনুমোদন      ● সমঝোতার পরও এমপি গাজী নজরুলের জামিন নামঞ্জুর      ● একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তি সারের ডিলারশিপ নিতে পারবে না      ● দুর্গাপূজায় ৩ দিনের ছুটি ঘোষণা, প্রজ্ঞাপন জারি      ● কোনো ধরনের নৈরাজ্য প্রশ্রয় দেবে না সরকার: রিজভী      ● নিয়ন্ত্রণহীন সিলিন্ডারের বাজার       ● বিদায়ী ম্যাচে মেসির গোল-অ্যাসিস্ট, আর্জেন্টিনার বড় জয়      
দেশজুড়ে
উৎসবের আমেজে বিষাদ : প্রতিমা তৈরিতে খরচ বাড়লেও বাড়েনি দাম
হাতীবান্ধা (লালমনিরহাট) প্রতিনিধি
প্রকাশ: বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬, ৪:১১ পিএম আপডেট: ০৭.১০.২০২৬ ৪:১৮ পিএম
 প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগররা। ছবি : প্রতিনিধি

প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগররা। ছবি : প্রতিনিধি

দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে ব্যস্ত সময় পার করছেন রংপুর অঞ্চলের প্রতিমা কারিগররা। দিন-রাত পরিশ্রম করে প্রতিমা তৈরি করলেও উপকরণ ও শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় আশানুরূপ লাভ করতে পারছেন না তারা। ফলে একদিকে উৎসবের ব্যস্ততা, অন্যদিকে উৎপাদন খরচের চাপ—দুইয়ে মিলে ভালো নেই এ অঞ্চলের তিন শতাধিক প্রতিমা কারিগর ও তাদের দেড় হাজারের বেশি সহকারী।

ইতিমধ্যে অনেক মন্দিরে প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ হয়েছে। কোথাও চলছে রঙের কাজ, আবার কোথাও এখনো চলছে প্রতিমার মাটির প্রলেপ দেওয়ার কাজ। কারিগরদের ব্যস্ততা বাড়লেও তাদের আয় বাড়েনি। 

তাদের ভাষ্য, গত বছরের তুলনায় প্রতিমা তৈরির প্রায় সব উপকরণের দাম বেড়েছে ৩০-৪০ শতাংশ। কিন্তু প্রতিমার বিক্রি মূল্য তেমন বাড়েনি। ফলে বাড়তি খরচের বড় অংশই তাদের লাভ থেকে কমে যাচ্ছে।

অনেক মন্দিরে প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ হয়েছে। ছবি : প্রতিনিধি

অনেক মন্দিরে প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ হয়েছে। ছবি : প্রতিনিধি


কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার বৈদ্যের বাজার এলাকার প্রতিমা কারিগর রনজিত চন্দ্র বর্মণ এবার ১০টি মন্দিরে দুর্গাপ্রতিমা সরবরাহের চুক্তি করেছেন। প্রতিমার আকার ও কাজের ধরণ অনুযায়ী প্রতিটির দাম পড়ছে ৩০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৬০ হাজার টাকা। গত বছরও একই দামে ১০টি মন্দিরে প্রতিমা সরবরাহ করেছিলেন তিনি। তবে গত বছর সব খরচ বাদ দিয়ে প্রায় ৮০ হাজার টাকা লাভ হলেও এবার সেই লাভের ধারেকাছেও যেতে পারছেন না।

রনজিত চন্দ্র বর্মণের সঙ্গে কাজ করছেন পাঁচজন সহকারী। প্রত্যেককে প্রতিদিন ৫৫০ টাকা করে মজুরি দিতে হচ্ছে। তার স্ত্রী শোভা রানীও প্রতিমা তৈরির কাজে সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করছেন।

রনজিত জানান, প্রতিমা তৈরি করে এ বছর কোনো রকমে শুধু দিনমজুরি উঠাতে পারছি। আগে প্রতিমা তৈরির জন্য মাটি সংগ্রহে তেমন খরচ হতো না। এখন মাটি কিনে আনতে হচ্ছে। এর সঙ্গে খড়, দড়ি, কাঠ, বাঁশ, কাপড় ও রঙসহ প্রায় সব উপকরণের দাম বেড়েছে। আগামীতে প্রতিমা তৈরি করব কি না, সেটা নিয়েই এখন দোটানায় আছি।

বৈদ্যের বাজার গ্রামের প্রবীণ প্রতিমা কারিগর সনাতন চন্দ্র পাল জানান, রংপুর অঞ্চলে তিন শতাধিক প্রতিমা কারিগর রয়েছেন। প্রত্যেকের সঙ্গে গড়ে চার থেকে আটজন সহকারী কাজ করেন। শুধু তাদের গ্রামেই প্রায় ৪০ জন প্রতিমা কারিগর রয়েছেন। গ্রামে চারটি প্রতিমা তৈরির কারখানাও গড়ে উঠেছে। আশপাশের বিভিন্ন এলাকাতেও প্রতিমা তৈরির কারখানা রয়েছে।

কোথাও এখনো চলছে প্রতিমার মাটির প্রলেপ দেওয়ার কাজ

কোথাও এখনো চলছে প্রতিমার মাটির প্রলেপ দেওয়ার কাজ


৮৫ বছর বয়সেও প্রতিমা তৈরির কাজে যুক্ত সনাতন চন্দ্র পাল বলেন, ‘আমার শরীর এখন আগের মতো চলে না। তবুও প্রতিমা তৈরির কাজে সময় দেই। এটা আমার শখ। একসময় আমাদের কাজের অনেক মূল্য ছিল, সম্মানও ছিল। এখন আর তেমন মূল্য নেই।’

তার মতে, পাঁচ বছর আগেও প্রতিমা তৈরি করে কারিগররা ভালো লাভ করতে পারতেন। এখন উপকরণ ও শ্রমিকের খরচ বেড়ে যাওয়ায় লাভের পরিমাণ কমে গেছে। অনেকেই শুধু দিনমজুরির সমপরিমাণ আয় করছেন। তবে দীর্ঘদিন ধরে এ পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকায় এবং এটিকেই জীবিকার উৎস হিসেবে বেছে নেওয়ায় অনেকে কষ্ট করেও পেশাটি ধরে রেখেছেন।

লালমনিরহাটের তিস্তা এলাকার প্রতিমা কারিগর যাদব কৃষ্ণ দাস ছোটবেলা থেকেই প্রতিমা তৈরির সঙ্গে যুক্ত। অন্য কোনো পেশা তার জানা নেই। তার সঙ্গে চারজন সহকারী কাজ করেন। তাদের প্রত্যেককে প্রতিদিন ৫০০-৬০০ টাকা মজুরি দিতে হয়। এবার চারটি মন্দিরে প্রতিমা সরবরাহের চুক্তি করেছেন তিনি। বর্তমানে প্রতিমায় রঙের কাজ চলছে। অনেক সময় রাত জেগেও কাজ করতে হয়। কিন্তু খরচের তুলনায় লাভ খুবই কম। তবুও এ পেশা ছাড়তে পারছেন না।

রংপুর নগরীর মুলাটোল এলাকার প্রতিমা কারিগর দেবাশিষ চন্দ্র পাল জানান, প্রতিমার আকার, গঠন, সাজসজ্জা ও কাজের মান অনুযায়ী দাম নির্ধারণ করা হয়। এবার বিভিন্ন মন্দিরে ৩০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত দামের প্রতিমা তৈরি হচ্ছে।

তিনি ১৫টি মন্দিরের প্রতিমা তৈরির কাজ করছেন। তার সঙ্গে রয়েছেন আটজন সহকারী। রংপুরের একটি মন্দিরের জন্য তিনি দুই লাখ টাকা মূল্যের একটি প্রতিমা তৈরি করছেন। প্রতিমাটি তৈরি করতে প্রায় এক লাখ টাকা খরচ হবে। সহকারীদের মজুরি দিতে যাবে প্রায় ৬০ হাজার টাকা। সব খরচ বাদ দিয়ে শেষ পর্যন্ত প্রায় ৪০ হাজার টাকা লাভ থাকতে পারে বলেন তিনি।

তার সহকারী সন্তোষ চন্দ্র পাল জানান, দুর্গাপূজার প্রায় এক মাস আগে তিনি প্রতিমা তৈরির কাজে যুক্ত হন। বছরের অন্য সময় রিকশা চালান। নিজেও প্রতিমা তৈরি করা শিখেছেন। কিন্তু এ পেশাকে বর্তমানে লাভজনক মনে করেন না। অনেক সময় রাতেও কাজ করতে হয়। মজুরি পাই ৫০০ টাকা। এ টাকা দিয়ে সংসার চালানো কঠিন।

রংপুর নগরীর মাহিগঞ্জ এলাকার প্রতিমা কারিগর রনজিত কুমার পাল জানান, গত বছর ১০০ টাকায় যে দড়ি কিনেছেন, এবার সেটি কিনতে হচ্ছে ১৪০ টাকায়। এক হাজার টাকার রঙ এখন কিনতে হচ্ছে প্রায় দেড় হাজার টাকায়। গত বছর এক ভ্যান মাটি কিনতে ৫০০-৬০০ টাকা খরচ হলেও এবার লাগছে প্রায় এক হাজার টাকা। 

তিনি আরও জানান, একইভাবে খড়ের দামও গত বছরের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। প্রতিমা তৈরি এখন আর আগের মতো লাভজনক পেশা নেই। অনেকে কাজ ছেড়ে দিয়েছেন, আবার অনেকে ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বর্তমান বাজারদরে উপকরণ কিনে যে দামে প্রতিমা বিক্রি করতে হয়, তাতে টিকে থাকাই কঠিন।

পূজা উদযাপন পরিষদ সূত্র জানায়, এবার রংপুর বিভাগের আট জেলায় ৫ হাজার ৩১৮টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হওয়ার প্রস্তুতি চলছে। এর মধ্যে লালমনিরহাটে ৪৬৭টি, কুড়িগ্রামে ৫৩৭টি, রংপুরে ৮৩৫টি, গাইবান্ধায় ৫৮৭টি, দিনাজপুরে ১ হাজার ২৭৫টি, নীলফামারীতে ৮৪৭টি, ঠাকুরগাঁওয়ে ৪৬৮টি এবং পঞ্চগড়ে ৩০২টি মণ্ডপ রয়েছে। আগামী ১৬-২১ অক্টোবর পর্যন্ত দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে।

লালমনিরহাট জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি হিরালাল রায় বলেন, ‘প্রতিমা তৈরির উপকরণের দাম যে হারে বেড়েছে, সে তুলনায় প্রতিমার দাম বাড়েনি। তবে পাঁচ-ছয় বছর আগের তুলনায় বর্তমানে প্রতিমার দাম ১০-১২ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

তিনি আরও বলেন, ‘উপকরণের মূল্যবৃদ্ধির কারণে কারিগররা তেমন লাভবান হতে পারছেন না। তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। আগামী বছর বর্তমান বাজারদরে হয়তো প্রতিমা কেনা সম্ভব হবে না। তখন মন্দির কমিটিগুলোকে বাধ্য হয়েই প্রতিমা তৈরির বাজেট বাড়াতে হবে।’

কেকে/এআই


আরও সংবাদ   বিষয়:  লালমনিরহাট   উৎসব   আমেজ   বিষাদ   প্রতিমা  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

দেশজুড়ে- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close